একসময় শরীয়তপুর পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাঘিয়ার এই এলাকাটি ছিল ফসলি মাঠের বুক চিরে চলে যাওয়া এক নির্জন মেঠো পথ। পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এক বটগাছের ছায়ায় ক্লান্ত পথচারীরা বিশ্রাম নিতেন, আর স্থানীয় কিশোর-তরুণেরা সেখানে আড্ডা ও খেলাধুলায় মেতে থাকতেন। ৩৬ বছরের ব্যবধানে সেই ফসলি জমির চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন সেখানে গড়ে উঠেছে বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা।
এলাকাটির নামকরণের পেছনে রয়েছে এক স্মৃতিকথা। একসময় এলাকাটি ‘কোটাপাড়া’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু প্রায় ৭৫০ মিটার পশ্চিমে কীর্তিনাশা নদীর তীরে একই নামের আরেকটি গ্রাম থাকায় পথচারী ও যানবাহনের চালকেরা বিভ্রান্তিতে পড়তেন। এই সমস্যা দূর করতে স্থানীয় কিশোর-তরুণেরা বটগাছের নিচে নিয়মিত আলোচনায় বসতেন। ১৯৯০ সালের নভেম্বরের এক বিকেলে মকবুল চৌকিদার জায়গাটির নাম ‘প্রেমতলা’ রাখার প্রস্তাব দিলে সবাই তাতে সম্মতি জানান। পরদিন কয়েকজন তরুণ বটগাছের সঙ্গে ‘প্রেমতলা বাসস্ট্যান্ড’ লেখা একটি টিনের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন। বর্তমানে মকবুল চৌকিদার প্রেমতলা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শরীয়তপুর ১৯৮৪ সালের মার্চে জেলা হিসেবে ঘোষিত হয় এবং পরের বছর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৮ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মেঠো পথটি সংস্কারের পর সেখানে বাস, রিকশা ও ভ্যান চলাচল শুরু হয়। ১৯৮৯ সালে শরীয়তপুর জেলায় প্রথম বাস চলাচল শুরু হলে সদর উপজেলার আঙ্গারিয়া নদীর ঘাট থেকে প্রেমতলা হয়ে নড়িয়া উপজেলার বাঁশতলা পর্যন্ত রুটটি চালু হয়। সেই সময় বাস চালক সবুজ ভূঁইয়া নিয়মিত এই পথে গাড়ি চালাতেন। তিনি জানান, তখন রাস্তার পাশের সেই বটগাছটিই ছিল যাত্রীদের ওঠানামার প্রধান কেন্দ্র।
১৯৯০ সালে প্রেমতলা বাসস্ট্যান্ড চালুর সময় সেখানে মাত্র দুটি চায়ের দোকান ছিল। বর্তমানে প্রেমতলা বাজারে প্রায় ১২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং বিসিক শিল্পনগরীতে অন্তত ৩০টি শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এখানে চা ও কনফেকশনারির দোকান চালানো ৭০ বছর বয়সী আবদুর রব হাওলাদার জানান, একসময় যে জমিতে তিনি চাষাবাদ করতেন, সেখানেই এখন তাঁর ব্যবসা।
যে বটগাছকে ঘিরে প্রেমতলার নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেটি প্রায় ১০ বছর আগে কেটে ফেলা হয়েছে। বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক পলাশ চন্দ্র রায়সহ স্থানীয়রা আজও সেই বটগাছের ছায়া ও মেঠো পথের স্মৃতি রোমন্থন করেন। ইট-পাথরের অবকাঠামো আর যান্ত্রিক ব্যস্ততায় সেই নির্জন প্রান্তর হারিয়ে গেলেও, কয়েক তরুণের আড্ডা থেকে জন্ম নেওয়া নামটি আজও প্রেমতলার ব্যস্ত বর্তমানের আড়ালে বেঁচে আছে।




