মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত ধারার বাইরে এসে সম্পূর্ণ নতুন ভাষায় গান তৈরি এবং স্বাধীন সংগীতের বিকল্প পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এক অগ্রণী নাম তামের আবু গাজালেহ। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এই মিসরীয় শিল্পী কেবল গায়ক, সুরকার কিংবা বহু বাদ্যযন্ত্রে দক্ষ সংগীতজ্ঞই নন; একই সঙ্গে তিনি একজন সংগঠক ও প্রযোজক। কায়রোর আন্ডারগ্রাউন্ড ও স্বাধীন সংগীতজগতকে ভিত্তি দান করতে ২০০৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ইনকিউবেটর প্ল্যাটফর্ম ‘একা৩’ (Eka3)। এর আওতায় গড়ে ওঠে সংগীত লেবেল ‘মোস্তাকেল’, বুকিং এজেন্সি ‘আলমোহরেক’, প্রকাশনা সংস্থা ‘আওয়াভ’ এবং অনলাইন সংগীত পত্রিকা Ma3azef.com।
বার্লিনে নিজ দল ‘আলিফ’-এর সফর চলাকালে সাউন্ডচেকের ঠিক আগে সংগীত সাংবাদিক এরিক ম্যান্ডেলের সঙ্গে মুখোমুখি বসেছিলেন তামের। দীর্ঘ সেই কথোপকথনে কায়রোর আন্ডারগ্রাউন্ড সংগীত, নিজস্ব অ্যালবাম ‘থুলথেইং’, স্বাধীন সংগীতের সংকট এবং দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে শিল্পীর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন তিনি।
তামেরের প্রতিষ্ঠিত সংগীতদল ‘আলিফ’-এর সূচনা ঘটেছিল ২০১২ সালে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীদের একত্র করে ভৌগোলিক সীমান্ত মুছে ফেলার ভাবনা থেকে এই ব্যান্ডের জন্ম। দলটিতে ফিলিস্তিনি তামের ছাড়াও রয়েছেন মিসরীয় ইলেকট্রনিক সংগীতশিল্পী মরিস লুকা, লেবানিজ পারকাশনবাদক খালেদ ইয়াসিন, বেজবাদক বাশার ফাররান এবং ইরাকি-ব্রিটিশ উদবাদক খাইয়াম আল্লামি। গত বছর তাদের অ্যালবাম ‘হোয়াটএভার ইট ফলস’ আত্মপ্রকাশ করে। তামের জানান, আলাদা দেশ থেকে আসা শিল্পীদের নিয়ে কাজ করার সুবিধা হলো পছন্দের মানুষকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকে, কিন্তু রিহার্সাল বা কনসার্টের জন্য সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করতে গিয়ে প্রায়ই বিমানে চড়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে ছুটতে হয়।
ঐতিহাসিকভাবে গত ষাট বছর ধরে কায়রো ও বৈরুত ছিল আরব অঞ্চলের প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু। তবে তামের লক্ষ্য করেছেন, বর্তমানে জর্ডান, ফিলিস্তিন, তিউনিসিয়া ও মরক্কোর শিল্পীরাও ইন্টারনেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছেন। এখন কায়রোয় বসে মরক্কোর কোনো শিল্পীর কাজ শোনা ও তার সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করা সহজ হয়ে গেছে, যা এক দশক আগেও ভাবা যেত না।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবকাঠামোগত ঘাটতি কায়রোর আন্ডারগ্রাউন্ড সংগীতকে সবসময়ই এক অনিশ্চিত উত্থান-পতনের মধ্যে রাখে। সেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রধানত চটুল পপ ও বাণিজ্যিক সংগীতে সীমাবদ্ধ, আর সরকারি অর্থায়ন সামান্য কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ঘেরাটোপে আটকে থাকে। ফলে স্বাধীন শিল্পীদের সম্পূর্ণ নিজ শক্তিতে টিকে থাকতে হয়। কায়রোতে প্রতিটি পরীক্ষামূলক শোর জন্য শত শত উৎসুক শ্রোতা মিললেও ভেন্যু ভাড়া করার উচ্চ খরচ, সস্তা অবকাঠামো এবং সরঞ্জাম ভাড়ার সহজ সুযোগ না থাকায় শিল্পী ও শ্রোতাদের স্থায়ীভাবে যুক্ত রাখার পথটি বাধাগ্রস্ত হয়।
এই শূন্যতা পূরণের তাগিদ থেকেই ‘একা৩’ ও তার সহযোগী লেবেল ‘মোস্তাকেল’-এর সূচনা। প্রায় নয় বছর আগে যখন মোস্তাকেল যাত্রা শুরু করে, তখন আরবি বিকল্প সংগীতের আঙিনা ছিল বেশ শুষ্ক। প্রাথমিক পর্যায়ে বাছবিচার না করে আন্দোলন তৈরির স্বার্থে যেকোনো ধরনের ব্যতিক্রমী কাজ প্রকাশ করা হতো। কালক্রমে সেখানে নিজস্ব ধারা গড়ে ওঠে; যেমন মরিয়ম সালেহ ও জেইদ হামদানের গানে ট্রিপ-হপ ও ইন্ডি পপের মেলবন্ধন বা জর্ডানের এল মোরাব্বা ব্যান্ডের সাইকেডেলিক রক। মোস্তাকেল মূলত এটিই দেখতে চায় যে গানটি নতুন কোনো অভিজ্ঞতা বা ভাষা সৃষ্টি করছে কি না।
তামের আবু গাজালেহের নিজের জীবনের শুরুটাও ছিল ব্যতিক্রমী। মাত্র দুই বছর বয়সে মায়ের প্রতিষ্ঠিত গানের দলে প্রথম গাইতে শুরু করেন তিনি। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা বাদ্যযন্ত্র বাজানো ও সুর সৃষ্টির মাধ্যমে শুরু হয় সংগীতের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পাঁচ থেকে পনেরো বছর বয়সের মধ্যে রেকর্ড করা গানগুলো একত্র করে ১৫ বছর বয়সে তিনি নিজের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ করেন, যেখানে তার কণ্ঠ পরিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ রয়ে গেছে।
পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিন থেকে নির্বাসিত তার পরিবার অসলো চুক্তির পর রামাল্লায় ফেরার সুযোগ পায়। তামেরের মা পিএলওর সাধারণ পরিষদের সদস্য হওয়ায় ফিলিস্তিনে পিএলওর এক বৈঠকে গিয়ে তিনি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করতে সক্ষম হন। রামাল্লায় পৌঁছে তামের এডওয়ার্ড সাঈদ ন্যাশনাল কনজারভেটরিতে প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ খালেদ জুবরানের কাছে সুরারোপ, সংগীততত্ত্ব ও ইতিহাস শেখেন। তাঁর প্রধান বাদ্যযন্ত্র হলো উদ ও বুজুক।
তামেরের বহুল আলোচিত অ্যালবাম ‘থুলথেইং’ প্রায় নয় বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে তৈরি হয়েছিল। রানি কুইনের ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’র প্রভাবে প্রচলিত সরলরৈখিক গানের কাঠামো ভেঙে তিনি এতে সুরের নতুন বিন্যাস ঘটান। এই অ্যালবামে কায়স ইবন আল-মুলাওয়াহর প্রাচীন আরবি কবিতা ‘হোভ’ ব্যবহার করতে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী কবিতার ছন্দ ভেঙে নতুন সংগীতিক ছন্দ আরোপ করেন তিনি, যা সনাতনপন্থী শ্রোতাদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি করেছিল। এর পাশাপাশি শিল্পী মরিয়ম সালেহের ‘মেশ বাঘান্নি’ অ্যালবামে মিসরীয় লোকসংগীত ও রকের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে মরিয়মের তীব্র ও নিজস্ব কণ্ঠস্বরকে কেন্দ্রে রেখে প্রযোজনা করেন তামের।
মিসরের স্থানীয় সংগীতের চালচিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তামের জানান, কায়রোর আসল আন্ডারগ্রাউন্ড ধারার প্রাণ হলো ‘শাবি’ এবং ‘মাহরাগানাত’। এগুলোর রয়েছে নিজস্ব এলাকাভিত্তিক সাংস্কৃতিক বলয় ও অনুষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম। অন্যদিকে হিপ-হপ জনপ্রিয় হলেও তা এখনো মূল লাইভ আন্দোলনে রূপ না নিয়ে মূলত ইন্টারনেটকেন্দ্রিক রয়ে গেছে। পাশাপাশি মিসরের টেকনো প্রযোজকেরা কৃত্রিমতা এড়াতে প্রায়ই ঐতিহ্যবাহী আরবি সংগীত উপাদান থেকে দূরে থাকেন।
আরব সংগীত জগতে ‘মিসরীয় ভবিষ্যতবাদ’ বা ফিউচারিজম গড়ে উঠছে কি না—এমন প্রশ্নে তামের অভিমত দেন যে, দীর্ঘকাল বিশ্বসংগীতের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর ইন্টারনেট প্রযুক্তির কল্যাণে শেষ এক দশকে নতুন পরিবর্তন শুরু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে কী নতুন চিন্তা হচ্ছে, তা দ্রুত অনুধাবন করে স্থানীয় শিল্পীরা ঐতিহ্যের ভেতর থেকে যেমন নতুন সুর খুঁজছেন, তেমনি বাইরের ধারার সঙ্গেও মেলবন্ধন ঘটাচ্ছেন। নির্দিষ্ট কোনো তকমা আঁটার সময় না হলেও, আরবি সংগীতে ভবিষ্যতের একটি অচেনা ও নতুন দুনিয়া তৈরির পথ উদ্ভাবন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।




