যুক্তরাষ্ট্রে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৮ সালের ৭ নভেম্বর। আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার শুরু হতে এখনো দীর্ঘ সময় বাকি থাকলেও সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল পাওয়ার পরপরই ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। দুই প্রধান রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি থেকে হোয়াইট হাউসের দৌড়ে কারা সামিল হতে পারেন, তা নিয়ে জোর চর্চা চলছে।
গত মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা বড় ধরনের সাফল্য পাওয়ায় রাজধানী ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পদে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অন্তত ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোটের সমীকরণ তৈরি করার ক্ষেত্রেও দলটির সামনে নতুন পথ খুলে গেছে। ভোটারদের একাংশের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি প্রকাশ্য অসন্তোষ দেখা গেছে। এতে রিপাবলিকান শিবিরের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে—'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন' বা মাগা আন্দোলনের ভিত্তি কি আবার এক ছাতার নিচে রাখা সম্ভব, নাকি দলকে নতুন কোনো রাজনৈতিক ও কৌশলী ধারায় পরিচালনা করতে হবে। যদিও এখনো কোনো নেতাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হওয়ার কথা জানাননি, তবে প্রত্যাশার আগেই কেউ কেউ দৌড়ে নেমে পড়তে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডেমোক্রেটিক পার্টির দিক থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছেন পেনসিলভানিয়ার পুনর্নির্বাচিত গভর্নর জশ শ্যাপিরো। ২০ শতাংশ পয়েন্টের বেশি বড় ব্যবধানে নিজের জয় সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি তিনি কঙ্গ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের হাত থেকে চারটি আসন ছিনিয়ে নিতে দলকে সহায়তা করেছেন। পেনসিলভানিয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একটি দোলু্যমান অঙ্গরাজ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সেখানে শ্যাপিরোর এই শক্ত অবস্থান ২০২৮ সালে দলের মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে তাঁকে বেশ সুবিধাজনক স্থানে রাখবে। এতদিন প্রার্থিতা নিয়ে মুখ না খুললেও এখন তাঁর পক্ষে প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমও প্রার্থীর দৌড়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। টেক্সাস অঙ্গরাজ্য প্রতিনিধি পরিষদের আসন সীমানা পুনর্বিন্যাস করার পর নিউসম ক্যালিফোর্নিয়ায় একই ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নেন। ভোটারদের অনুমোদনে নেওয়া ওই পদক্ষেপে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের আসন পাঁচটি বেড়ে যায়। মেয়াদের শেষ পর্যায়ে থাকা নিউসম ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ৫৪৮ জন বন্দির সবার সাজা কমিয়ে দেবেন। এর মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড ইস্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান থেকে নিজের স্পষ্ট তফাত তুলে ধরলেন তিনি।
দক্ষিণাঞ্চলের খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ও জর্জিয়ার সিনেটর রাফায়েল ওয়ার্নকও রয়েছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালিয়ে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ভিত্তি শক্ত করতে ভূমিকা রেখেছেন তিনি। নির্বাচনের আগে সিএনএনকে তিনি ইঙ্গিত দেন যে ২০২৮ সালে কোনো ‘উচ্চ পদে’ লড়বেন, তবে সেটি সিনেট নাকি প্রেসিডেন্ট পদ—তা খোলাসা করেননি। কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনে নতুন পথ খোলার যুক্তিতে তিনি নিজের প্রার্থিতার জোরালো দাবি উপস্থাপন করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যগুলোতে পুরোনো ও নতুন ভোটারদের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারেন সাউথ বেন্ড শহরের সাবেক মেয়র এবং দেশটির সাবেক পরিবহনমন্ত্রী পিট বুটিগেগ। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৩৮টি অঙ্গরাজ্যে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালিয়ে দলের অভ্যন্তরে নিজের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই বাড়িয়ে নিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, ইলিনয়ের গভর্নর পদে অনায়াসে জয় পাওয়া জেবি প্রিৎসকার জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় এসেছেন কৌশলী অর্থায়নের কারণে। টেক্সাসের গভর্নর পদপ্রার্থী জিনা হিনোহোসার অর্থনৈতিক সংকটের সময় প্রিৎসকারের বড় অঙ্কের নির্বাচনী অনুদান সরাসরি ফল পক্ষে আনতে সহায়তা করেছিল।
রিপাবলিকান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কেন্টাকির ডেমোক্র্যাট গভর্নর অ্যান্ডি বেশিয়ার ডেমোক্রেটিক গভর্নরস অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্ব দিয়ে ওহাইও, আইওয়া, কানসাস ও টেক্সাসে দলীয় গভর্নর প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন। যদিও টেক্সাসের কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য ও জাতীয় সংগঠনের অভিযোগ ছিল, বেশিয়ার জিনাকে পর্যাপ্ত সহায়তা দেননি। বিপরীতে রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করেছিলেন। বেশিয়ারের নিজের রাজ্য কেন্টাকিতে একটি প্রতিনিধি পরিষদ আসন ডেমোক্র্যাটরা জিতলেও সিনেট ধরে রেখেছে রিপাবলিকানরা। মধ্যপন্থী নেতারা জিততে পারেন—এমন বার্তা তৈরি হওয়ায় বেশিয়ার সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, সবকিছুকে ‘আমরা বনাম তারা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে নিয়ে দ্বিধা থাকতে পারে, কারণ তাঁর উপস্থিতি ডেমোক্র্যাটদের ২০২৪ সালের হারের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিসিসিপিতে জয়ের সম্ভাবনা কম থাকা স্কট কলমের সমাবেশে যাওয়া কিংবা মিশিগানে প্রাথমিক নির্বাচনে পিছিয়ে থাকা আবদুল আল-সাইয়েদের মূল নির্বাচনে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন অর্জনে হ্যারিসের বিচক্ষণ ভূমিকা দেখা গেছে। আবার নিউইয়র্কের প্রগতিশীল কংগ্রেস সদস্য আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ (এওসি) প্রগতিশীল ধারায় ব্যাপক জনপ্রিয়। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচিতি থাকলেও এবার রিপাবলিকান ঘাঁটিতে মধ্যপন্থীদের জয়ের প্রেক্ষাপটে তিনি তাঁর কিছু অবস্থান নমনীয় করেছেন।
জর্জিয়া থেকে পুনর্নির্বাচিত সিনেটর জন অসফকে অনেকে ‘নতুন বারাক ওবামা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। দক্ষিণাঞ্চলে দলের সাফল্যের মুখ হলেও অসফ বারবার প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তবে জর্জিয়ায় কেইশা ল্যান্স বটমস দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় অসফ হোয়াইট হাউসের দৌড়ে নামলে একটি খালি সিনেট আসনে ডেমোক্র্যাট নিয়োগ দেওয়ার সুবিধা থাকবে। পাশাপাশি বারাক ওবামার হোয়াইট হাউস চিফ অব স্টাফ ও শিকাগোর সাবেক মেয়র রাম ইমানুয়েল টেলিভিশনে নিয়মিত উপস্থিত থেকে শিক্ষার অগ্রাধিকার এবং মধ্যপন্থী বাস্তবমুখী কৌশলের ওপর জোর দিয়ে নিজের বার্তা ছড়াচ্ছেন।
অপরদিকে রিপাবলিকান শিবিরের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে সহসভাপতি জেডি ভ্যান্স এখনো এগিয়ে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্টে ইরান যুদ্ধকে হারের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, ট্রাম্পের মন রক্ষা করে সেই যুদ্ধ বন্ধের পথ বের করতে পারলে 'ট্রাম্প-ভ্যান্স' ভোটারদের আবারও ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব হবে।
ডেমোক্র্যাটদের জোয়ারের মধ্যেও ফ্লোরিডায় নিজেদের ঘাঁটি টিকিয়ে রাখা গভর্নর রন ডিস্যান্টিসও লড়াইয়ে আছেন। আগামী জানুয়ারিতে গভর্নর পদ ছাড়তে যাওয়া ডিস্যান্টিস সিএনএনের জেক ট্যাপারকে বলেন, ফ্লোরিডায় পয়েন্টের ব্যবধান কম হলেও সিনেটর ও গভর্নর দুই পদেই রিপাবলিকানরা জয় পেয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় থাকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সীমিত উপস্থিতির কারণে এই হারের দায় থেকে অনেকটাই মুক্ত। ট্রাম্পও কানসাসের এক অনুষ্ঠানে রুবিওর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা নিয়ে কৌতুক করেছিলেন। রুবিওকে লড়াইয়ে নামতে হলে প্রশাসন ছেড়ে ভ্যান্সের থেকে স্পষ্ট দূরত্ব তৈরি করতে হবে।
টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজও বিভিন্ন স্থানে প্রচার চালিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সমর্থিত প্রার্থীরা হেরে যাওয়ায় দলের ভেতরে সমর্থন পেতে তাঁকে বেগ পেতে হতে পারে। অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত থাকায় প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের হারের পর তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পদচ্যুত বা অভিশংসনের মুখে থাকা হেগসেথকে নতুন করে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়তে হবে।
আরকানসাসের গভর্নর ও হোয়াইট হাউসের সাবেক প্রেস সচিব সারা হাকাবি স্যান্ডার্স সহজে পুনর্নির্বাচিত হয়ে রেসে টিকে আছেন। তাঁর বাবা মাইক হাকাবি একসময় এই রাজ্যের গভর্নর ছিলেন এবং বর্তমানে ইসরায়েলে ট্রাম্পের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া ডানপন্থী রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার টাকার কার্লসন শুরু থেকেই ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করে আসছেন। দুই দলের বাইরে গিয়ে নির্দলীয়ভাবে লড়ার ইঙ্গিত দেওয়া কার্লসন মাঠে নামলে ট্রাম্পের মাগা শিবিরে বিভাজন আরও গভীর হতে পারে।




