সারাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের (বলাৎকার) যেসব খবর প্রতিনিয়ত সামনে আসছে, তা কোনো নতুন বা হঠাৎ তৈরি হওয়া সংকট নয়। সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, এই অন্ধকার অধ্যায়টি অতীতে আরও বেশি ভয়াবহ আকারে ছিল, কিন্তু তখন প্রাতিষ্ঠানিক গোপনীয়তা, লোকলজ্জার ভয় এবং প্রমাণের অভাবে এগুলো দেয়ালের বাইরে আসত না।
আজ আমরা একটি ‘ডিজিটাল যুগে’ বাস করছি। প্রযুক্তির বিস্তার ও সচেতনতার কারণে আজ অপরাধ আড়াল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু বিকৃত মানসিকতার লেবাসধারী হুজুর বা শিক্ষক নিজেদের অপরাধকে ঢাকতে এবং অবুঝ শিশুদের মগজধোলাই করতে ধর্মীয় ধারণার চরম অপব্যাখ্যা দিয়ে তারা এহেন অপকর্মে লিপ্ত রয়েছে। জান্নাতের চিরকিশোর সেবক বা ‘গিলমান’ (Ghilman) সংক্রান্ত পবিত্র ধারণাকে তারা ইহজগতের এই জঘন্য অপরাধের সাথে গুলিয়ে ফেলে।
অথচ পবিত্র ইসলাম ধর্মে সমকামিতা, বলাৎকার এবং শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নকে অন্যতম নিকৃষ্টতম মহাপাপ (কবিরা গুনাহ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এর জন্য কঠিন ইহলৌকিক ও পারলৌকিক শাস্তির বিধান রয়েছে। একে আধ্যাত্মিকতা বা ধর্মীয় তত্ত্বে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চরম কুফরি এবং মানসিকভাবে বিকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা মনে করে বা প্রচার করার চেষ্টা করে যে, দুনিয়ার সুন্দর বালকদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করা বা তাদের ভোগ করার মাঝে কোনো পাপ নেই, বরং এটি জান্নাতের একটি প্রতিচ্ছবি। ইসলামের পরিভাষায় এই ধরণের সমকামী বা অপ্রাপ্ত বয়স্কদের প্রতি যৌন আকর্ষণ ও বিকৃতিকে উস্কে দিতে তারা ধর্মের এই পবিত্র ধারণাকে নিজেদের অপরাধ আড়াল করার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।
মনে রাখতে হবে, শিক্ষক বা হুজুর মানেই নিষ্পাপ নন। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখতে হবে, তার ধর্মীয় পোশাক বা পদবি দেখে নয়। শিশুদের গুড টাচ-ব্যাড টাচ শেখানো এখন অনেক জরুরি। প্রতিটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীকে নিজের শরীরের ওপর অধিকার এবং নিরাপদ-অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিটি কোণ (শ্রেণীকক্ষ, ডরমিটরি ও করিডোর) সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা এবং তা নিয়মিত মনিটর করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ডিজিটাল প্রমাণগুলোকে আমলে নিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এসব অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজিটাল যুগ আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে, প্রমাণ আমাদের হাতে এনে দিয়েছে। এখনই সময় আমাদের সম্মিলিত প্রতিবাদের। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষা এবং আমাদের শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করতেই হবে।



