বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা খরচে কেনা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) আর কোনো নির্বাচনেই ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ডিজিটাল কারচুপির সুযোগ থাকার অভিযোগে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত সিদ্ধান্তের পর এখন এসব অব্যবহৃত যন্ত্র কমিশনের জন্য বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবহার বন্ধ থাকলেও যন্ত্রগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে গিয়ে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ গুনতে হচ্ছে কমিশনকে।
কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসির কাছে মোট ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪০১টি ইভিএম রয়েছে। তবে এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫৯৯টি মেশিন খোয়া গেছে এবং নির্বাচন ভবনের বেজমেন্ট ও দুটি উপজেলা কার্যালয়ে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫৭টি যন্ত্র। বাকি মেশিনগুলোর বড় অংশ—৮৬ হাজার ২৩৩টি ইভিএম রাখা আছে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) গুদামে। প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ১৩৪ টাকা হিসাবে বিএমটিএফ ইতোমধ্যে ইসির কাছে ৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকা বকেয়া ভাড়া দাবি করেছে। গত বছরের ১৫ই ডিসেম্বর বকেয়া পরিশোধ ও ওয়্যারহাউজ খালি করার অনুরোধ জানিয়ে ইসিকে চিঠিও পাঠায় প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) গুদাম ভাড়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চিঠি চালাচালি করেও কোনো চূড়ান্ত সমাধান না হওয়ায় এই বকেয়া পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বিএমটিএফের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন আঞ্চলিক গোডাউনে রাখা ইভিএমগুলোর জন্য প্রতি মাসে ইসির ব্যয় হচ্ছে ৩০ লাখ টাকা। বর্তমানে আঞ্চলিক পর্যায়ে রাজশাহীতে ১৩ হাজার ৫৩০টি, ঢাকা অঞ্চলে ৭ হাজার ৪২৯টি, খুলনায় ৭ হাজার ১২টি, কুমিল্লায় ৬ হাজার ৮৭৫টি, ময়মনসিংহে ৬ হাজার ৪২৮টি, বরিশালে ৫ হাজার ৮৭টি, রংপুরে ৪ হাজার ৪০৫টি, চট্টগ্রামে ৪ হাজার ১৩৫টি, ফরিদপুরে ৩ হাজার ৮৮৫টি এবং সিলেট অঞ্চলে ২ হাজার ৬০৭টি ইভিএম রয়েছে।
ইভিএমের সার্বিক বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, আগামী কোনো নির্বাচনেই আর ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। যন্ত্রগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুটি কমিটি কাজ করছে এবং তাদের প্রস্তাবনা বা প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ এসব ইভিএম এখন কমিশনের কাছে বড় ভার বা বার্ডেন ছাড়া কিছু নয়। দ্রুততম সময়ে এগুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হলে কমিশন আর্থিক ও প্রশাসনিক দায় থেকে রক্ষা পাবে। তিনি জানান, যন্ত্রগুলোর বর্তমান শারীরিক অবস্থা, অবস্থান ও সংখ্যা পর্যালোচনায় একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে।
ইভিএমগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে কেবল ধ্বংস করাই একমাত্র পথ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কোন কোন অংশ অন্য কাজে পুনর্ব্যবহার করা যায় কিংবা বিক্রি করে অর্থ তুলে আনা সম্ভব কি না, তা যাচাই করা হবে। যেসব যন্ত্র মেরামত বা ব্যবহারের একেবারেই অযোগ্য, কেবল সেগুলোই ধ্বংসের তালিকায় থাকবে। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত, নিরীক্ষা এবং বিচারাধীন মামলার আলামত হিসেবে যেসব যন্ত্র রাখা প্রয়োজন, সেগুলো রেখে দেওয়া হবে। গত ১২ই অক্টোবর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে কমিশন সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আগের কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং আইনি প্রক্রিয়ার আলামত রেখে দ্রুত ইভিএম নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অব্যবহৃত ইভিএম বিনষ্টের ক্ষেত্রে পরিবেশসম্মত ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জোর তাগিদ দিয়েছে, যাতে নিয়মবহির্ভূতভাবে পোড়ানো বা ফেলার কারণে বায়ু, পানি ও মাটি দূষণসহ নতুন কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না হয়।




