প্রবাদ রয়েছে, ‘যার দুটি দিন সমান হলো, সে ক্ষতিগ্রস্ত; আর যার আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে খারাপ হলো, সে ধ্বংসপ্রাপ্ত।’ ইসলামি জীবনদর্শনে এই কথার তাৎপর্য গভীর। সময় একমুখী এবং একবার চলে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। এ কারণে একজন মুমিনের জীবনে প্রতিটি নতুন দিন কেবল আরেকটি সূর্যোদয় নয়, বরং নিজের ভুল শুধরে আত্মউন্নয়নের এক নতুন সুযোগ আনে।
আজকের দিনটিকে গতকালের চেয়ে ভালো করতে হলে শুরুতেই অতীতের হিসাব-নিকাশ করা প্রয়োজন, যাকে ইসলামে ‘মুহাসাবা’ বা আত্মপরীক্ষা বলা হয়ে থাকে। এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) বলতেন, ‘তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই তোমরা নিজেদের হিসাব নিজেরা নাও এবং চূড়ান্ত হাশরের পেশির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)। দিনের শুরুতে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে অতীত কর্মের ভালো-মন্দের মূল্যায়ন করা দরকার। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা সুরা হাশরের ১৮ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তির লক্ষ্য করা উচিত যে আগামীকালকের জন্য সে কী পাঠিয়েছে।’
গতকাল কোনো পাপকাজ, অসদাচরণ বা অলসতায় সময় অপচয় হয়ে থাকলে তা শুধরে নেওয়ার সংকল্প করাই হলো নতুন দিনকে সুন্দর করার অন্যতম উপায়। অতীত ভুলের অনুশোচনা প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘অন্যায়ের পরপরই কোনো ভালো কাজ করো, যা সেই অন্যায়কে মুছে দেবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৮৭)। ফলে গতকালের ত্রুটির ক্ষতিপূরণে আজ বাড়তি একটি সৎকাজ করা হলে জীবনে ইতিবাচক ভারসাম্য ফিরে আসে।
একটি সুন্দর সকাল পুরো দিনের গতিপথ বদলে দেয়। ঘুম থেকে উঠে পরম করুণাময়ের কাছে জীবন পাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও দোয়ার মাধ্যমে শুভসূচনা করা উত্তম। বিশেষ করে ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত অলসতা না করে সময়টুকু দিনের কাজের পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহার করা বরকতময়। সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ধরে এগোলে সময়ের অপচয় বন্ধ হয় এবং নতুন দিনে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
যেকোনো কাজের কল্যাণ নির্ভর করে মানুষ কী উদ্দেশ্যে তা করছে তার ওপর। জীবিকার সন্ধান, পড়াশোনা, পরিবারকে সময় দেওয়া কিংবা সামাজিক সেবা—সব জাগতিক কর্মকাণ্ডও যদি সৎ নিয়তে সম্পন্ন করা হয়, তবে তা ইবাদতে পরিণত হয়। রসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই সমস্ত কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)। প্রতিদিন সকালে কাজের পেছনে মহৎ উদ্দেশ্য যুক্ত রাখতে পারলে মনে আত্মিক প্রশান্তি ও একাগ্রতা তৈরি হয়।
এক দিনে রাতারাতি পুরো জীবন বদলে ফেলা যায় না; বরং এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা। গতকালের তুলনায় আজ অন্তত একটি বাড়তি ভালো কাজ করা বা একটি খারাপ অভ্যাস ছাড়ার চেষ্টা করাই প্রকৃত সফলতা। মহানবী (সা.) হাদিসে উল্লেখ করেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)। প্রতিদিন একটি শুভ চর্চা যুক্ত করতে পারলে আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ হয়। মনীষীদের উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনে রজব আল-হাম্বলি তাঁর ‘জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম’ (১/৩৮২, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০১) গ্রন্থে লিখেছেন, ‘হে আদম সন্তান, তুমি তো শুধু কতগুলো দিনের সমষ্টি; যখনই একটি দিন চলে যায়, তোমার জীবনের একটি অংশও ক্ষয় হয়ে যায়।’ তাই প্রতিদিন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় ও আত্মউন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই কাম্য।




