স্নাতকের পাট চুকানোর পরপরই জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আজকের তরুণ প্রজন্মকে। ক্লাস, আড্ডা আর পরিবারের নিশ্চিত আবোওহাওয়ার দিন শেষ হতে না হতেই শুরু হচ্ছে চাকরির পরীক্ষা কিংবা ভবিষ্যৎ গড়ার নতুন লড়াই। তবে জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্মের তরুণদের চিন্তাজগতের একটি বড় অংশ জুড়ে এখন শুধুই বিদেশ যাত্রার সিদ্ধান্ত। ইউনেসকোর তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে যেখানে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজারের কিছু বেশি, ২০২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ৫২ হাজার ৮০০ জনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক দশকে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

উচ্চশিক্ষার সূচনাতেই অনেকে এমন কঠিন পথ বেছে নিচ্ছেন মূলত দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে। বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি আসনের বিপরীতে গড়ে ৩৬ জন শিক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেই চার বছর আগে কানাডার সেন্ট জন শহরে পাড়ি জমান তাসমিম বিনতে করিম অমি। দেশে ভর্তিযুদ্ধে হেরে যাওয়ার ভয় থেকেই বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দীর্ঘ চার বছর ধরে পরিবার থেকে দূরে থাকা তাসমিমের মতে, স্বাধীন জীবনযাপন ও মানসম্মত শিক্ষা মিললেও প্রবাসে নতুন মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ও একাকীত্ব সামাল দেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

একইভাবে স্নাতকের শেষ বর্ষে এসে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় থাকেন দেশের শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস তৃপ্তি জানান, তাঁর পঠিত বিষয়টি বাংলাদেশে মাত্র তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে ভালো সুযোগের জন্য ইউরোপ বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। এর জন্য আইইএলটিএস, এসওপি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও স্পনসরের নানা প্রশাসনিক ঝক্কি পোহাতে হলেও মানসম্মত শিক্ষাকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে দেখছেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসে পড়াশোনা বাবদ শিক্ষার্থীরা ৬৬ কোটি ডলারের বেশি অর্থ বিদেশে পাঠিয়েছেন, যাকে ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার বিনিয়োগ বলে মনে করছেন তরুণেরা।

শিক্ষার পাশাপাশি দেশের বেকারত্ব ও চাকরির অনিশ্চয়তাও তরুণদের দেশ ছাড়ার অন্যতম মূল কারণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে বেকার ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৬ লাখ ২০ হাজারে। অন্যদিকে আইএমএফের ‘ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ সাময়িকীর সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যা নির্দেশ করে, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী মাধ্যমিক-উত্তর শিক্ষিত তরুণ শ্রমশক্তির প্রায় ৩৬ শতাংশই বেকার। এই পরিস্থিতিতে ভালো জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের তাগিদেই জেন-জিদের বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ আরও বেশি লক্ষ করা যায়। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অনিরাপদ গণপরিবহন, অশালীন মন্তব্য এবং কম বয়সে বিয়ের চাপ থেকে রক্ষা পেতেও অনেক নারী উচ্চশিক্ষার জন্য প্রবাসকে বেছে নিচ্ছেন। ২০২১ সালে জার্মানির পরিচালিত একটি গবেষণায় ৫ হাজার ৪০৮ জন শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, প্রথম সেমিস্টারের নারী শিক্ষার্থীদের ২৫ শতাংশ বিদেশে যাওয়ার স্পষ্ট ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যেখানে পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২০ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক স্তরেও নতুন বিধিনিষেধ ও গন্তব্যের পরিবর্তন ঘটছে। ২০২৬ সালে নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র ১ লাখ ৫৫ হাজার আসন নির্দিষ্ট করেছে কানাডা। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় জটিলতা এবং খরচ বৃদ্ধির কারণে তরুণেরা এখন জার্মানি, ইতালি, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। এ বছর জাপানের সাগা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছেন ৫১ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, যা বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় বিদেশি শিক্ষার্থীর দল। একই কারণে ঢাকায় বিভিন্ন বিদেশি ভাষা শেখার আগ্রহও দ্রুত বাড়ছে।

তবে সবাই বিদেশে যাওয়ার এই প্রবাহে সামিল হতে চান না। সামাজিক বন্ধন ও প্রবাসের একাকী জীবনযাপনের কথা চিন্তা করে অনেকে দেশেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেন। ভিসা সাক্ষাৎকারের অপেক্ষা এবং শেষ মুহূর্তে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকির মধ্যেও তরুণেরা চেষ্টা চালিয়ে যান। পাশাপাশি শুধু পড়ার জন্য নয়, জীবিকার সন্ধানেও তরুণদের বিশাল অংশ দেশ ছাড়ছেন। অভিবাসন গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছেন, যার একটি বড় অংশই জেন-জি। তাঁদের অনেকেই ভূমধ্যসাগর বা কাভার্ড ভ্যানে চড়ে বিপজ্জনক উপায়ে ইউরোপ বা অন্য দেশে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন। এত প্রতিকূলতার পরও বিদেশের মাটিতে পা রাখা এসব তরুণদের একটি বড় অংশই ভবিষ্যতে নিজের অবস্থান থেকে বাংলাদেশের জন্য কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিন যাঈমাহ্ কবির।

স্নাতকের পাট চুকানোর পরপরই জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আজকের তরুণ প্রজন্মকে। ক্লাস, আড্ডা আর পরিবারের নিশ্চিত আবোওহাওয়ার দিন শেষ হতে না হতেই শুরু হচ্ছে চাকরির পরীক্ষা কিংবা ভবিষ্যৎ গড়ার নতুন লড়াই। তবে জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্মের তরুণদের চিন্তাজগতের একটি বড় অংশ জুড়ে এখন শুধুই বিদেশ যাত্রার সিদ্ধান্ত। ইউনেসকোর তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে যেখানে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজারের কিছু বেশি, ২০২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ৫২ হাজার ৮০০ জনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক দশকে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

উচ্চশিক্ষার সূচনাতেই অনেকে এমন কঠিন পথ বেছে নিচ্ছেন মূলত দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে। বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি আসনের বিপরীতে গড়ে ৩৬ জন শিক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেই চার বছর আগে কানাডার সেন্ট জন শহরে পাড়ি জমান তাসমিম বিনতে করিম অমি। দেশে ভর্তিযুদ্ধে হেরে যাওয়ার ভয় থেকেই বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দীর্ঘ চার বছর ধরে পরিবার থেকে দূরে থাকা তাসমিমের মতে, স্বাধীন জীবনযাপন ও মানসম্মত শিক্ষা মিললেও প্রবাসে নতুন মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ও একাকীত্ব সামাল দেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

একইভাবে স্নাতকের শেষ বর্ষে এসে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় থাকেন দেশের শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস তৃপ্তি জানান, তাঁর পঠিত বিষয়টি বাংলাদেশে মাত্র তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে ভালো সুযোগের জন্য ইউরোপ বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। এর জন্য আইইএলটিএস, এসওপি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও স্পনসরের নানা প্রশাসনিক ঝক্কি পোহাতে হলেও মানসম্মত শিক্ষাকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে দেখছেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসে পড়াশোনা বাবদ শিক্ষার্থীরা ৬৬ কোটি ডলারের বেশি অর্থ বিদেশে পাঠিয়েছেন, যাকে ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার বিনিয়োগ বলে মনে করছেন তরুণেরা।

শিক্ষার পাশাপাশি দেশের বেকারত্ব ও চাকরির অনিশ্চয়তাও তরুণদের দেশ ছাড়ার অন্যতম মূল কারণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে বেকার ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৬ লাখ ২০ হাজারে। অন্যদিকে আইএমএফের ‘ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ সাময়িকীর সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যা নির্দেশ করে, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী মাধ্যমিক-উত্তর শিক্ষিত তরুণ শ্রমশক্তির প্রায় ৩৬ শতাংশই বেকার। এই পরিস্থিতিতে ভালো জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের তাগিদেই জেন-জিদের বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ আরও বেশি লক্ষ করা যায়। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অনিরাপদ গণপরিবহন, অশালীন মন্তব্য এবং কম বয়সে বিয়ের চাপ থেকে রক্ষা পেতেও অনেক নারী উচ্চশিক্ষার জন্য প্রবাসকে বেছে নিচ্ছেন। ২০২১ সালে জার্মানির পরিচালিত একটি গবেষণায় ৫ হাজার ৪০৮ জন শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, প্রথম সেমিস্টারের নারী শিক্ষার্থীদের ২৫ শতাংশ বিদেশে যাওয়ার স্পষ্ট ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যেখানে পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২০ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক স্তরেও নতুন বিধিনিষেধ ও গন্তব্যের পরিবর্তন ঘটছে। ২০২৬ সালে নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র ১ লাখ ৫৫ হাজার আসন নির্দিষ্ট করেছে কানাডা। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় জটিলতা এবং খরচ বৃদ্ধির কারণে তরুণেরা এখন জার্মানি, ইতালি, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। এ বছর জাপানের সাগা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছেন ৫১ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, যা বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় বিদেশি শিক্ষার্থীর দল। একই কারণে ঢাকায় বিভিন্ন বিদেশি ভাষা শেখার আগ্রহও দ্রুত বাড়ছে।

তবে সবাই বিদেশে যাওয়ার এই প্রবাহে সামিল হতে চান না। সামাজিক বন্ধন ও প্রবাসের একাকী জীবনযাপনের কথা চিন্তা করে অনেকে দেশেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেন। ভিসা সাক্ষাৎকারের অপেক্ষা এবং শেষ মুহূর্তে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকির মধ্যেও তরুণেরা চেষ্টা চালিয়ে যান। পাশাপাশি শুধু পড়ার জন্য নয়, জীবিকার সন্ধানেও তরুণদের বিশাল অংশ দেশ ছাড়ছেন। অভিবাসন গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছেন, যার একটি বড় অংশই জেন-জি। তাঁদের অনেকেই ভূমধ্যসাগর বা কাভার্ড ভ্যানে চড়ে বিপজ্জনক উপায়ে ইউরোপ বা অন্য দেশে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন। এত প্রতিকূলতার পরও বিদেশের মাটিতে পা রাখা এসব তরুণদের একটি বড় অংশই ভবিষ্যতে নিজের অবস্থান থেকে বাংলাদেশের জন্য কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিন যাঈমাহ্ কবির।