সূর্যোদয়ের দেশ জাপান বাংলাদেশের এক পরীক্ষিত বন্ধু। বাংলাদেশের যে কোনো প্রয়োজনে ও উন্নয়নে এই দেশ সব সময়ই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফর করছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাপানে এটি তার প্রথম সফর। তবে ইতিহাসের এক চমৎকার ধারাবাহিকতায়, এর আগে তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া দুবার করে জাপানে মৈত্রীর বন্ধন দৃঢ় করতে গিয়েছিলেন। সেই চেরি ব্লসম আর সামুরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী জাপানের বুকে এবারও রচিত হতে যাচ্ছে ঢাকা-টোকিও মৈত্রীর এক নতুন উপাখ্যান। আশা করা হচ্ছে, আসন্ন এই সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উন্নয়নে এক বিরাট দ্বিপাক্ষিক অর্জন এনে দেবে।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, যখন জাপান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে একেবারে প্রথমদিকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এর চেয়েও বড় সত্য হলো, এই মৈত্রীর বীজ বপন করা হয়েছিল যুদ্ধের ঠিক পরপরই দুর্দিনের অবিনাশী বন্ধনে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন ধুঁকছিল, তখন সুদূর টোকিও এবং ওসাকার স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে এবং সাধারণ জাপানি নাগরিকরা তাদের সঞ্চয় থেকে তহবিল সংগ্রহ করে সাহায্য পাঠিয়েছিল বাংলাদেশের যুদ্ধপীড়িত মানুষের জন্য।
এ ঘটনাই শুধু নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন মিত্রবাহিনী জাপানের শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করার জন্য ‘টোকিও ট্রায়াল’ গঠন করে, তখন সেই প্যানেলের একমাত্র বাঙালি বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল জাপানের পক্ষে ঐতিহাসিক এক ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, যুদ্ধাপরাধের এই এক পাক্ষিক বিচার আইনিভাবে সঠিক নয়। জাপানিরা সেই ঘটনা সব সময় স্মরণে রাখে।
জাপানি সংসদের প্রভাবশালী সদস্য ও মন্ত্রী তাকাশি হায়াকাওয়া আজ বেঁচে নেই। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। জাপানের রাজনীতিতে তিনি খুবই প্রভাবশালী ছিলেন। সে দেশের সবার কাছে ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র। বাংলাদেশের প্রতি ‘তাকাশি হায়াকাওয়া’ এতটাই অনুরাগী ছিলেন যে, তাকে জাপানে ‘মিস্টার বাংলাদেশ’ নামে ডাকা হতো। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে জাপানে তীব্র জনমত গড়ে তোলেন হায়াকাওয়া। ১৯৭০-এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর এ দেশের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেন। হায়াকাওয়া ছিলেন জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড সলিডারিটি ফ্রন্টের অন্যতম রূপকার। জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঠিক পরপরই ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে সরকারের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে সংসদীয় প্রতিনিধি দল নিয়ে তাকাশি হায়াকাওয়া ঢাকায় আসেন। সোনারগাঁও হোটেলে তার একটি স্মৃতিফলকে লেখা আছে—‘বর্তমান যুগে মানব জাতিকে টিকে থাকতে হলে একটি পরিবার হিসেবে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বাংলাদেশের প্রতি আমার ভালোবাসা ও আবেগ হলো এই আদর্শের একটি চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে একটি পরীক্ষা।’




