১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধারের কৃতিত্ব জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) নয় বলে দাবি করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, জাসদ নয়, বরং সেনাবাহিনীই জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছিল। শনিবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি (রাওয়া) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাসদের প্রচলিত দাবি বা বয়ান সঠিক নয়। মূলত টু ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন কর্নেল মহিউদ্দীন। এছাড়া ফোর বেঙ্গলও তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়েছিল। ৭ নভেম্বর ভোর ৬টার দিকে তিনি টু ফিল্ডে গিয়ে দেখতে পান, জিয়াউর রহমান তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন্স (ডিএমও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল নুরউদ্দীন খানকে পাশে নিয়ে ইউনিট অধিনায়কের কার্যালয়ে বসে আছেন।
ঘটনার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা জানান, ভোর সাড়ে ৬টার দিকে কর্নেল তাহের গণবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে টু ফিল্ডে আসেন। সেখানে তিনি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সাথে বাইরে গিয়ে সৈনিকদের সামনে ২১ দফা বা ১৭ দফা দাবি মেনে নেওয়ার জন্য চাপ দেন। তবে জিয়াউর রহমান তাতে সাড়া দেননি। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, রেডিও ও টেলিভিশনে তিনি আগেই নিজের বক্তব্য পাঠিয়ে দিয়েছেন, ফলে তিনি অন্য কোথাও যাবেন না।
এম সাখাওয়াত হোসেন আরও মন্তব্য করেন, জিয়াউর রহমানকে সে সময় বাইরে নিয়ে যেতে পারলে তিনি আর ফিরে আসতেন না এবং কর্নেল তাহের ও জাসদের একটি অংশ নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারত। কিন্তু ব্যাটালিয়ন দুটির সদস্যরা তাকে অন্য কোথাও যেতে দেননি এবং টু ফিল্ড তাকে আগেই উদ্ধার করে নিয়ে আসে। ওই উত্তাল পরিস্থিতিতে কর্নেল হুদা কেন পুরো একটি ব্যাটালিয়ন (১০ বেঙ্গল) নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেছিলেন, তা আজও এক বড় রহস্য বলে উল্লেখ করেন সাখাওয়াত হোসেন। জাসদের গণবাহিনীর পাশাপাশি এমন সামরিক পদক্ষেপের প্রকৃত উদ্দেশ্য তুলে ধরতেই তিনি এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন।
জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক দর্শনের কথা স্মরণ করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তাঁর সততা ও সাহসিকতা ছিল অনন্য। হকি মাঠে লোডেড rifle হাতে থাকা উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো প্রতিশোধস্পৃহা ছাড়াই তিনি তাদের শান্ত করেছিলেন। তিনি সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্যকার বিভেদ দূর করে ঐক্যের সূচনা করেন এবং সামরিক বাহিনীর বিস্তার ঘটান। এছাড়া ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে বের হয়ে তিনি চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ জোরদার করেন এবং আল কুদস কমিটিতে কার্যকর ভূমিকা রাখেন। দেশে দীর্ঘকাল ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি থাকার সমালোচনা করে তিনি ইরানের থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান এবং বিগত ১৫ বছরে ধ্বংস হওয়া সামরিক পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনার তাগিদ দেন।
একই আলোচনা সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ ও নির্বাচন নীতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোদাসসের হোসেন خان বীর প্রতীক। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, তড়িঘড়ি করে অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে জাতির ক্ষতি করা হয়েছে, যা সরকারের ম্যান্ডেট ছিল না। ছাত্র-জনতার দেওয়া দায়িত্ব অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার, স্বৈরাচার ও হত্যার বিচার না করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের চাপে নির্বাচন দেওয়া ড. ইউনূসের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, ভূ-রাজনীতি গবেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. আমিনুল করিম, রাওয়া চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট আবু রুশদ এবং মেজর (অব.) মো. দেলোয়ার হোসেন খান।




