নিজস্ব প্রতিবেদক: মাদক বিরোধী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্সকে কেন্দ্র করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মাদক বিরোধী সাড়াশী অভিযান এখনো চলছে।বিভিন্ন বাহিনী নিয়মিত উদ্ধার করছে মাদক। তবুও এখনো অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ছে বাংলাদেশে মাদকের আগ্রাসন।
টেকনাফ, কক্সবাজার, পার্বত্য বান্দরবানের ঘুমধুম, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া -কক্সবাজার, নাজিরারটেক, টেকনাফের খায়ুকখালী, সাবরাং, সাহপরীর দ্বীপ, নাজির পাড়া, মৌলভী পাড়া, বাহারছড়া সহ বিভিন্ন সাগর উপকূল নিরাপদ ইয়াবা খালাসের ঘাঁটি হলেও কোন অবস্থায় মাদক প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এ কথা সত্য প্রতিদিন বিভিন্ন সংস্থা মাদকের চালান উদ্ধারে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আটকের পরে মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হয় পরিবহন বাহকদের।অবিশ্বাস্য হলেও সত্য বড়সব মাদকের মামলায় প্রকৃত মাদকের মামলায় বাংলাদেশর ইয়াবা গডফাদাররা রহস্য জনক কারণে বরাবরই ধরাছোয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
উখিয়া টেকনাফের সাবেক এমপি বদির লালিত সেই ১০২ ইয়াবা সম্রাটরা কারাগার থেকে বের হওয়ার পর বদির ভাই শুক্কুরের নেতৃত্বে মাদক ব্যবসায়ীরা আবারও মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে। আইনের ফাঁকফোকরে আদালত থেকে মাদক ব্যবসায়ীরা জামিনে মুক্তি পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
কেউ কেউ মাদকের মামলা থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে ইতোমধ্যে সফলতার নজির স্থাপন করায় অনেক বড় বড় মাদক ব্যবসায়ীরা এখন মাদকের মামলাকে কোন মামলায় মনে করেন না। এই অবস্থায়, সচেতন মহলের অনুরোধ সেই ১০২ ইয়াবা সম্রাটের জামিন বাতিল এবং মাদক মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের কারাগারের ভেতরে বাহিরে চাপে না রাখলে বাংলাদেশে মাদক নির্মূল হওয়ার প্রশ্নই উঠে না।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, ওসি প্রদীপের সময় মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনার কথা বলে কক্সবাজারে মাদক ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটে। ওই সময় টেকনাফের শীর্ষ ইয়াবা সম্রাট বদির ভাই শুক্কুর সিআইপি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শুরু হয় মাদক বিরোধী অভিযান। এতে ইয়াবাকারবারীদের শিখিয়ে দেওয়া নির্দেশনা মতে তৎকালীন পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদের নির্দেশে ওসি প্রদীপ বেশ কিছু চুনোপুঁটি ইয়াবা ব্যবসায়ী কথিত বন্দুক যুদ্ধে হত্যা করলেও বদি সিন্ডিকেটর মাদক ব্যবসায়ীদের বাঁচিয়ে রাখা হয়।
জানা গেছে, চক্রটি সীমান্তে চোরাচালান, হুন্ডি, আদম ব্যবসা এবং স্বর্ণ সীমন্তের চোরাচালান এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে যুগের পর যুগ ধরে। বদির ভাই শুক্কুরের নেতৃত্বে সর্বদলীয় ঐক্য মাদক সিন্ডিকেট গঠন করে চাঁদাবাজদের চাঁদা দিয়ে তাদের হরেক রাষ্ট্রদ্রোহী ব্যবসা শুধু বাংলাদেশ কেন্দ্রীক নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারত সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। তারা সেখানে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছেন।
কক্সবাজার শহরে অনেক হোটেল মোটেল, গেস্ট হাউজ, রেস্ট হাউজ, অভিজাত ফ্ল্যাট বাড়ি সহ দেশের বিভিন্ন ব্যবসা বানিজ্যিক মাদক ব্যবসায়ীরা নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে। খুরুশকুল রোডের মাথায় একজন বিতর্কীত সিআইপির রাজপ্রাসাদ এবং তার আয় রোজগারের বিষয় জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। যা গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করলে থলের বিড়াল বের হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত একটি পুরনো দৈনিক সূত্রে জানা গেছে, মাদক অভিযান নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের মনে আতংক সৃষ্টি হলেও ধীরে ধীরে তা স্থিমিত হয়ে আসছে বলে মনে করেন সাধারণ মানুষ। এর কারণ হিসাবে সাধারণ মানুষ মনে করেন, শীর্ষ ইয়াবা কারবারীরা প্রশাসনের সাথে উঠাবসা আর চুনুপুঠিরা মারা যাওয়ার কারণে। এ পর্যন্ত সারা দেশে দু’শতাধিক ইয়াবাকারবারী মারা গেলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের তালিকায় শীর্ষে যারা রয়েছে তারা এখনো দাফিয়ে বেড়াচ্ছেন। তারা এখনো প্রশাসনের সাথে উঠাবসা করেন। এমন কি ইয়াবার আত্মসমর্পন অনুষ্টানে ও বড় বড় ইয়াবা সম্রাটগণ সামনের সারিতে বসেছিলেন। একমাত্র ব্যাতিক্রম সাবেক সাংসদ আব্দু রহমান বদি।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের তালিকার ৩ নাম্বারে থাকা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, তার ছেলে শাহজাহান, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দিন, মৌলভী আজিজ ও পৌর কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
একারণে সাধারণ মানুষের মনে আত্মসমর্পন অনুষ্টানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। এদিকে কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশী ইয়াবাকারবারী, আবদুর রহমান বদি, জাফর চেয়ারম্যান পালিয়ে থেকে ইয়াবার কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকে কক্সবাজার শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে অবস্থান করলেও টেকনাফের জাফর আলম চেয়ারম্যান, শাহজাহান, মুজিব সহ শীর্ষ ইয়াবা সম্রাটগণ বিদেশ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অনেকে ভিসা কমপ্লিট করেছে এমন আভাস ও পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে ইয়াবা রাজ্যের ২নং সম্রাট হাজী সাইফুল বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে সবার মনে আশা জেগেছিল হয়তো ১নং সম্রাট সহ শীর্ষ কারবারীরা হয়তো এ পরিনতি ভোগ করবে। কিন্তু সাইফুলের মৃত্যুর পর টেকনাফের সাবেক উপজেলা য়োরম্যান জাফর আলম সহ অন্যরা দ্রুত বিদেশ -পালানোর চেষ্টা করছে বলে একটি সুত্রে জানা গেছে। অনেকে বলছেন, প্রশাসনের উর্ধত্নন কিছু কর্মকর্তাদের কারণে তাদেরকে বিদেশ পালানোর সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। তা না হলে এতদিনে তারা আটক হতো।
মৌলভী সাইফুল বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলেও ইয়াবার প্রবেশদ্বার খ্যাত কক্সবাজারের টেকনাফের শীর্ষ ইয়াবা কারবারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কক্সবাজারের মৌলভী আজিজ, মৌলভী রফিক, টেকনাফে ২৪ গডফাদারসহ ১০২ ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করলেও এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে ৯৯৬ জন। তাদের কেউ কেউ বীরদর্পে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর অনেকে দেশ-বিদেশে অবস্থান করছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত টপ টেন ইয়াবা গডফাদারের বেশিরভাগই আত্মসমর্পণ না করায় এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। স্থানীয়রা বলছেন, সরকারের মাদকবিরোধী তৎপরতায় অপরাধীরা আপাতত কিছুদিন বিরত থাকলেও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পুনরায় অপরাধ শুরু করবে। তাদের মতে, আত্মত্মসমর্পণের মাধ্যমে মাদক কারবারিদের সুরক্ষার লাইসেন্স দেয়া হল। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলেছে, যারা আত্মসমর্পণ করেনি তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তাদের করুণ পরিণতি বরণ করতে হবে।।
জানা গেছে, কক্সবাজার জেলা পুলিশের তালিকায় থাকা ১ হাজার ১৫১ ইয়াবা ব্যবসায়ী ও গডফাদারের মধ্যে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মারা গেছে ৬৯ জন, আত্মসমর্পণ করেছে ১০২ জন। তাছাড়া ৪৪ গডফাদারসহ ৯৯৬ ইয়াবা কারবারি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের কেউ কেউ গ্রেফতার হলেও জামিনে বের হয়ে গা ঢাকা দিয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোঃ আলী বলেন, ‘গডফাদারদের অধিকাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের আইনের আওতায় আনা এবং মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে মাদক পাচার ও বেচাকেনা কোনোভাবেই বন্ধ করা সম্ভব নয়।’ অন্যদিকে, ইতিমধ্যে মাদক কারবারিদের হুশিয়ারি দিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
তিনি বলেছেন, ‘যারা আত্মসমর্পণ করেনি তাদের ছাড় নেই। মাদক কারবারিরা হয় আত্মসমর্পণ করবে, নয়তো অভিযানের ‘মাধ্যমে কঠিন পরিণতি ভোগ করবে।’ অন্য দিকে ধরাছোঁয়ার বাইরে ৭৩ ইয়াবা গডফাদারের মধ্যে এখনও ৪ জন ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। এরমধ্যে কক্সবাজার-৪ আসনের (উখিয়া-টেকনাফ) সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে ইয়াবা কারবারিদের পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগ অনেক পুরনো। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকায় এক নম্বরে আছে তার নাম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা টেকনাফের শীর্ষ মানব পাচারকারীর তালিকাতেও তার নাম ছিল। বদির সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানের আগে পাঁচটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার সমন্বয়ে মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকদের একটি তালিকা তৈরি করে সরকার। সেই তালিকায় মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আবদুর রহমান বদির নাম রয়েছে। তালিকায় বদির নাম থাকলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘মাদকের সঙ্গে বদির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষী আমরা পাইনি। নাম থাকলে তো চলবে না’। প্রমাণ তো করতে হবে তিনি অপরাধী।’
সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২২ মে সচিবালয়ে নিজ দফতরে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ থাকার পরও আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা কেন নেয়া হচ্ছে না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমাদের কাছে আছে। আমরা সেই অভিযোগগুলো সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছি। বদিসহ অন্য মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে আপনাদের কাছেও কোনো তথ্য থাকলে আমাদের দিন। বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তথ্য-প্রমাণ নাই।’ জাতীয় সংসদেও বদিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অনেকের ধারণা, বদির বিরুদ্ধে ইয়াবা কারবারিদের পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগ থাকার কারণেই মূলত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। এছাড়া তালিকার দুই নম্বরে থাকা ইয়াবা চোরাচালানের মূল হোতা হাজী সাইফুল করিম পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে মারা গেলেও ৩ নং এ থাকা টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, তার ছেলে সদর ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দিন, তার ভাই বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দিন, সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির ভাই কাউন্সিলর মৌলভী মুজিবুর রহমান, জালিয়া পাড়ার জাফর আলম প্রকাশ টিটি জাফর, উখিয়া গুয়ালিয়ার ইউপি সদস্য মোস্তাক আহমদ, টেকনাফ নাজির পাড়ার নুরুল হক ভুট্টো, কক্সবাজার শহরের বাস টার্মিনাল এলাকার কাশেম আনসারী, একই এলাকার আবুল কালাম ও তার ভাই বশির আহমদ, বাস টার্মিনাল এলাকার বার্মাইয়া আবু নফর, চকরিয়া পৌর যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম সোহেল, রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আমিন কোম্পানী, মিঠাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়রম্যান ইউনুচ ভুট্টোসহ অনেকেই অধরা।
সচেতন জনসাধারণ মনে করেন, ইয়াবা কারবারীদের বিদেশ পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলে প্রশ্নবিদ্ধ হবে আইনশৃংখলা বাহিনী, আর বেড়ে যাবে সরকারের মাদক বিরোধী অভিযান। তাই তাদের বিদেশ যাওয়ার পথ বন্ধ করে আইনের আওতায় আনা হোক।




