গত দুই দশকে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিক অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। এর ফলে রাষ্ট্রগুলোকে 'হাইব্রিড রেজিম', 'ডেভেলপমেন্টাল ডিক্টেটরশিপ' কিংবা 'ইলেকটোরাল অটোক্রেসি'র মতো বিভিন্ন তকমায় অভিহিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন যেভাবে একপর্যায়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে সরকার পতনে মূল ভূমিকা রেখেছিল, তা প্রমাণ করে এই পরিবর্তনের পেছনে প্রয়োজনীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি ছিল। এই অভ্যুত্থানের মূল শিক্ষা হলো, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাক্ষা কেবল প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর মাধ্যমেই প্রকাশ পায় না; বরং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অনাস্থা তৈরি হলে তা নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দেয়। তবে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন রাজনীতির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়, রাষ্ট্র পরিচালনাকেন্দ্রিক বাস্তবতার কারণে তা বহু দেশে বাস্তবায়িত হতে পারেনি। বাংলাদেশও বর্তমানে তেমনই এক ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার করছে।

গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক রাজনীতি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া এক বিষয় নয়। আন্দোলনের সময়ে একটি নির্দিষ্ট দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব হলেও রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ, ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে সেই ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সেই রাজনৈতিক ঐক্য ভেঙে যাওয়ার লক্ষণ দৃশ্যমান এবং দুটি প্রধান বিরোধী জোটের রাজনীতি পুনরায় ফিরে আসার উপক্রম হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোট গঠন গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবু নতুন রাজনীতির ক্ষেত্রে সেই আপসের নৈতিক ভিত্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং নেতাদের ঘোষিত আদর্শের প্রতি জবাবদিহিতা বড় বিচারের বিষয়। এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের জোট গঠন কিংবা গণ অধিকার পরিষদ ও গণসংহতির নেতাদের বিএনপি সরকারে অংশগ্রহণ—সবই নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৈষম্যহীন করতে তাদের ভূমিকার ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্তভাবে বিবেচিত হবে। যারা নতুন রাজনীতির বার্তা দিচ্ছিলেন, তারা পুরোনো রাজনীতির বড় দুটি দলের আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন, যা ক্ষমতা চর্চা ও গুণগত পরিবর্তনের সামনে প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণদের পরিবর্তনের ক্ষমতা পরিষ্কার হলেও সেই তারুণ্য একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তারুণ্য কোনো একক রাজনৈতিক আদর্শ নয়। তরুণদের মধ্যেও কেউ কর্তৃত্ববাদী আবার কেউ গণতন্ত্রী হতে পারেন; কেউ ধর্মীয় বা নৃগোষ্ঠীগত জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হতে পারেন, আবার কেউ ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থক হতে পারেন। একইভাবে তরুণদের মধ্যে শ্রেণি, লিঙ্গ, অঞ্চল, ধর্মীয় পরিচয়, শিক্ষাগত সুযোগ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্য রয়েছে। তাই নতুন রাজনীতির সফলতা নির্ভর করবে এসব ভিন্নতার মধ্যে গণতান্ত্রিক সহাবস্থান তৈরির সক্ষমতার ওপর। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-তরুণদের অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। তবে অতীতে আন্দোলন শেষে তরুণেরা বিদ্যমান দলগুলোতে যোগ দিয়ে শেষ পর্যন্ত গোষ্ঠীস্বার্থের বাহক বা দলের অনুগত কর্মীতে পরিণত হয়েছেন। ফলে বর্তমান তরুণ নেতৃত্ব সেই পুরোনো চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে কি না, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি বেশ দুর্বল।

২০২৫ সালে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও একশনএইড বাংলাদেশ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৮৩ শতাংশ তরুণ-তরুণী রাজনীতিবিমুখ। বর্তমান প্রজন্মের বড় হওয়া দুটি ভিন্ন পরিবেশে—একদিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির অবাধ বিস্তার, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট। ডিজিটাল পরিসরে সক্রিয়তার কারণে এখন দলীয় সদস্য না হয়েও জনমত গঠন করা সম্ভব হচ্ছে, যা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ কিছুটা উন্মুক্ত করেছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই জনপ্রিয়তাকে নতুন রাজনীতির সমার্থক ভাবা ভুল হবে। কারণ এসব মাধ্যম যেমন প্রতিবাদের সুযোগ সৃষ্টি করে, তেমনই গুজব, অপতথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ, মতাদর্শিক মেরুকরণ এবং মব তৈরির ঝুঁকিও বাড়ায়।

গণ-অভ্যুত্থান কয়েক বছর পরপর ঘটে না, তাই তরুণ নেতৃত্বকে গণতান্ত্রিক পথেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। দলবাজি, ঠিকাদারি, সিন্ডিকেট বা বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দর-কষাকষির দুর্বলতা যাতে নতুন রাজনীতিকে গ্রাস করতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ থাকা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, চাকরির নিশ্চয়তা, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের দাবিগুলো বস্তুত মৌলিক রাজনৈতিক দাবিরই অংশ। বিদ্যমান রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার ছাড়া শুধু সরকার পরিবর্তন হলে জনগণের প্রত্যাশা বারবার পদদলিত হতে পারে। ফলে কার্যকর অর্থে নতুন রাজনীতি মানে কেবল নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে জনকল্যাণমুখী করে নতুনভাবে সাজানো।

গত দুই দশকে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিক অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। এর ফলে রাষ্ট্রগুলোকে 'হাইব্রিড রেজিম', 'ডেভেলপমেন্টাল ডিক্টেটরশিপ' কিংবা 'ইলেকটোরাল অটোক্রেসি'র মতো বিভিন্ন তকমায় অভিহিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন যেভাবে একপর্যায়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে সরকার পতনে মূল ভূমিকা রেখেছিল, তা প্রমাণ করে এই পরিবর্তনের পেছনে প্রয়োজনীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি ছিল। এই অভ্যুত্থানের মূল শিক্ষা হলো, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাক্ষা কেবল প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর মাধ্যমেই প্রকাশ পায় না; বরং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অনাস্থা তৈরি হলে তা নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দেয়। তবে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন রাজনীতির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়, রাষ্ট্র পরিচালনাকেন্দ্রিক বাস্তবতার কারণে তা বহু দেশে বাস্তবায়িত হতে পারেনি। বাংলাদেশও বর্তমানে তেমনই এক ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার করছে।

গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক রাজনীতি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া এক বিষয় নয়। আন্দোলনের সময়ে একটি নির্দিষ্ট দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব হলেও রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ, ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে সেই ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সেই রাজনৈতিক ঐক্য ভেঙে যাওয়ার লক্ষণ দৃশ্যমান এবং দুটি প্রধান বিরোধী জোটের রাজনীতি পুনরায় ফিরে আসার উপক্রম হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোট গঠন গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবু নতুন রাজনীতির ক্ষেত্রে সেই আপসের নৈতিক ভিত্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং নেতাদের ঘোষিত আদর্শের প্রতি জবাবদিহিতা বড় বিচারের বিষয়। এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের জোট গঠন কিংবা গণ অধিকার পরিষদ ও গণসংহতির নেতাদের বিএনপি সরকারে অংশগ্রহণ—সবই নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৈষম্যহীন করতে তাদের ভূমিকার ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্তভাবে বিবেচিত হবে। যারা নতুন রাজনীতির বার্তা দিচ্ছিলেন, তারা পুরোনো রাজনীতির বড় দুটি দলের আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন, যা ক্ষমতা চর্চা ও গুণগত পরিবর্তনের সামনে প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণদের পরিবর্তনের ক্ষমতা পরিষ্কার হলেও সেই তারুণ্য একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তারুণ্য কোনো একক রাজনৈতিক আদর্শ নয়। তরুণদের মধ্যেও কেউ কর্তৃত্ববাদী আবার কেউ গণতন্ত্রী হতে পারেন; কেউ ধর্মীয় বা নৃগোষ্ঠীগত জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হতে পারেন, আবার কেউ ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থক হতে পারেন। একইভাবে তরুণদের মধ্যে শ্রেণি, লিঙ্গ, অঞ্চল, ধর্মীয় পরিচয়, শিক্ষাগত সুযোগ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্য রয়েছে। তাই নতুন রাজনীতির সফলতা নির্ভর করবে এসব ভিন্নতার মধ্যে গণতান্ত্রিক সহাবস্থান তৈরির সক্ষমতার ওপর। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-তরুণদের অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। তবে অতীতে আন্দোলন শেষে তরুণেরা বিদ্যমান দলগুলোতে যোগ দিয়ে শেষ পর্যন্ত গোষ্ঠীস্বার্থের বাহক বা দলের অনুগত কর্মীতে পরিণত হয়েছেন। ফলে বর্তমান তরুণ নেতৃত্ব সেই পুরোনো চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে কি না, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি বেশ দুর্বল।

২০২৫ সালে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও একশনএইড বাংলাদেশ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৮৩ শতাংশ তরুণ-তরুণী রাজনীতিবিমুখ। বর্তমান প্রজন্মের বড় হওয়া দুটি ভিন্ন পরিবেশে—একদিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির অবাধ বিস্তার, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট। ডিজিটাল পরিসরে সক্রিয়তার কারণে এখন দলীয় সদস্য না হয়েও জনমত গঠন করা সম্ভব হচ্ছে, যা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ কিছুটা উন্মুক্ত করেছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই জনপ্রিয়তাকে নতুন রাজনীতির সমার্থক ভাবা ভুল হবে। কারণ এসব মাধ্যম যেমন প্রতিবাদের সুযোগ সৃষ্টি করে, তেমনই গুজব, অপতথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ, মতাদর্শিক মেরুকরণ এবং মব তৈরির ঝুঁকিও বাড়ায়।

গণ-অভ্যুত্থান কয়েক বছর পরপর ঘটে না, তাই তরুণ নেতৃত্বকে গণতান্ত্রিক পথেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। দলবাজি, ঠিকাদারি, সিন্ডিকেট বা বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দর-কষাকষির দুর্বলতা যাতে নতুন রাজনীতিকে গ্রাস করতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ থাকা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, চাকরির নিশ্চয়তা, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের দাবিগুলো বস্তুত মৌলিক রাজনৈতিক দাবিরই অংশ। বিদ্যমান রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার ছাড়া শুধু সরকার পরিবর্তন হলে জনগণের প্রত্যাশা বারবার পদদলিত হতে পারে। ফলে কার্যকর অর্থে নতুন রাজনীতি মানে কেবল নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে জনকল্যাণমুখী করে নতুনভাবে সাজানো।