বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ শতাংশ বা ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষই বর্তমানে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত রয়েছেন। উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও দেশে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মিলছে না। ফলে স্নাতকদের প্রায় ৪৪ শতাংশই জীবিকার তাগিদে অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাত বা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি অত্যন্ত ধীর এবং সাম্প্রতিক সময়ে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মী নিয়োগের গড় হারও কমেছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ্যে আনা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাটি জানিয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামনে বিপুল তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সুফল নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, তবে সেই সময় খুব দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। ২০৪৫ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যার অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায় স্পর্শ করবে, যা কাজে লাগাতে হাতের কাছে সময় রয়েছে প্রায় দুই দশক। জনমিতিক লভ্যাংশের শতভাগ সুবিধা পেতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও কাঠামোগত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অতি জরুরি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০৪৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া সামগ্রিকভাবে বার্ধক্যপ্রবণ অঞ্চলে রূপ নিতে পারে। তখন এই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ বা তার বেশি মানুষের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তারও বেশি। বাংলাদেশে অনুরূপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে ২০৫১ সাল নাগাদ। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট সতর্ক করে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফলে কালক্ষেপণ না করে এখনই উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সুবিধা ও প্রস্তুতি নেওয়ার কাজ শুরু করতে হবে।
বিশ্বব্যাংক তাদের পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করে জানায়, কর্মক্ষম বয়স কাঠামোর এই অনুকূল সুবিধাকে বাংলাদেশ এখনো প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে পারছে না। মূলত দেশে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, শ্রমবাজারে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিদ্যমান ঘাটতিই প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, বাজারে চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনে তরুণদের সহায়তা করা, উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশের বাধা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ ও আর্থিক নিরাপত্তা জোগাতে এখন থেকেই নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও তুলে ধরা হয়েছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার মাত্র ১৭ শতাংশ কর্মক্ষম মানুষ পেনশন ব্যবস্থায় অবদান রাখার সুযোগ পান এবং প্রবীণদের মধ্যে অর্জিত পেনশন সুবিধা ভোগ করেন কেবল ১০ শতাংশ। এই অসমতা ও জটিলতা কাটাতে বিশ্বব্যাংক দেশের দীর্ঘমেয়াদি সেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার সুপারিশ পেশ করেছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে সহায়ক অর্থায়ন এবং নারী কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।




