ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার সাড়ে ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেনি ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। দীর্ঘ এই সময়েও হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়কারীদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। প্রায় ১০ মাস ধরে ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইভ ভিডিও পর্যালোচনা করলেও হামলার ছক কারা একেছিল, কত দিন প্রস্তুতি চলেছিল কিংবা এতে কোনো রাজনৈতিক বা আর্থিক সহায়তা ছিল কি না—সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানাই থেকে গেছে।
মামলায় বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হওয়া ৩৯ জন আসামির সবাই এখন জামিনে মুক্ত রয়েছেন। প্রথম আট দিনে তেজগাঁও থানার পুলিশ ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল, যার পর তদন্তের দায়িত্ব ডিবিতে হস্তান্তরিত হয়। ডিবি পরবর্তী ১০ মাসে আরও ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। তবে গত জুলাইয়ে একজনকে গ্রেপ্তার দেখানোর পর নতুন আর কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫ জনকে প্রথমে ডেইলি স্টার ভবনে হামলা এবং একজনকে অন্য একটি মামলায় আটক করার পর প্রথম আলোর মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। ডিবির বর্তমান তদন্ত তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন করে আর কোনো আসামি শনাক্ত করার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কারওয়ান বাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুই মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিলের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, 'আগামী দুই মাসের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিলের জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। তারপর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।' তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিচারিক কার্যক্রমে সবার সহযোগিতা চেয়ে দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করা হবে যেন জাতি এমন ঘটনা আর না দেখে। তবে সেই ঘোষণার পর আট মাস পার হয়ে গেলেও তদন্তের কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতি হয়নি। চার মাস আগে ডিবিপ্রধান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে অগ্রগতি জানিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
তদন্তের স্থবিরতা নিয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, তদন্ত নিশ্চিত করতে ডার্ক ওয়েবের একটি বিশেষ গ্রুপকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারাও নতুন কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। তদন্তে ধীরগতির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, 'আমরা যখন ধরাধরি শুরু করি, তখন তাঁরা ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট ডিলিট করে ফেলেন। প্রথম দফায় যেভাবে ধরপাকড় করেছিলাম, পরে সেভাবে আর পারিনি। মোবাইল ফোনে উসকানি দিয়েছে এমন কিছু লোক নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু মোবাইল লোকেশনে ঘটনাস্থলে উপস্থিতি কিংবা লিংক পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তাঁদের মামলায় রাখা যায়নি।' চার্জশিটের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ডিবিপ্রধান বলেন, 'আপনারা বললে আমরা চার্জশিটের (অভিযোগপত্র) দিকে যেতে চাই।'
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা, ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ মিনহাজ উদ্দিন জানান, তিনি এই মামলার তৃতীয় তদন্ত কর্মকর্তা এবং আগের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ত্রিদীপ বড়ুয়ার কাছ থেকে নথি বুঝে পেয়েছেন। হামলার রাতের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। তিনি জানান, আগের তদন্ত কর্মকর্তা ছয়জন আসামির মোবাইল ফোন জব্দ করে সিআইডিতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন, যার প্রতিবেদন এখনো পৌঁছায়নি। মিনহাজ উদ্দিন আরও জানান, হামলায় জড়িত ঢাকার একটি মাদ্রাসার আরও দুজনকে নতুন করে শনাক্ত করা হয়েছে, তবে তাঁদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া ও উসকানি দেওয়া কয়েকজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতিপূর্বে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁদের মধ্যে মোহাম্মদ মাইনুল ইসলামকে জলন্ত ভবনের সামনে কুড়াল হাতে উল্লাস করতে দেখা গিয়েছিল, যাকে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভিডিওতে একটি বেসরকারি টিভি ক্যামেরার সামনে যুব মজলিসের শরীয়তপুর জেলা নেতা কারি মুয়াজ বিন আবদুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, 'যেটা ৫ আগস্ট করার কথা ছিল, আমরা পারিনি। আজকে সেটা করেছি হাদি ভাইয়ের উসিলায়।' এ ছাড়া ফেসবুকে হামলার ছবি শেয়ার করে উসকানি দেওয়া ভোলার নিয়াজ মাহমুদ ফারহান এবং স্থান থেকে লাইভ সম্প্রচার করা ময়মনসিংহের জাকির হোসেন ওরফে শান্তকে সিটিটিসি ও ডিবি গ্রেপ্তার করেছিল।
গত এপ্রিলে আসামীদের মধ্যে নাজমুল হাসান, রিয়াজুল ইসলাম ওরফে সুমন, মো. ইয়াসিন, মোহাম্মদ রাসেল, মো. নজরুল ইসলাম ওরফে মিনহাজ, মো. রাশেদুল ইসলাম, জাকির হোসেন ওরফে শান্ত, মো. বিপ্লব, মো. আহাদ শেখ ও মো. রুবেল হোসেন প্রথম দফায় জামিন পান। পরে অন্যান্য আসামিরাও কারামুক্ত হন। 'বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলন' নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে এদের ছয়জনের জামিন করানোর দাবি করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন কারাগারের সামনে বিক্ষোভ ও মব তৈরির চেষ্টা চালানো ওই পেজটি থেকে প্রথম আলোর বিরুদ্ধেও উসকানিমূলক প্রচারণা চালানো হতো। এ ছাড়া জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি বিবেচনায় কারাগারে থাকা আতাউর রহমান বিক্রমপুরীকেও এই মামলায় উসকানিদাতা হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল, যিনিও বর্তমানে জামিনে আছেন।
জামিনে মুক্ত হওয়া মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেন—আয়নুল হক কাশেমী, জুলফিকার আলী ওরফে সৌরভ, আবদুর রহমান ওরফে পলাশ, জোবায়ের হোসেন, জাহাঙ্গীর হোসেন, মির্জা মাহমুদ ওরফে কোরবান, মো. হাসান, সোহেল মিয়া, সোহেল রানা, আবদুল বাকের শেখ, আল আমিন, আলমাস আলী, শফিকুল ইসলাম, খালেদ আহম্মেদ, জান্নাতুল নাঈম, নাঈম ইসলাম, সাগর ইসলাম, আবুল কাশেম, ফয়সাল আহমেদ, আজমির হোসেন ওরফে আকাশ, মো. হাশেম, সাইফুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, আজহার হোসেন ও স্বপন মণ্ডল।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে উগ্রপন্থী একটি দল কারওয়ান বাজারের প্রথম আলো ভবনের ফটকের শাটার ভেঙে প্রবেশ করে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। একই রাতে দ্য ডেইলি স্টার ও ছায়ানট ভবনেও হামলা চালানো হয় এবং পরদিন সন্ধ্যায় উদীচী কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। ২১ ডিসেম্বর রাতে তেজগাঁও থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, সাইবার সুরক্ষা আইন ও দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় দাঙ্গা, অন্তর্ঘাত, হত্যাচেষ্টা ও সম্পত্তি বিনষ্টের অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এই আক্রমণের খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়।
হামলার ঘটনাকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, 'প্রথম আলোয় ভাঙচুর ও আগুন লাগানো হয়েছে। এটি আমাদের দেশে বাক্স্বাধীনতার ওপর জঘন্যতম আক্রমণের একটি। আমি আশা করব, পুলিশ বা তদন্তকারী কর্মকর্তারা মনোযোগ দিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করে তদন্ত সাপেক্ষে মামলা সমাধানের ব্যবস্থা করবেন। তাঁদের তৎপরতার অভাব থাকলে যারা বাক্স্বাধীনতা খর্ব করতে চায়, তারা প্রশ্রয় পাবে।' মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান জোর দিয়ে বলেন, পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে উসকানিদাতা ও হামলাকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারে আনা উচিত এবং এতে কোনো ছাড় দেওয়া অনুচিত।
গত ৩ এপ্রিল তাঁকে প্রথম আলোয় হামলার মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
রুবেল হোসেন।তাঁদের মধ্যে ছয়জনের জামিন করিয়েছেন বলে দাবি করে গত ২৪ এপ্রিল সকাল ৬টা ১৯ মিনিটে ‘বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলন’ নামের একটি ফেসবুক পেজে পোস্ট দেন আলতাফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি।




