কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী জানিয়েছেন, তার আত্মজীবনীমূলক বই ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে লিখিত রচনা নয়, বরং এটি তার ব্যক্তিগত পথচলা ও জীবনের গল্প। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, বইটি বাজারে আসার আগে ভারতীয় দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’-তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এসব কথা তুলে ধরেছেন সাবেক এই কংগ্রেস প্রধান। পরিবারের সদস্যদের তিনি যেমনটা চিনেছেন ও ভালোবেসেছেন, তাদের জীবনের সংগ্রাম, উদ্দেশ্য ও মানুষের মতো দুর্বলতাগুলোকে সেভাবেই সততার সঙ্গে পাঠকের সামনে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তিনি।
সোনিয়া গান্ধী লিখেছেন, জীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে তিনি নিজের ভেতরের জগৎকে একান্তই ব্যক্তিগত রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন। স্বজন হারানোর শোক ও নির্মম বাস্তবতা তাকে রাজনীতিতে টেনে আনলেও যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন। জনজীবনের দৈনন্দিন ব্যস্ততা ও রাজনৈতিক কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে আসার পরই তিনি নিজের অতীত ও জীবনের পথচলাকে পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ পান। সেই পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকালে বারবার যে একটি বিষয় সামনে আসে, তা হলো ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসা থেকে গড়ে ওঠা প্রগাঢ় আনুগত্য।
নিজের জীবনের সেই শুরুর দিকের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, মাত্র ১৯ বছর বয়সে ইংল্যান্ডে ইতালির এক ছোট শহরের তরুণী হিসেবে এক তরুণ ভারতীয় শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। সেই সম্পর্কের পথ ধরেই তিনি পৌঁছান এক নতুন দেশ ও নতুন পরিবারের সান্নিধ্যে। সেখানে তার শাশুড়ির সঙ্গে গড়ে ওঠে এক গভীর ও আত্মিক সম্পর্ক, আর দেখতে দেখতে কেটে যায় সন্তানদের বড় করে তোলার রঙিন বছরগুলো। তবে ভালোবাসার এই গল্পে আঘাত হানে চরম আঘাত ও পারিবারিক ট্র্যাজেডি। প্রথমে সহিংসতায় শাশুড়ি এবং পরবর্তীতে স্বামী রাজীব গান্ধীকে হারিয়ে এক অসহনীয় সময় পার করতে হয়েছে তাকে।
সেই কঠিন দিনগুলোতে টিকিয়ে রাখার শক্তি প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, স্বামীর প্রতি ভালোবাসা, ভারতের প্রতি টান এবং এক ধরনের গভীর দায়বদ্ধতাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। নিজের সব স্বাভাবিক প্রবণতা ও ইচ্ছার বিপরীতে গিয়ে কেবল এই দায়িত্ববোধই তাকে জনসম্মুখে ও সক্রিয় রাজনীতিতে আসতে বাধ্য করেছিল। ভারতে বিগত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রান্তিক অবস্থান থেকে শুরু করে একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে দেশের রূপান্তর প্রত্যক্ষ করেছেন বলে নিবন্ধে জানান তিনি। যে দেশ ও সমাজকে তিনি একসময় নিজের বাড়ি বলে আপন করে নিয়েছিলেন, এই বই মূলত সেই দীর্ঘ পথচলারই অনুভূতির দলিল।
হার্পারকলিন্স ইন্ডিয়া প্রকাশিত সোনিয়া গান্ধীর এই বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা আগামী ১০ই নভেম্বর ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। এর আগে লেখকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়ার প্রকাশনা চুক্তি সংক্রান্ত জটিলতা ও অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বইটির প্রকাশ নিয়ে বেশ অনিশ্চয়তার দেখা দিয়েছিল, যা নতুন প্রকাশকের মাধ্যমে নিরসন হয়। প্রকাশিতব্য এই বইটিতে গান্ধী পরিবারের ওপর দিয়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির বিস্তারিত বর্ণনা স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় সঞ্জয় গান্ধীর অকালমৃত্যু, ১৯৮৪ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা এবং ১৯৯১ সালে স্বামী রাজীব গান্ধীর নির্মম হত্যাকাণ্ড।
পারিবারিক শোক ও ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে এই বইয়ে রাজনৈতিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও উঠে এসেছে। বিশেষ করে ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোটের অসামান্য জয় এবং সরকার গঠনের পেছনের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ওই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার সর্বসম্মত প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন সোনিয়া গান্ধী। পরবর্তীতে তিনি কংগ্রেস ও সম্মিলিত জোটের নেতৃত্ব প্রদান করেন, যে জোট টানা ১০ বছর ভারতের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল।




