মাহবুবুর রহমান:
ইসলামের ইতিহাসে যে কজন মহান ব্যক্তিত্ব তাঁদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ন্যায়পরায়ণতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের অগ্রভাগে রয়েছেন মাওলা আলী (আ.)। পূর্ণ নাম আলী ইবনে আবি তালিব (রা./আ.)—তিনি ছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা, রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর চাচাতো ভাই ও জামাতা, এবং ইসলামী চিন্তা-চেতনার এক অম্লান প্রতীক। তাঁর শাহাদাৎ বার্ষিকী আমাদের কেবল শোকাহত করে না; বরং আত্মসমালোচনা, ন্যায়চর্চা ও মানবিকতার পথে নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়।
জন্ম ও শৈশব: কাবার পবিত্র অঙ্গনে আগমন
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মাওলা আলী (আ.) জন্মগ্রহণ করেন ৬০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে পবিত্র নগরী মক্কা-য়, এমনকি অনেক সূত্রে উল্লেখ আছে যে তিনি কাবা ঘরের অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন—যা তাঁর মর্যাদাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ, সাহসী ও জ্ঞানপিপাসু। মহানবী মুহাম্মদ (সা.)–এর সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠায় তিনি ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের সরাসরি ধারক হয়ে উঠেছিলেন।
ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রগামীদের অন্যতম। কিশোর বয়সেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী জীবনে ইসলামের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে অকুতোভয় সাহসিকতার পরিচয় দেন।
সাহস ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ ছিল সংগ্রামমুখর। সেই কঠিন সময়ে আলী (আ.) ছিলেন মহানবী (সা.)–এর অন্যতম প্রধান সহচর। হিজরতের রাতে, যখন শত্রুরা মহানবী (সা.)–কে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল, তখন তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে নবীর বিছানায় শুয়ে পড়েন। এই আত্মত্যাগের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে সাহসিকতার এক অনন্য নিদর্শন।
বদর, উহুদ, খন্দকসহ একাধিক যুদ্ধে তাঁর বীরত্ব কিংবদন্তিতুল্য। বিশেষ করে খন্দকের যুদ্ধে আমর ইবনে আবদউদের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্বযুদ্ধ মুসলিমদের মনোবল দৃঢ় করে। তাঁর তলোয়ার “যুলফিকার” ইসলামী ইতিহাসে ন্যায় ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অনন্য আলোকধারা
মাওলা আলী (আ.) কেবল একজন বীর যোদ্ধাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ নেতা। কুরআনের গভীর তাফসির, ফিকহ, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রচিন্তায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুদূরপ্রসারী। তাঁর বহু বাণী আজও মুসলিম সমাজে প্রজ্ঞার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাঁর বক্তব্য ও চিঠিপত্রের সংকলন হিসেবে পরিচিত নাহজুল বালাগা ইসলামী সাহিত্যের এক মূল্যবান সম্পদ। এতে রাষ্ট্রপরিচালনা, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক নীতির বিষয়ে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রতিফলিত হয়েছে। মালিক আল-আশতারকে লেখা তাঁর নির্দেশনামা আধুনিক সুশাসনের দলিল হিসেবেও আলোচিত।
খিলাফত ও ন্যায়ভিত্তিক শাসন
৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইসলামের চতুর্থ খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে সময় মুসলিম সমাজ ছিল গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত। পূর্ববর্তী খলিফা উসমান ইবনে আফফান (রা.)–এর শাহাদাতের পর মুসলিম সমাজে বিভক্তি ও বিদ্রোহ দেখা দেয়। এই কঠিন পরিস্থিতিতে আলী (আ.) ন্যায় ও সত্যের ভিত্তিতে শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
তাঁর শাসনামলে তিনি আত্মীয়প্রীতি ও পক্ষপাতিত্ব পরিহার করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টন করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন—রাষ্ট্রের সম্পদ আল্লাহর আমানত; তা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এমনকি নিজের ভাই আকীল (রা.)–এর অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তার আবেদনও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যা তাঁর ন্যায়পরায়ণতার উজ্জ্বল উদাহরণ।
অন্তর্দ্বন্দ্ব ও পরীক্ষার সময়
খিলাফতের সময় তাঁকে একাধিক বিদ্রোহ ও অন্তর্দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়। জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধ মুসলিম উম্মাহর জন্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায়। বিশেষত সিফফিনের যুদ্ধের পর খারিজিদের উত্থান তাঁর শাসনকে আরও জটিল করে তোলে।
এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও তিনি ন্যায়ের নীতি থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি বলেছিলেন, “সত্যের পথে একাকী হয়ে পড়লেও তাতে ভীত হয়ো না।” তাঁর এই দৃঢ়তা আজও নৈতিক নেতৃত্বের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
শাহাদাৎ: মানবতার জন্য আত্মোৎসর্গ
৬৬১ খ্রিস্টাব্দের রমজান মাসে, পবিত্র নগরী কুফা-র মসজিদে ফজরের নামাজের সময় খারিজি সদস্য ইবনে মুলজিম তাঁর ওপর আঘাত হানে। গুরুতর আহত অবস্থায় দু’দিন পর তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। তাঁর শাহাদাৎ মুসলিম বিশ্বের জন্য ছিল এক গভীর শোকের মুহূর্ত।
শাহাদাতের পূর্বমুহূর্তে তিনি যে কথাগুলো বলেছিলেন—“ফুযতু ওয়া রাব্বিল কা‘বা” (কাবার প্রভুর কসম! আমি সফল হয়েছি)—তা তাঁর আধ্যাত্মিক দৃঢ়তার সাক্ষ্য বহন করে। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও তিনি ক্ষমা, ন্যায় ও আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থার শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
ব্যক্তিত্বের বহুমাত্রিকতা
মাওলা আলী (আ.) ছিলেন ইবাদতগুজার, জ্ঞানী, যোদ্ধা, রাষ্ট্রনায়ক ও মানবতাবাদী। রাতের আঁধারে তিনি গোপনে দরিদ্রদের ঘরে খাদ্য পৌঁছে দিতেন। এতটাই বিনয়ী ছিলেন যে অনেক সময় মানুষ জানতই না, তাদের সাহায্যকারী ব্যক্তি রাষ্ট্রপ্রধান।
তিনি বলতেন, “মানুষ দুই ধরনের—তোমার ধর্মভাই, অথবা মানবতায় তোমার সমান।” এই উক্তি আজকের বিশ্বে সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বার্তা।
শাহাদাৎ বার্ষিকীর তাৎপর্য
মাওলা আলী (আ.)–এর শাহাদাৎ বার্ষিকী কেবল শোকপালনের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও নবায়নের দিন। আমরা যদি তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি, তবে সমাজে ন্যায়, সমতা ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
আজকের বিশ্বে রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক অবিচার ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে তাঁর আদর্শ বিশেষ প্রাসঙ্গিক। সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানবিকতার যে শিক্ষা তিনি দিয়েছেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান মুসলিম বিশ্ব নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয় তার মধ্যে অন্যতম। এমন প্রেক্ষাপটে মাওলা আলী (আ.)–এর জীবন আমাদের দেখায়, ক্ষমতা নয়; ন্যায়ই নেতৃত্বের মূল ভিত্তি।
তিনি কখনো প্রতিহিংসার রাজনীতি করেননি; বরং প্রতিপক্ষের প্রতিও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন। তাঁর বিচারব্যবস্থা ছিল স্বচ্ছ ও নীতিনিষ্ঠ। এমনকি আদালতে তিনি সাধারণ নাগরিকের মতো উপস্থিত হয়েছেন, যা আইনের শাসনের এক অনন্য উদাহরণ।
আলোর পথে প্রত্যাবর্তন
মাওলা আলী (আ.)–এর শাহাদাৎ আমাদের হৃদয়ে বেদনার সঞ্চার করে, কিন্তু তাঁর জীবন আমাদের আশার আলো দেখায়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—ন্যায়ের পথে চলা কঠিন হতে পারে, কিন্তু তা-ই প্রকৃত সাফল্যের পথ।
আজ তাঁর শাহাদাৎ বার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হোক—ব্যক্তিজীবনে সততা, সমাজজীবনে ন্যায় ও রাষ্ট্রজীবনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর জীবন ও আদর্শ কেবল মুসলিমদের জন্য নয়; সমগ্র মানবতার জন্য এক অনন্ত প্রেরণা।
মাওলা আলী (আ.) ছিলেন এবং থাকবেন ন্যায় ও মানবতার প্রতীক। তাঁর শাহাদাৎ ইতিহাসের একটি ঘটনা মাত্র নয়; এটি সত্যের পথে অবিচল থাকার এক চিরন্তন আহ্বান।
মাহবুবুর রহমান, লেখক ও সাংবািদক




