অনেকের ধারণা, সম্পদ উপার্জন করা দ্বীনদারী বা আল্লাহর ওপর ভরসার (তাওয়াক্কুল) পরিপন্থী। তবে ইসলামে এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই, বরং মানুষের জীবিকা সংস্থানের জন্য পরিশ্রম ও উপার্জন করাকে বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সুস্থ ও কর্মক্ষম ব্যক্তির জন্য হালাল উপায়ে অর্থ উপার্জন করা ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিতে আবশ্যক বা ওয়াজিব। কোরআন মাজিদে সালাত শেষে আল্লাহর অনুগ্রহ ও রিজিক অন্বেষণে জমিনে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সুরা জুমা : ১০)। পাশাপাশি হাদিস শরিফেও হালাল উপার্জন অন্বেষণ করাকে প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব বলে উল্লেখ করা হয়েছে (মাজমাউয যাওয়াইদ : ১০/২৯১)।
নিজ শ্রমে স্বাবলম্বী হওয়া পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসুলগণের অন্যতম বিশেষ সুন্নত। ফাতহুল বারির (৪/৩০৬) বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত আদম (আ.) কৃষি কাজ, হজরত নুহ (আ.) কাঠমিস্ত্রির কাজ এবং হজরত ইদরিস (আ.) সেলাইয়ের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। একইভাবে হজরত দাউদ (আ.) লোহা গলিয়ে বর্ম তৈরি এবং হজরত মুসা (আ.) বকরি চরানোর কাজ করেছেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কেও পূর্ববর্তী নবীদের পথ অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সুরা আনআম : ৯০)। বিশ্বনবী (সা.) নিজেও ছাগল চড়িয়েছেন, যৌবনে হজরত খাদিজা (রা.)-এর হয়ে সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফর পরিচালনা করেছেন এবং সায়িব ইবনে আবু সায়িবের সঙ্গে যৌথ ব্যবসা করেছেন। সুনানে আবি দাঊদে (৫/১৭০) বর্ণিত আছে, সায়িব ইবনে আবু সায়িব মহানবী (সা.)-এর সততা ও বিশ্বস্ততার ভূয়সী প্রশংসা করে তাঁকে সর্বোত্তম অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
সম্পদ উপার্জনে ব্রত হওয়া তাওয়াক্কুল পরিপন্থী নয়। অতীতকালের এক ধরনের সুফিরা মনে করতেন, দ্বীনের কাজে ব্যস্তদের জন্য দুনিয়ার উপার্জনের পেছনে ব্যস্ত হওয়া ঠিক নয়। ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'কিতাবুল কাসব'-এ এ ধরনের ধারণা পোষণকারী সুফিদের মূর্খ বলেছেন। তিনি জবাব দেন, দ্বীনের কাজ ও উম্মতের ফিকির নবীদের চেয়ে বেশি কারও হতে পারে না; অথচ তাঁরাও বকরি চরানো, চাষাবাদ কিংবা ব্যবসার মাধ্যমে নিজে শ্রম দিয়েছেন। এমন ধারণার লোকেরা নিজে উপার্জন না করলেও মানুষের উপার্জিত সম্পদ লাভের আশায় থাকে। তিনি নিজের মতের স্বপক্ষে হজরত ওমর (রা.)-এর একটি বর্ণনা এনেছেন। একবার হজরত ওমর (রা.) ইবাদতরত এক জামাতের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাথা নিচু করে বসা দেখে জিজ্ঞেস করেন, এরা কারা? লোকেরা বললে, এরা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলকারী; শুনে তিনি রেগে গিয়ে বলেন, এরা তাওয়াক্কুলকারী নয়, বরং মানুষের সম্পদ ভক্ষণকারী। এরপর বলেন, প্রকৃত তাওয়াক্কুল অবলম্বনকারী তো সেই ব্যক্তি, যে প্রথমে জমিনে বীজ বপণ করে, এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করে। তিনি ইবাদতগোজার সম্প্রদায়কে মাথা উঁচু করে নিজেরা উপার্জন করে রিজিকের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন (কিতাবুল কাসব : ৮৭-৮৮)। বর্তমানেও অনেকে সম্পদ উপার্জনে ব্রত হওয়াকে দুনিয়াদারি বলে বাঁকা চোখে দেখেন, তবে ফকিহগণ সুস্পষ্ট বলেছেন, 'কার্যত কর্মক্ষম ব্যক্তির জন্যই শুধু মানুষের কাছে হাত পাতা বৈধ; অন্য কারও জন্য নয়।' (কিতাবুল কাসব : ১৯০)।
ইসলামি ফিকহে সর্বোত্তম পেশা নির্ধারণ নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও সব হালাল পেশাকেই মূল্যায়ন করা হয়েছে। সহিহ বোখারির (৪/৩০৩) বর্ণনায় রাসুল (সা.) বলেছেন, মানুষের নিজ হাতে উপার্জিত রুজিই সবচেয়ে উত্তম ও পবিত্র, যেমন হজরত দাউদ (আ.) নিজ হাতের উপার্জনে চলতেন। মুসনাদে আহমদে (১৫৮৭৪) বর্ণিত হাদিসে হালাল ব্যবসা ও নিজ হাতের উপার্জনকে সেরা পেশা বলা হয়েছে। এছাড়া মুসলিম শরিফের (২৬৬৪) নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যা নিজের জন্য কল্যাণকর মনে হয়, তা-ই গ্রহণ করা এবং আল্লাহর সাহায্য চাওয়া সুন্নত।
সাহাবি ও সালাফদের জীবন পর্যালোচনা করলেও ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। হজরত আবু বকর (রা.) কুরাইশ গোত্রের বড় ব্যবসায়ী ছিলেন এবং প্রতিদিন ভোরে বাজারে যেতেন। হজরত ওসমান (রা.) ও হজরত তালহা (রা.) কাপড়ের ব্যবসা করতেন (তাবাকাত ইবনে সাদ : ৩/১৮৬)। হজরত ওমর (রা.) মনে করতেন, কর্মে কিছুটা সামাজিক অসম্মান থাকলেও তা ভিক্ষাবৃত্তির চেয়ে উত্তম (ইবনু আবিদ দুনিয়া : ৭/৪৫৫)। সাহাবিগণ দ্বীনের প্রয়োজনে আর্থিক স্বচ্ছলতা পছন্দ করতেন (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/৩৫৫)। মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) মানুষকে হজরত আবু বকর (রা.)-এর অনুসরণে ব্যবসা করার উৎসাহ দিতেন। এছাড়া সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলেছিলেন, একসময় সম্পদ অপছন্দ করা হলেও বর্তমান যুগে সম্পদ মুমিনের হাতিয়ারস্বরূপ (ইসলাহুল মাল : ৮৯)।
কোরআন মাজিদে পুরো মানবজাতিকে হালাল ও পবিত্র বস্তু গ্রহণের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সুরা বাকারা : ১৬৮)। অন্যদিকে হালাল ছেড়ে হারাম বা সীমালঙ্ঘনের পথ বেছে নিলে আল্লাহর ক্রোধ অবধারিত হয়ে পড়ে, যা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় (সুরা তহা : ৮১)। তদুপরি, অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করা, চুরি, ডাকাতি ও অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন করাকে ইসলাম কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করেছে (সুরা নিসা : ২৯)। সুতরাং শরিয়তের সীমা বজায় রেখে হালাল পন্থায় স্বাবলম্বী হওয়াই ইসলামের মূল বার্তা।



