নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি সোহেল মৃধা এবং তার স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা মুনমুন কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে (কেজিডিসিএল) সহকারী ব্যবস্থাপক পদে কোন ধরনের লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ও আবেদন ছাড়াই সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে ২০১১ সালে চাকরি পান। সে সময় সোহেল মৃধা ব্যবস্থাপক (সাধারণ) পদে এবং তার স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা মুনমুন ব্যবস্থাপক (আইন শাখা) পদে নিয়োগ পান।
অন্যদিকে বিতর্কিত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সোহেল মৃধা ও বরখাস্কৃত কর্মকর্তা মুহাম্মদ নিয়ামুল কবিরকে গত ২৪ ডিসেম্বর পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনায় পুরো কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে তোলপাড় শুরু হয়।
সূত্রটি জানায়, সোহেল মৃধা ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত ফাইল রহস্যজনকভাবে অফিস থেকে গায়েব হয়ে গেছে।
কর্ণফুলী গ্যাসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, সোহেল মৃধা ও নিয়ামুল কবির অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। পাশাপাশি তারা অবৈধ গ্যাস সংযোগ, গ্যাস চুরি ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালের দিকে সীতাকু-ে ইলিয়াস সিএনজি পাম্পে অবৈধ গ্যাস সংযোগের অভিযোগে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও সোহেল মৃধার সহযোগিতায় পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক মনিরুজ্জামানের যোগসাজশে দুই কোটি টাকার বিনিময়ে পুনরায় সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এমন বিতর্কিত ব্যক্তি সোহেল মৃধা ও মুহাম্মদ নিয়ামুল কবিরকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে গত ২৪ ডিসেম্বর ব্যবস্থাপক (সাধারণ শাখা, ব্যক্তিগত কোড-১৭৮) পদ থেকে উপ-মহাব্যবস্থাপক (সাধারণ) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কবির উদ্দীন আহম্মদের স্বাক্ষরিত ওই আদেশকে কেন্দ্র করে পুরো কোম্পানিতে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও এমন পদোন্নতিতে কর্মকর্তারা বিব্রত বলে জানা গেছে।
একইভাবে মুহাম্মদ নিয়ামুল কবিরকে উপ-ব্যবস্থাপক (কারিগরি) পদ থেকে ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। অথচ তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর তাকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে আদালতের রায়ে তিনি চাকরি ফিরে পান। তবে বিধি অনুযায়ী কোম্পানির পক্ষ থেকে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে এক কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশে আপিল করা হয়নি।
এ বিষয়ে মহাব্যবস্থাপক (রাজস্ব-উত্তর) ফরিদ আহমদ খানকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ফরিদ আহমদ খানের স্ত্রী কেজিডিসিএলের আইন উপদেষ্টা শামিমা ফেরদৌস মিলির যোগসাজশে নিয়ামুল কবিরকে চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। বরখাস্তকালীন সময়ের বেতন-ভাতা পাইয়ে দিতে অবৈধভাবে সহযোগিতা করে স্বামী-স্ত্রী মিলে প্রায় এক কোটি টাকা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে নিয়ামুল কবির প্রায় ২০ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদের মালিক বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের মামলা চলমান রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মো. সোহেল মৃধা বলেন, “আমি জীবনে কখনো ছাত্রলীগ করিনি। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম—এমন কোনো ডকুমেন্ট থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে আমাকে চট্টগ্রামের একটি স্কুলের সভাপতি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের লোকজনকে কি কেউ সভাপতি বানাবে? এসব অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। পরীক্ষা না দিয়ে চাকরি পাওয়ার বিষয়টিও সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
এ বিষয়ে মুহাম্মদ নিয়ামুল কবির বলেন, “আমাকে অবৈধভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। আদালতের রায়ে চাকরি ফিরে পাই এবং কোম্পানিকে আমার যাবতীয় পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা না করা কোম্পানির বিষয়। আমি বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদ করায় আমাকে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার পদোন্নতি আমার আইনগত অধিকার। পদোন্নতির পর একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে।”
নিয়ামুল কবিরের বিষয়ে জানতে তৎকালীন তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও মহাব্যবস্থাপক (রাজস্ব-উত্তর) ফরিদ আহমদ খানের স্ত্রী শামিমা ফেরদৌস মিলির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন বলে জানান এবং সুস্থ হলে অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন।
এ বিষয়ে কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কবির উদ্দীন আহম্মদ বলেন, “দেশে কোনো ব্যক্তি পরীক্ষা ছাড়া চাকরি পাওয়ার সুযোগ নেই। সোহেল মৃধা ও তার স্ত্রীর ফাইল অফিসে সংরক্ষিত আছে। সিনিয়রিটি উপেক্ষা করে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।” এ বিষয়ে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ সালাউদ্দীনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।




