বিশেষ প্রতিবেদক: চট্টগ্রামসহ সারা দেশের মানুষের কাছে প্রেসক্লাব একটি জনগুরুত্বপূর্ণ, অবহেলিত, নির্যাতিত মানুষের আশ্রয় স্থল। গণমাধ্যম কর্মিদের পেশাগত মান উন্নয়ন, পেশার মর্যাদা রক্ষাসহ সমাজের অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে প্রেস ক্লাব। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব গঠনের ঐতিহাসিক আদর্শকে লংঘন ও ভুলুন্ঠিত করে গেল কয়েক বছর ধরে এটিকে মদ, জুয়া, পতিতা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছে কতিপয় দুর্বৃত্ত।
গোটা সাংবাদিক সমাজের নাম ব্যবহার করে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, কোকেন পাচারকারী, ইয়াবা বিক্রেতা, মদ বিক্রেতাদের আজীবন সদস্যপদ দেয়া হয়। মাঠপর্যায়ের কর্মরত কয়েশ’ গণমাধ্যমকর্মি প্রেসক্লাবে প্রবেশ করলে তাদের নানা অজুহাতে নাজেহাল করা হতো।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক মিলনায়তনে শুরু হয় হাউজি খেলা নামের জুয়ার আসর। সাপ্তাহের ৪দিনের টাকা প্রেসক্লাব, বাকী তিনদিনের টাকা পুলিশ প্রশাসনকে দেয়া হতো। গভীর রাত অব্দি চলতো এই জুয়ার আসর, সাথে মদের মিনিবার।
সম্প্রতি বদলী হওয়া পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণ পদকে এজন্য আজীবন সদস্যপদ দেয়া হয়। জুয়ার এই টাকায় ক্লাব সদস্যদের কেউ কেউ পারিশ্রমিক হিসাবেও গ্রহন করতেন (প্রয়োজন তালিকা প্রকাশ করা হবে)।ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে চলানো হতো বেপরোয়া চাঁদাবাজি। চট্টগ্রামের এমন কোন ব্যবসায়ী নেই যাদের প্রতিমাসে চাঁদা দিতে হতো না।
ফোর এইচ গ্রুপ নামের একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে ক্লাবের নামে একটি গাড়িও নেয়া হয়েছে। গাড়িটি বর্তমানে ক্লাবের কর্মকর্তারা ব্যবহার করছে। এসব অনিয়মের সারথি করা হয় জেলা প্রশাসনকে। সাংবাদিকরা ডিসি এমনকি সচিবদেরও স্যার ডাকার নজির নেই, কিন্তু এতদিন তাই করা হতো। প্রশাসনে নতুন কর্মকর্তা যোগদান করলে তাদের সংবর্ধিত করা একটি রেওয়াজে পরিনত করা হয়। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবকে চট্টগ্রামের ভুমি অধিগ্রহণ অফিসের শাখা অফিসে পরিনত করা হয়। প্রেসক্লাবের নাম ব্যবহার করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিনত হয় এই দুর্বৃত্তরা। টাকায় কেনা হয় রাজনৈতিক দলের পদ-পদবীও।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব পরিনত হয় রাজনৈতিক দলের শাখা অফিসে। রাজনৈতিক দলের পদ-পদবী ব্যবহার করে কমিটির নেতা হয়েছেন তারা। নেতা-মন্ত্রী- এমপিদের পেছনে তল্পিবাহকের কাজ করতেন কথিত দালাল এই সাংবাদিকরা! নির্বাচন এলে টাকার ছড়াছড়ি চলতো, একেকটি ভোট বেচা-কেনা হতো এক থেকে দেড় লাখ টাকায়, যা ছিল অবিশ্বাস্য। শুধু তাই নয়, থ্রি স্টার,ফোর স্ট্রার, ফাইভ স্টার হোটেলগুলি ছিল কথিত এই ভোটারদের রাত্রিকালীন বিনোদন কেন্দ্র।
আজকে যারা প্রেসক্লাব নিয়ে মায়া কান্না করছেন তাদের সবার নিশিরাতে যাতায়ত ছিল ওইসব হোটেলে।মনোরঞ্জনের জন্য খান্দানী পতিতাদের সরবরাহ করা হতো( পতিতা নিয়ে রাত কাটানোদের তালিকা আপাতত দেয়া হলো না, প্রয়োজনে দেয়া হবে)। এমনি ক্লাবের বার্ষিক পিকনিকের হোটেলে পতিতা সরবরাহের নজিরও রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে যারা পিকনিকে যেতেন তাদের অসহায়ত্বের সাথে এসব অপকর্ম সহ্য করতে হয়েছে। একারণে অনেক সদস্য পিকনিক যাওয়াই বন্ধ করে দেন।
আরো কত যে দুর্গন্ধ তা বলে লিখে শেষ করা যাবে না! এসব অপকর্ম নিয়ে সাধারণ গণমাধ্যমকর্মিদের ক্ষোভের শেষ নেই! এসব অপকর্মের কি জবাব দিবে তারা?
এবার আসা যাক প্রশাসনিক ও আইনগত দুর্নীতি কথা
বিগত ৩০/১০/১৯৯০ সালে জেলা প্রেসক্লাব সমাজ সেবা কার্যালয় থেকে নিবন্ধন গ্রহন করে। নিবন্ধিত নাম হচ্ছে, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব(রেজি: নং চট:১৫৮৩/৯০)। মহামান্য হাইকোর্ট সর্বশেষ ২০২২সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটার তালিকার অনিয়ম নিয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়।এ প্রেক্ষিতে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ও আইন অনুযায়ী নির্বাচনের নির্দেশ দেয়। ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে কমিটির গঠন করে, যা বেআইনি এবং সমাজসেবা কার্যালয়ে অনুমোদন বিহীন। এছাড়াও
২০১৮ সালে হাইকোর্ট সেচ্ছাসেবী আইনের ৭ধারা অনুসরণ করে ক্লাবের কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেয় তাও মানা হয়নি।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য এম.নাসিরুল হক, অঞ্জন কুমার সেনসহ ৩৯জন সদস্য ক্লাবের প্রশাসনিক অনিয়মসহ ১কোটি ২৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ এর অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা গ্রহনের লিখিত দাবি জানায়। সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অঞ্জন কুমার সেন, জসিম চৌধুরী সবুজ এবং নাজিমুদ্দিন শ্যামলের নেতৃত্ব গঠিত তদন্ত কমিটি ক্লাবের অর্থ আত্মসাতের সত্যতা পায়। এ বিষয়ে দুদকের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ করে।সেই তদন্ত কমির রিপোর্টও ধামা চাপা দেয়া হয়। জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে তদন্তেও সত্যতা পাওয়া যায়। এসব অনিয়ম ধামাচাপা দিতে আইনকে অমান্যকরে পরষ্পর যোগসাজশে গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে, বেআইনি ভাবে গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের বিষয়ে একটি মামলা চুড়ান্ত পর্যায়ে আদালতে রয়েছে।

প্রেসক্লাবের বঙ্গবন্ধু হল নির্মাণ নিয়ে ৪কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী গৃহায়ন ও গণপুর্ত মন্ত্রনালায় বঙ্গবন্ধু হল নির্মানের জন্য চার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। সরকারী বরাদ্দে নির্মিত হলটি সালের পহেলা নভেম্বরে শেখ হাসিনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্ভাধন করেন। কিন্তু সরকারী এই টাকা লুঠপাট করে হলটি ফাস্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের মাধ্যমে নির্মানের কথা প্রচার করে প্রেস ক্লাবের সংশ্লিষ্ঠ ডাকাত গোষ্টি।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সদস্যরা গুটি কয়েক দুর্বৃত্তের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে ছিল। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নানাভাবে সদস্যদের অবহেলা, মানষিক নির্যাতন চলানো হতো। টাকার জোরে তাদের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। এখন দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে সাধারণ সদস্যরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। সাধারণ সদস্যরা এসব দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি করেছেন। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবকে মুক্তবুদ্ধির চর্চা কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা, পেশার মর্যাদা রক্ষাসহ সকল পেশাদার সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবকে ঘিরে যে অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে ধীরে ধীরে সবাই বিচারের আওতায় আসবে। এরমধ্যে ক্লাবের প্রশাসনিক অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ জমা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিবের নেতৃত্বেও তদন্ত শুরু হয়েছে। তাছাড়াও প্রেস ক্লাবের নেতৃত্বদানকারী লুঠেরাদের সরকারী যেসব কর্মর্তারা অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে তাদের প্রতি করজোরে মিনতি আপনারা তাদেরকে এ সুযোগ এ দিবেন না।




