অতীতের ধারাবাহিকতায় আবারও দেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র চলছে উল্লেখ করে এসবের কড়া জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করা কিংবা ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে দাবিয়ে রাখার যেকোনো অপচেষ্টা একাত্তর, নব্বই এবং ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের মতো প্রতিহত করা হবে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য র্যালি-পূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই বার্তা দেন।
রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হওয়া র্যালিটি ফকিরাপুল ও কাকরাইল মোড় পেরিয়ে বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নেয়। নেতাকর্মীদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আলোকচিত্র সংবলিত প্ল্যাকার্ড। বিএনপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে র্যালিটি কাকরাইল, প্রধান বিচারপতির বাসভবন সড়ক, রমনা পার্ক, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামোটর, ফার্মগেট ও ইন্দিরা রোড হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউতে গিয়ে শেষ হয়, যেখানে সমাপনী বক্তব্য দেন তিনি। সন্ধ্যায় সেখানে একটি কনসার্টের আয়োজন করা হয়। র্যালি শুরুর সময় অস্থায়ী মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ ও এজেডএম জাহিদ হোসেন।
সমাবেশে সমবেত মানুষের সমর্থন চেয়ে সরকারপ্রধান বলেন, দেশের ভেতর কিংবা বাইরে থেকে আসা যেকোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকামী জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেন, ৭ই নভেম্বর হলো জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বাক-স্বাধীনতার দিন। কোনো পরাশক্তির প্রতি আনুগত্য না রেখে তিনি স্লোগান তুলে ধরেন—‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে অপশক্তিকে যেভাবে জনগণ বিতাড়িত করেছে, সেই চেতনা ধারণ করেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
একই দিনে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত গ্রাম পুলিশদের মহাসমাবেশে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সকাল পৌনে ১২টার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছান। সারাদেশ থেকে আসা প্রায় ৪১ হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্যের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, গ্রামীণ জনপদ সুরক্ষিত থাকলে পুরো বাংলাদেশ নিরাপদ থাকবে। স্থানীয় অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ ও প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে গ্রাম পুলিশের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
মহাসমাবেশ থেকে গ্রাম পুলিশদের আর্থ-সামাজিক ও পেশাগত মান উন্নয়নে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়া বেশ কয়েকটি নতুন সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাধারণ গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মাসিক বেতন ১০ হাজার ৫০০ টাকা এবং প্রধানদের বেতন ১১ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া সদস্য ও প্রধানদের মাসিক ১৫০ টাকা মোবাইল বিল প্রদান করা হবে। অবসরকালীন আনুতোষিক ভাতা বাড়িয়ে সাধারণ সদস্যদের জন্য ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং প্রধানদের জন্য ৮০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে সাধারণ সদস্যরা পাবেন ৫০০ টাকা (আগে ছিল ৩০০ টাকা) এবং প্রধানরা পাবেন ৬০০ টাকা।
এছাড়া ‘মহল্লাদার’ ও ‘দফাদার’ পদবি পরিবর্তন করে যথাক্রমে ‘গ্রাম পুলিশ সদস্য’ ও ‘গ্রাম পুলিশ প্রধান’ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে প্রতিটি ইউনিয়নে দুজন করে নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ এবং তাদের জন্য ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা চালু করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়নে একটি দীর্ঘ সড়ক গ্রাম পুলিশের নামে নামকরণ করে দুই পাশে গাছ লাগানো হবে, যা বিক্রি করে পাওয়া অর্থ গ্রাম পুলিশদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। সাইকেল বিতরণের সময়সীমাও ৫ বছর থেকে কমিয়ে সাড়ে ৩ বছরে আনা হয়েছে। অনুষ্ঠানে দেশের ৮টি বিভাগের সেরা ৮ জন সদস্যকে সম্মাননা ও অর্থ পুরস্কার দেওয়া হয়। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সমাজ কল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সিটি কর্পোরেশনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দিবসের অপর এক কর্মসূচিতে ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি স্টেডিয়ামে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও স্কাউটদের মনোমুগ্ধকর ডিসপ্লে উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী ও ডা. জুবাইদা রহমান। সেখানে বক্তব্য প্রদানকালে ৭ই নভেম্বরকে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘ম্যাগনাকার্টা’ হিসেবে অভিহিত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ের জাতীয় ঐক্য গড়ে দিয়েছিল। সত্য ইতিহাসকে আত্মপরিচয় ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের প্রেরণাদায়ী শক্তি উল্লেখ করে তিনি তরুণ প্রজন্মকে সিপাহী-জনতার বিপ্লবের চেতনায় উজ্জীবিত থাকার আহ্বান জানান। উক্ত অনুষ্ঠানে তিন বাহিনীর প্রধানগণসহ সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।




