প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে কেন্দ্র করে একটি নজিরবিহীন ও বিরল কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা সামনে এসেছে। জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলীকে প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে টোকিওতে না রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৫ই অক্টোবরের এক চিঠিতে তাকে ঢাকায় ফেরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেবল সফরকালীন সময়েই নয়, সফরসংক্রান্ত কোনো ধরনের প্রস্তুতি বা সমন্বয়ের কাজের সাথেও তাকে রাখা হচ্ছে না।
কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত জুন মাসের চীন সফরের সময় দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে একটি বিশেষ অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং ফ্যাসিবাদী ও সামরিকতাবাদী পুনরুত্থানের বিরোধিতা নিয়ে ওই অনুচ্ছেদটি ছিল। টোকিও এই অনুচ্ছেদটিকে নিজেদের জন্য স্পর্শকাতর ও অস্বস্তিকর বলে মনে করে। জাপান মনে করে, এই অনুচ্ছেদটি প্রণয়নে রাষ্ট্রদূত দাউদ আলীর ভূমিকা ছিল এবং তাকে চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবেই বিবেচনা করে টোকিও। এই অস্বস্তির কারণেই প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে রাষ্ট্রদূতকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। টোকিও এই চুক্তিগুলোর গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা চায়। রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় রাখার সিদ্ধান্তের পেছনে এটিও একটি অন্যতম কারণ হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।
সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকদের অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন। তাদের প্রশ্ন, যদি দাউদ আলীর কোনো ভূমিকা নিয়ে আপত্তিই থাকতো, তবে তা কেন আগে খতিয়ে দেখা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর সফরের ঠিক আগ মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত কেন নিতে হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সমন্বয়ের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৬ থেকে ২৯শে অক্টোবর জাপান সফর করবেন। এই সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দক্ষ কর্মী পাঠানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ৮টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি চলছে, যার মধ্যে ৩ থেকে ৪টি চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
দাউদ আলীকে দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০০৯ সালে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। সে সময় তারেক রহমানকে লন্ডনে সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। তখন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা পড়ার পর তাকে পররাষ্ট্র সার্ভিস একাডেমির ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে বদলি করা হয়েছিল।
১৫তম বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা দাউদ আলীর অবসরের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। আগামী ৭ই ডিসেম্বর তার অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) শুরু হওয়ার কথা। ২০২৪ সালের ১২ই ডিসেম্বর তিনি জাপানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এর আগে রোমানিয়ায় রাষ্ট্রদূত এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (কনস্যুলার ও কল্যাণ) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া টোকিও, প্রিটোরিয়া, লন্ডন ও চীনের কুনমিংয়েও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।




