*ইটভাটার মালিকদের দাবী প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এসব ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে
*প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পাহাড় কেটে ও ফসলি জমির মাটি দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে
নিজস্ব প্রতিবেদক,বান্দরবান: ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ইট তৈরিতে ব্যবহার করা হলে জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যেতে পারে। একইভাবে বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করা হলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে প্রায় ৭০টি ইটভাটা। এ সব ইটভাটার নাই কোন অনুমতি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। এর মধ্যে অধিকাংশ ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন এলাকার পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোর পাশে নয়ত গহীন বনের পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিনষ্ট করে। আশেপাশে থাকার চাষকৃত জমি ও বনাঞ্চল ধ্বংশ করেই ব্যবসা চাঙ্গা করার যেন মালিকদের মূল লক্ষ্যে।
বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, বান্দরবানে সাতটি উপজেলার ৭০টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। তার মধ্যে ১৯টি ইটভাটা হাইকোর্ট এ রিট মামলা করে দায় এড়িয়ে চলছে। আর বাকি ৫১টিশ কোন রিট মামলা নাই। ২০১৯ সাল থেকে ২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত পাহাড় কাটা ও ইটভাটাগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা জরিমানা ও কয়েকশত ঘনফুট গাছ জব্দ করা হয় এবং ৫৩টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এসব ইটভাটাতে বন জঙ্গলের কাঠ এবং পাহাড় কেটে মাটি স্তুপ করায় প্রতিটি ইটভাটায় বন ও পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে জরিমান করা হলেও তাতেই মানছেন না কোন আইন। বরং আইন দেখিয়ে পুরোদমে চালু করা হয় ইটভাটা।
বান্দরবানে সাতটি উপজেলায় ইটভাটা রয়েছে। সদরে ১২ টি,রোয়াংছড়িতে ১টি, রুমাতে ২টি, থানচিতে ১টি, লামা উপজেলায় ৪০টি, আলীকদমে ৬টি ও নাইক্ষ্যংছড়িতে ৮টি ইটভাটা রয়েছে। সবচেয়ে ইটভাটা বেশী রয়েছে লামা উপজেলাতে। এসব ইটভাটাগুলোতে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ থাকলেও তাদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে।
ইটভাটার মালিকরা মুখের উপর প্রশ্নে ছুড়ে দিয়েছে-প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এসব ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে গেল বেশ কয়েকদিন আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করতে দেখা গেছে, ‘ইটভাটা বন্ধ হলে বেকার হয়ে পড়বে অসংখ্য মানুষ বন্ধ হবে উন্নয়ন ‘কিন্তু গেল কয়েক দশক ধরে এসব পত্রিকা সংবাদের মুল শিরোনাম ছিল’অবৈধ ইটভাটা পোড়ানো হচ্ছে কাঠ ধ্বংশ হচ্ছে পরিবেশ’ ‘অথবা মাটি কেটে পাহাড় সাবাড়।’ অথচ এসব ইটভাটায় স্থানীয় মানুষরা কোন কাজ করার সুযোগ নেই। তবে কিছু চাঁদাবাজ গণমাধ্যমকর্মীরাই সামান্য অর্থের জন্য পরিবেশ রক্ষার বিপরীতে ইটভাটা মালিকদের পক্ষে নিয়মিত সাফাই ও গুনগান করছে।
ইটভাটা প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩ তে বলা হয়েছে, লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া ইট তৈরি করার কোন সুযোগ নেই। লাইসেন্স ছাড়া কেউ ইটভাটা চালু করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ আইন অমান্য করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আবার ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০১৯ অনুযায়ী, বিশেষ কোনো স্থাপনা করা যাবেনা।
বান্দরবানে গত এক দশক ধরে অবৈধভাবে চলা সকল ইটভাটা চালু থাকাতে এটাই প্রমাণিত যে, তারা আইনের তোয়াক্কা না করে চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের ইচ্ছামাফিক ইটভাটার কাজ। বান্দরবানে কোনোটিতেই ইট পোড়ানোর লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের সার্টিফিকেট, আয়কর সনদ ও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। সব ইটভাটা এক দশক ধরে অবৈধ। প্রভাবশালীদের মালিকানা ও ছত্রছায়ায় পাহাড় কেটে ও ফসলি জমির উর্বর মাটি দিয়ে ও দিন-রাত বনের কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে ।
কোনো ভাটাতে কয়লা ব্যবহার করা হয় না। কাঠ পোড়ানোর ফলে বন উজাড়ের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও ধ্বংস হচ্ছে। তাছাড়া বেশীর ভাগই কৃষিজমি, জনবসতি, প্রাকৃতিক ও সামাজিক বন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘেঁষে গড়ে উঠেছে এই ইটভাটাগুলো। পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।
জনস্বার্থে প্রশ্ন: পরিবেশের ক্ষতি ও কৃষি জমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ইটভাটাটি চালুর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? বিষয়টি তদন্ত করে জনসমক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।




