সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক ঘুষের টাকা সহ এক সাবরেজিস্ট্রারের গ্রেফতার দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার একটি বার্তা দিয়েছে। ট্র্যাপকেসের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতার করা অত্যন্ত সংবেদনশীল, এক্ষেত্রে শক্তিশালী নজরদারি ও নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন হয়। কতজন গ্রেফতার হলো, তার সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেব বিবেচ্য নয়, বরং বিচার প্রক্রিয়ায় কতজন দণ্ডিত হলো, তা’ প্রণিধানযোগ্য।
দুর্নীতির মামলায় আদালতে দুদক’এর পক্ষে আইনি লড়াই অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ট্র্যাপকেসের অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি বিজ্ঞ আদালতের পর্যবেক্ষণে উদ্ঘাটিত হয়েছে। দুর্নীতির মামলা প্রমাণে আদালতে উপস্থাপন করতে হয় নিখুঁত ও নির্ভুল সাক্ষ্য-প্রমাণ। জনগণের প্রত্যাশা, দুর্নীতির ছোট ছিদ্রপথ নয়, বড় ছিদ্রপথ বন্ধ হোক। Shut down corruption gates, not holes. কিন্তু অন্যান্য সেক্টরের রাঘব বোয়ালদের বিরুদ্ধে অভিযান নয় কেন?
কয়েক বছর আগে ভূমি অধিগ্রহণের এক বিশাল দুর্নীতির মামলায় কক্সবাজারের ডিসিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। গ্রেফতার এড়াতে ঐ ডিসি বহু কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন, এমন কি উচ্চআদালত থেকে আগাম জামিনও পান। দুদক’এর তদানীন্তন ডিজি (লিগ্যাল)’র কৌশলগত সহায়তায় তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে আরও ৩ জেলার ডিসিকে গ্রেফতার করা সম্ভব না হলেও তাদের পরিণতি হয় চাকুরিচ্যুতি ও ওএসডি’র মাধ্যমে। এজন্য দায়ী তদানীন্তন দুদক চেয়ারম্যান। তাঁর ভাষ্য ছিল, “ডিসি ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান, ডিসি গ্রেফতার হলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষূণ্ন হয়।” আমার যুক্তি ছিলো, ডিসি দুর্নীতিগ্রস্ত হলে রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তৃত্ব ধ্বংস হয়। অথচ আইন প্রয়োগে দুদক’এর এ বৈষম্যমূলক আচরণ ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
একবার দায়িত্বরত এক সচিবকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতারের লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনার আগের রাতে তার বাসা দুদকের ছদ্মবেশী টিম দিয়ে র্যাকি করলে দুদক চেয়ারম্যান রীতিমত হুমকি দেন,“I will eat up.” সে সচিব গ্রেফতার এড়াতে কিছুদিন প্রতিবেশী এক রাষ্ট্রে অবস্থান করেন, পরে গ্রেফতার হন। এসব ঘটনা অনেকেরই অজানা। এমনকি সাবেক পানি সম্পদ মন্ত্রী ও সচিবকে মন্ত্রণালয়ে যেয়ে Interrogation করেছিলাম। অথচ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী Interrogation-এর সংবাদ পেয়ে মন্ত্রণালয় থেকে ভয়ে কেটে পড়েন। এভাবেই দুদক সাহস ভরে এগিয়েছিলো।
দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিকূল এ পরিবেশে ব্যতিক্রমী অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কঠোর পরিশ্রমে, কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করছে। অথচ দুর্নীতিবাজদের অহমিকাবোধ এমন চরমে পৌঁছেছে যে, তারা দুদক’কে খুব দুর্বল মনে করে। কিন্তু দুদক আসল ক্ষমতায় আবির্ভূত হলে আগ্নেয়গিরির ভস্মে পরিণত হবে তারা। দুদক’কে হতে হবে শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র (ETP)’র মতো, যেন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক কাঠামোটি বিজ্ঞানসম্মত রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিশোধন হয়। ইতালির ম্যাজিস্ট্রেট “এন্টোনিও ডি পিয়েত্রো”র মতো সাহসী অভিযানের মাধ্যমে দুর্নীতির দুর্গে আঘাত হানা এখন সময়ের দাবি।
শুধু একজন সাবরেজিস্ট্রার গ্রেফতার দুদক’এর সক্ষমতার প্রমাণক নয়, Symbolic Capacity দিয়ে প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে না। দুর্নীতি দমনের জন্য প্রয়োজন দুদক’এর Enforcement Capacity, Regulatory Capacity এবং Responsive Capacity’র পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ।


