নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রতি বছরের ন্যায় অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্বব্যাপী পালিত বিশ্ব বসতি দিবসের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)-এর উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদা, উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বিশ্ব বসতি দিবস- ২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ যা সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিকল্পিত, সবুজ, অন্তর্ভুক্তি মূলক ও টেকসই নগর গঠনের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে।
দিবসটি উপলক্ষে আজ সোমবার(০৫ অক্টোবর) সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় চত্বরে বেলুন উড্ডয়ন ও বর্ণাঢ্য র্যালির মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ছিলেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন।
প্রধান অতিথি ছিলেন মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান এমপি।
বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
সেমিনারে উপস্থাপনা করেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আবু ঈসা আনচারী।
সভাপতির বক্তব্যে চউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন,মানুষের জীবনমানও উন্নত হবে। তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সাশ্রয়ী আাবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। শহরের প্রাকৃতিক ভূমি, জলাধার, উন্মুক্ত স্থান ও পরিবেশগত সংবেদনশীল এলাকাগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে নগরের এক এলাকায় অধিক নাগরিক সুবিধা এবং অন্য এলাকায় তার ঘাটতি-এ ধরনের বৈষম্য দূর করে সমতার ভিত্তিতে নাগরিক সুবিধার বটন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি আধুনিক নগর গড়ে তোলার জন্য সড়ক, চেন, পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিনোদন ও গণপরিবহনসহ সকল নাগরিক সুবিধার সুখন বিস্তার প্রয়োজন। চট্টগ্রামকে একটি পরিকল্পিত ও উন্নত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে সংশ্লির সকল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আাপ্তান জানান তিনি।
আলোচনায় চউকের বোর্ড সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মানজারে খোরশেদ আলম বলেন, চট্টগ্রামের ক্রমবর্ধমান আবাসন চাহিদা ও নগর উন্নয়নের জটিলতা মোকাবিলায় সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। তিনি বিশেষ করে চউকের জনবল বৃদ্ধি, দক্ষ পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে খারও কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়, লেক, প্রাকৃতিক জলাধার, উন্মুক্ত স্থান ও অন্যান্য পরিবেশগত পুরুত্বপূর্ণ এলাকা শুধু সংরক্ষণ করলেই হবে না; এগুলোকে পরিকল্পিতভাবে নগর দিীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পাহাড়, লেক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপূর্ণ এলাকাগুলোকে পর্যটনবান্ধব, পরিবেশবান্ধব ও জনসাধারণের জন্য সহজে প্রবেশযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য মাস্টারপ্ল্যান ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হানিফ বলেন, চট্টগ্রাম নগরের বর্তমান ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর চাপ কমানো এবং নগর সম্প্রসারণকে সুশৃঙ্খল ও ভারসাম্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নগর পরিকল্পনায় সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হলে তার নেতিবাচক প্রভাব শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, পরবর্তী কয়েক প্রজয়কেও বহন করতে হবে। এ কারণে এখন থেকেই পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, সুষম ঘনত্ব, পর্যাপ্ত সড়ক নেটওয়ার্ক, খোলা জায়গা এবং নাগরিক সেবার সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের চট্টগ্রামকে জলবায়ু সহনশীল ও পরিবেশবান্ধব নগর হিসেবে গড়ে তুলতে স্ক্রিন বিল্ডিং, জ্বালানি সাশ্রয়ী ভবন, প্রাকৃতিক বালো-বাতাসের ব্যবহার, জল সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণকে উৎসাহিত করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, “শুধু আইন প্রণঙন করলেই হবে না, সেই আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান পুরুবপূর্ণ।” এ ক্ষেত্রে তিনি চউককে আরও কার্যকর মনিটরিং ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ প্রদান করেন।
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নুসরাত সুলতানা বলেন, একটি সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য শহর নির্মাণ করতে হলে পরিকল্পনা গ্রহণের সময় শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনকেও বিবেকানায় নিতে হবে। তিনি শহরের নাগরিক সুবিধা বাড়ানো, নিরাপদ চত্তচলের পরিবেশ তৈরি, প্রয়োজনীয় জনপরিসর সৃষ্টি এবং দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের ওপর বিশেষ পুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও বলেন, নগরবাসীর জীবনমান উশয়নের অন্য শুধু বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করবেই যথেষ্ট নয়, পানি নিষ্কাশন, বর্ষা ব্যবস্থাপনা, রাস্তা, ফুটপাত, সবুজায়ন, বিনোদন এলাকা ও উন্মুক্ত স্থানসহ দৈনন্দিন নাগরিক সুবিধার মানোধয়নও সমানভাবে প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, বিশ্ব বসতি দিবসের মূল বার্তা হচ্ছে মানুষের জন্য পরিকল্পনা করা। তাই নগর পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের বাসস্থান, জীবনমান, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নিম্ন ও মধ্যদায়ের মানুষের জন্য পরিকল্পিত আবাসন, দবিষ্ঠাৎ উন্নয়ন এলাকা, নগর সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের বিষয়ে কাজ করছে। একটি শহর তখনই প্রকৃত অর্থে বাসযোগ্য হয়, যখন সেখানে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সমান সুযোগ ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা যায়।
চউক চেয়ারম্যান বলেন, “চট্টগ্রামকে একটি পরিকল্পিত, সবুজ, নান্দনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু চাট্টিগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সকল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পেশাচীবী, উন্নয়ন সহযোগী এবং নগরবাসীর সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।”
তিনি উল্লেখ করেন, চলমান মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসন চাহিদা, পরিবহন, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা, নাগরিক সুবিশং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এবং ভবিষ্যৎ নগর সম্প্রসারণকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে খাসার উদ্দ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সবুজ, পাহাড়, জলাধার এবং নাম্পনিক চরিত্র ফিরিয়ে আনতে পরিকল্লিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শহরের বর্ণিত এলাকাগুলো যেন ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরিকল্পিত নগরায়ণের শিকার না হয়, সে জন্য এখন থেকেই উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
সভাপতি আশা প্রকাশ করেন, সকল সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ, মাস্টারপ্লান ভিত্তিক উন্নয়ন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে পুনরায় একটি সবুজ, নান্দনিক, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে চউক চেয়ারম্যান বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৬ সফলভাবে আয়োজনের জন্য চউকের বোর্ড সদস্য, কর্মকর্তা ও কর্মচারী, গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, আমন্ত্রিত অতিথি এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
তিনি ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে আবাসন, নগর পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার হবে বলে আশা প্রকাশ করে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষনা করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন-চউক সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ জামিলুর রহমান,চউক সচিব নুরে জান্নাত,তত্তাবধায়ক প্রকৌশলী এ এম এন হাবিবুর রহমান,তত্তাবধায়ক প্রকৌশলী মোং মন্জুর হাসান,স্থাপত্য প্রকৌশলী মো.গোলাম রাব্বানী,নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম,নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান,নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাশ, অথরাইজড অফিসার-১ কাজী কাদের নেওয়াজ,অথরাইজড অফিসার-২ মোহাম্মদ তানজীব ও চউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীবৃন্দ।




