নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ’র) ইমারত নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান ভবন অনুমোদনে প্রকাশ্যে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। তার নিজস্ব বা সিন্ডিকেটের বিসিকেইছ নথিগুলো ইমারত নির্মাণ বিধিমালা উপেক্ষা করে তার নিজস্ব নিয়মে অনুমোদিত করছে। বর্তমান চেয়ারম্যানকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত অবৈধ পদধারী নির্বাহী প্রকৌশলী এ জি এম সেলিম এর দুর্নীতির মাত্রা লাঘামহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সুত্রে জানা গেছে,নগরীর বাকলিয়া এলাকার মিয়াখান নগর ফতেহ আলী মাতব্বর রোডে ভবনের নকশা অনুমোদিত বিসিকেইছ নং ২৩২/২৪-২৫ ঘিরে অনিয়ম সবচেয়ে স্পষ্ট। নথি দৃষ্টে দেখা যায়,ভবনের সামনে ২০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা রয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে ভবনের জন্য ১৩ তলা পর্যন্ত নির্মাণ অনুমোদন দিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। বাস্তবে রাস্তার প্রস্থ মাত্র ১২ ফুট-কোথাও কোথাও আরও কম। এ ধরনের আরো অসংখ্য নথি এজিএম সেলিম নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ও তার অধীনস্থ কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীদের ধমক ও গালিগালাজ করে অবৈধ পন্থায় অনুমোদন করিয়ে নেয়। যা আভ্যন্তরীণ তদন্ত করলে বেড়িয়ে আসবে।
সুত্রে জানা গেছে, এজিএম সেলিম চক্রটি সহজ সরল ও সৎ নিষ্ঠাবান সচিব রবীন্দ্র চাকমাকে তার অন্যায় আবদার না রাখলে মানসিক নিপীড়ন সহ বদলীর হুমকিও দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিষয়গুলো চেয়ারমাান অবহিত হওয়া সত্বেও তার বিরুদ্ধে রহস্যজনকভাবে বিধিমূলক কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এটি বহু বছর ধরে অপরিবর্তিত একটি সরু আবাসিক রাস্তা। নগর উন্নয়ন বিধিমালা অনুযায়ী, ১২ ফুট প্রশস্ত রাস্তার পাশে সর্বোচ্চ ৮ তলা ভবন অনুমোদনযোগ্য।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, কাগজে রাস্তার প্রস্থ বাড়িয়ে দেখানো ছাড়া অনুমোদন সম্ভব নয়। একজন নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “রাস্তার প্রস্থ ভুয়া দেখানো মানে শুধু একটি ভবন নয়-পুরো এলাকার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা। এটি পরিকল্পিত জালিয়াতির শামিল।”
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ধরনের অনিয়ম বিচ্ছিন্ন নয়। কাতালগঞ্জ এলাকায় ও এ. জি. এম. সেলিম চক্রের অন্যতম হোতা ইমরান মন্ত্রণালয় ও সচিবালয়ে তদবির চালান, আর সেলিম সিডিএর ভেতরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করেন। নিয়ম মানতে আপত্তি তোলা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাঠানো, বদলি করানো কিংবা কোণঠাসা করার কৌশলও এই চক্রের অংশ বলে অভিযোগ উঠেছে।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যারা প্রশ্ন তোলে, তারা টিকে থাকতে পারে না। আর যারা চুপ থাকে, তারাই পুরস্কৃত হয়।”
সিডিএতে আসা জনৈক সেবা গ্রহণকারী বলেন, সিডিএতে সেবার নামে প্রতিটি স্থরে দুর্নীতি এবং অনিয়মে ভরা। সেবাগ্রহীতাদেরকে সেবার নামে বিভিন্নভাবে হয়রানি করছেন। ইমারত নির্মাণ-কমিটির চেয়ারম্যানের দ্বারস্থ হলে তিনি সরকারী অফিস বলে হুমকি-ধমকি দিয়ে ভুক্তভোগীদের দমিয়ে রাখতে চাই। এমনকি ইতোমধ্যে আমার সাথেও এমন ঘটনা ঘটায়।
ইমরান হোসেন নামে এক ব্যক্তি এ. জি. এম সেলিমের সহযোগিতায় বিভিন্ন অপকর্ম করছে শুনার পর, বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ইমরান না থাকলে সিডিএ একটি মারপিটের আড্ডা-খানা হয়ে যেত। এতে প্রমাণ হয় ওরা দু’জনের একটি চক্র সিডিএতে ভেতরে বাইরে অপকর্মগুলো করছে। এছাড়া অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে নোটিশ ও অভিযানও বাণিজ্যিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কোথাও নোটিশ দিয়ে চাপ সৃষ্টি, পরে অর্থের বিনিময়ে অভিযানের ফলোআপ বন্ধ-এমন অভিযোগও আছে বলে জানান তিনি।
এই বিষয়ে তত্ত্ববাবধায়ক প্রকৌশলী ও ইমারত নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান এ. জি. এম. সেলিম এ প্রতিবেদকে বলেন, কাগজে রাস্তার প্রস্থ বাড়িয়ে বহুতল ভবনের অনুমোদনের বিষয়টি অথরাইজড অফিসার থেকে জানতে হবে। অথরাইজড অফিসার পরিবর্তন কেন-সেটা নিয়ে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, একজন কি সারাজীবন থাকবে নাকি উল্টো প্রশ্ন ছুড়েন।
ইমরানের সাথে এত সখ্যতা কেন-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কে ইমরান, কোন ইমরান”-না চেনার ভান করেন। যদিও অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, এখানে অরাজকতা আগে সিডিএ’র অফিসাররা সৃষ্টি করছে। ইমরান না থাকলে সিডিএ একটি মারপিটের আড্ডা-খানা হয়ে যেত।
নিজেকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর আপন খালাতো ভাইয়ের ছেলে পরিচয় দিয়ে ইমরান হোসেন সম্প্রতি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী যে কোনো নাগরিক সরকারি দপ্তর দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ করতে পারে। ২০১৯ সাল থেকে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ ও অভিযোগ দিয়েছি, কিছু ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপও নিয়েছে। যদিও তিনি শাস্তি চেয়েছিলেন, কিন্তু বদলি হয়েছে, এতে তিনি সন্তুষ্ট নন। এ. জি. এম. সেলিমের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে ইমরান বলেন, “ওনি ভালো মানুষ।” পরে নিজেকে সাংবাদিকও দাবি করেন তিনি।
সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেন, “কোনো অন্যায়-অপরাধ ছাড় দেওয়া হবে না পাশাপাশি বিধি বর্হিভূত কোন কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না। চউকে ইমরান হোসেনের দম্ভোক্তি ও প্রধান উপদেষ্টার আত্মীয় বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখেছি যেভাবে পরিচয় ব্যবহার করছে ঠিক এতো কাছের আত্মীয় নন তিনি। তবে দূর সম্পর্কের কেউ হয়তো হতে পারেন বলেও জানান সিডিএর চেয়ারম্যান।
নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজে রাস্তা বড় দেখিয়ে বহুতল ভবনের অনুমোদন শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়-এটি সরাসরি জননিরাপত্তার প্রশ্ন। তারা বিতর্কিত অনুমোদনগুলো বাতিল, সংশ্লিষ্ট ফাইল পুনঃপর্যালোচনা এবং চক্রের ভূমিকা তদন্তের দাবি করেছেন।




