বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বলেশ্বর নদীতীরবর্তী রুহিতা গ্রামে বছরের পর বছর ধরে সুপেয় পানির তীব্র সংকট চলছে। দিনের বেলা সংসারের নানা কাজ শেষ করে সন্ধ্যা নামলেই কলসি, বালতি ও পানির জার হাতে দূরবর্তী পুকুরের উদ্দেশ্যে বের হতে হয় স্থানীয় নারীদের। নিরাপদ পানির কাছাকাছি কোনো উৎস না থাকায় খাবার ও রান্নার পানি সংগ্রহ করতে দল বেঁধে প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছেন তারা। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই ভোগান্তির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন গ্রামটির নারী ও শিশুরা।
উপকূলীয় এই গ্রামের সিংহভাগ পরিবারই জীবনজীবিকার জন্য মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা মাছ ধরতে বলেশ্বর নদী ও বঙ্গোপসাগরে গিয়ে টানা ৭ থেকে ১০ দিন ধরে বাড়ির বাইরে অবস্থান করেন। ফলে গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি পানি সংগ্রহের পুরো দায়ভার নারীদের ওপর এসে পড়ে। নদী-খাল ও নির্জন পথ পেরিয়ে দিনে পানি আনতে নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকায় এবং কাজের চাপে তারা সন্ধ্যার পর কিংবা রাতের আঁধারে দলবদ্ধ হয়ে পানির সন্ধানে বের হন। পানির জার ও কলসি কাঁধে দীর্ঘ পথ যাতায়াতে তাদের অপচয় হচ্ছে মূল্যবান সময় ও শ্রম, সঙ্গে তাড়া করে নিরাপত্তার ভয়।
এই দৈনন্দিন কষ্টের বিবরণ দিয়ে গ্রামের জেলে পরিবারের নারী আমেনা বেগম জানান, তার স্বামী মাছ ধরতে সাগরে গেলে পরিবারের পানি সংগ্রহের ভার তাকেই নিতে হয়। জীবন বাঁচানোর তাগিদে পানির জন্য যেতে হলেও এই যাওয়া-আসায় দীর্ঘ সময় চলে যায়, ফলে ঘরের অন্যান্য দরকারি কাজ বা অর্থোপার্জনের সুযোগ থাকে না। একইভাবে পানির সংকটে মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে শিশুদের শিক্ষা জীবন। গ্রামের কাস্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জুয়েনা আক্তার জানায়, সন্ধ্যার পর পড়ার টেবিলে বসার কথা থাকলেও তাকে প্রতিদিন মায়ের সঙ্গে পানির সন্ধানে বাইরে বের হতে হয়। এতে একদিকে পড়ার সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পড়াশোনার আগ্রহও হারিয়ে যাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অত্যধিক লবণাক্ততা এবং উৎস স্বল্পতার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির অভাব দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। রুহিতা গ্রামের অধিবাসীদের মতে, পানি শুধু তৃষ্ণা মেটানোর বিষয় নয়, এর সঙ্গে স্থানীয়দের জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা সরাসরি যুক্ত। গ্রামের কাছাকাছি একটি নিরাপদ পানির স্থায়ী উৎস নিশ্চিত করা গেলে নারীদের রাতের অন্ধকারে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ভোগান্তি শেষ হতো।
সুপেয় পানির এই সংকট নিয়ে পাথরঘাটা উপজেলা পানি কমিটির সভাপতি এরফান আহমেদ সোয়েন জানান, এলাকায় পানির সংকট মোকাবিলায় পাথরঘাটা উপজেলায় ২ হাজার পানির ট্যাংক বরাদ্দের আশ্বাস দিয়েছেন চিফ হুইপ। প্রথম পর্যায়ে ৫০০টি ট্যাংক বিতরণ করা হবে। পাথরঘাটা সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সগির আলম বলেন, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীসংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে খাবার পানির অভাব রয়েছে, যার ফলে মানুষ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে নতুন টেকসই পদক্ষেপ প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পাথরঘাটা উপজেলা প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান জানান, পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পুকুর খনন ও ফিল্টার স্থাপনের কাজ চলছে এবং বেশ কিছু ট্যাংক ইতিমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেহেদী হাসান মন্তব্য করেন, সুস্থ থাকার জন্য নিরাপদ পানি অত্যাবশ্যক হলেও হাসপাতাল প্রাঙ্গণের অত্যাধুনিক পানির ফিল্টারটি দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে নষ্ট পড়ে আছে, যা দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সুপেয় পানির দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকারের দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন রুহিতা গ্রামের ভুক্তভোগী বাসিন্দারা।




