মাহবুবুর রহমান: সমকালীন বাংলা কবিতায় প্রেমের ভাষা ক্রমেই বহুমাত্রিক ও অন্তর্মুখী হয়ে উঠছে। প্রেম আর কেবল অনুভূতির উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ নেই; তা স্মৃতি, অনুশোচনা, আত্মসমালোচনা ও অস্তিত্বসংকটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদ জোবায়েরের কাব্যগ্রন্থ ডেকেছিলে প্রণয়জলে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন—যেখানে প্রেম একদিকে আহ্বান, অন্যদিকে আত্মসমর্পণের নিঃশব্দ ইতিহাস।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে ১০২টি কবিতা। প্রকাশক গল্পকার (১১/৬, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, রওশন হেরিটেজ, ৩য় তলা, কাঠালবাগান, ঢাকা)। ছত্ব-লেখক ও প্রচ্ছদশিল্পী সোহেল আশরা, ব্যবস্থাপনায় মোহাম্মদ ইসলাম, অক্ষর বিন্যাসে মো. বিপুল হোসেন এবং মুদ্রণে তুহিন প্রেস—সব মিলিয়ে বইটির প্রকাশনা মান সাহিত্যরুচিসম্পন্ন পাঠকের প্রত্যাশা পূরণ করে। ৩০০ টাকা মূল্যের এই কাব্যগ্রন্থটি আকারে সংযত হলেও ভাবনায় গভীর।
শিরোনামের দার্শনিক তাৎপর্য: ডেকেছিলে প্রণয়জলে—এই শিরোনামটি নিছক কাব্যিক নয়, বরং দার্শনিক ইঙ্গিতবাহী। ‘ডেকেছিলে’ শব্দটি একটি সক্রিয় আহ্বানকে নির্দেশ করে—যেন প্রেম এখানে আকস্মিক নয়, বরং আমন্ত্রিত। আর ‘প্রণয়জল’ সেই আবেগের প্রতীক, যেখানে প্রবেশ মানেই নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া, কখনো ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি জেনেও। পুরো গ্রন্থ জুড়ে এই আহ্বান ও আত্মনিমজ্জনের দ্বন্দ্বটি সুস্পষ্টভাবে প্রবাহিত।
প্রেমের রোমান্টিকতা নয়, বাস্তব অনুষঙ্গ: এই গ্রন্থের কবিতাগুলোতে প্রেম কোনো আদর্শিক রোমান্টিক অবস্থান থেকে উঠে আসেনি। বরং এখানে প্রেম ক্লান্ত, প্রশ্নবিদ্ধ এবং প্রায়শই অপূর্ণ। কবি প্রেমকে দেখেছেন জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে—যেখানে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিস্তর ফাঁক, আর সেই ফাঁক থেকেই জন্ম নেয় কবিতার ভাষা।
মোহাম্মদ জোবায়ের শব্দ নিয়ে অতিরিক্ত খেলায় যান না। তাঁর কবিতা নির্মিত হয় সংযত বাক্যে, স্পষ্ট অনুভবে এবং দীর্ঘ নীরবতার ভেতর দিয়ে। ১০২টি কবিতার প্রতিটিই স্বতন্ত্র, আবার সামগ্রিকভাবে একটি অভিন্ন আবহ তৈরি করে—যেন একটি দীর্ঘ প্রেমকাব্য, যা খণ্ড খণ্ড স্মৃতির মাধ্যমে এগিয়ে যায়।
আত্মজৈবনিকতা ও সময়চেতনা: ডেকেছিলে প্রণয়জলে কেবল ব্যক্তিগত প্রেমের কাব্য নয়; এতে রয়েছে সময়ের সঙ্গে সংলাপ। ব্যক্তিগত বেদনা এখানে বৃহত্তর একাকিত্বের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কের ভঙ্গুরতা এবং মানুষের ভেতরের শূন্যতা—এসবই কবিতার অন্তর্গত স্তরে ধরা দেয়।
লেখকের দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের অভিজ্ঞতা এই গ্রন্থে পরিণত রূপে প্রতিফলিত। তাঁর পূর্বপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ও উপন্যাসে যে আত্মমগ্নতা ও মানবিক সংবেদনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়, ডেকেছিলে প্রণয়জলে তারই আরও সংযত ও গভীরতর প্রকাশ।
নান্দনিকতা ও নির্মাণশৈলী: গ্রন্থের প্রচ্ছদ ও অক্ষর বিন্যাস কবিতার ভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাহুল্যহীন নকশা পাঠককে কবিতার ভেতরে প্রবেশে বাধা দেয় না, বরং সহায়তা করে। এটি একটি এমন বই, যা পড়তে হয় ধীরে—একটানা নয়, বরং বিরতি নিয়ে, ভাবতে ভাবতে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন: ডেকেছিলে প্রণয়জলে প্রেমের কবিতার এক পরিণত, সংযত ও আত্মসংলাপমুখী সংকলন। এটি তাৎক্ষণিক আবেগের বই নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী অনুভবের। যারা সমকালীন বাংলা কবিতায় গভীরতা, আত্মবিশ্লেষণ ও নান্দনিক সংযম খোঁজেন—তাদের জন্য এই গ্রন্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।
মোহাম্মদ জোবায়ের এই কাব্যগ্রন্থে প্রমাণ করেন, প্রেম নিয়ে এখনো নতুন করে বলা যায়—যদি সেই ভাষা আসে জীবনের গভীর অভিজ্ঞতা থেকে, আর সেই উচ্চারণে থাকে নীরবতার শক্তি।




