এম,সফিউল আজম চৌধুরী :-একটি রাজনৈতিক দলের প্রাণস্পন্দন এবং টিকে থাকার মূল চালিকাশক্তি লুকিয়ে থাকে তার তৃণমূলের ওপর। কেন্দ্র যত বড় বা দূরদর্শী সিদ্ধান্তই নিক না কেন, মাঠপর্যায়ের কর্মীরা যদি সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে ঢাল হয়ে না দাঁড়ান, তবে কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি, শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস এবং political power বা রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘পাওয়ার হাউস’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বন্দর নগরীসহ পুরো চট্টগ্রামে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি কি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে? মাঠপর্যায়ের চরম বিশৃঙ্খলা, দীর্ঘদিনের আহ্বায়ক কমিটির স্থবিরতা, গ্রুপিংয়ের রাজনীতি এবং ত্যাগীদের অবমূল্যায়নের যে চিত্র বর্তমানে উঠে আসছে, তা দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে দলটির তৃণমূলের বড় একটি অংশ তীব্র ক্ষোভে ফুঁসছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো জেলার রাজনীতিতে।

​চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার বিভিন্ন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও ইউনিট পর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে কথা বললে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ, তীব্র হতাশা এবং একাকীত্বের চিত্র ফুটে ওঠে। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের একাংশের স্পষ্ট অভিযোগ হলো, দলের কঠিন সময়ে কিংবা সাধারণ সাংগঠনিক কার্যক্রমে কর্মীদের খোঁজখবর নেওয়ার এবং তাদের মূল স্রোতে সম্পৃক্ত রাখার ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে পর্যাপ্ত উদ্যোগের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এক প্রবীণ তৃণমূল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান যে, বছরের পর বছর মার খেয়ে, মামলা-হামলার শিকার হয়ে এবং দিনের পর দিন পরিবার ছেড়ে যারা ফেরারি জীবন যাপন করলেন, এখন দল গোছানোর সময় তাদের কোনো খোঁজই নেওয়া হচ্ছে না। তার মতে, বড় বড় নেতারা এসি রুমে বসে নিজেদের সুবিধামতো সিদ্ধান্ত নেন, অথচ মাঠের কর্মীদের আবেগ-অনুভূতির কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই। ফলে মাঠের কর্মীরা এখন নিজেদের দলেই পরবাসী ও চরম অবহেলিত মনে করছেন। এই অবহেলার কারণে অনেক নিবেদিত প্রাণ কর্মী রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন, যা দলের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনছে।

এই ক্ষোভ কেবল একজন নির্দিষ্ট কর্মীর নয়, বরং চট্টগ্রাম বিএনপির একটা বড় অংশের। কর্মীদের মূল অভিযোগ, আন্দোলন বা সংকটের সময়ে তাদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, স্বাভাবিক সময়ে বা দল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তাদের সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। চট্টগ্রাম বিএনপির সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক দুর্বলতার জায়গা হলো দীর্ঘকাল ধরে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে দল চালানো। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, একটি আহ্বায়ক কমিটির মূল দায়িত্ব হলো নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে, সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে, পূর্ণাঙ্গ সম্মেলন করে একটি নতুন ও শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে দেওয়া। কিন্তু চট্টগ্রামে উত্তর, দক্ষিণ কিংবা মহানগর—সবখানেই এই আহ্বায়ক সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। এক কমিটি ভেঙে আরেক আহ্বায়ক কমিটি করা হচ্ছে, কিন্তু কোনো কমিটিই পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে না। এর ফলে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না, যা দলের গঠনতান্ত্রিক কাঠামোর সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং সাধারণ কর্মীদের কর্মস্পৃহাকে ম্লান করে দিচ্ছে।এর চেয়েও বড় সংকট তৈরি করেছে তথাকথিত সুযোগসন্ধানী ও হাইব্রিড নেতাদের দাপট।

ত্যাগী ও রাজপথের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের পেছনে ঠেলে দিয়ে অর্থ, পেশীশক্তি ও লবিংয়ের জোরে একশ্রেণীর নব্য নেতা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে নিচ্ছেন বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার এক প্রবীণ সাবেক শীর্ষ নেতা দলের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করতে গিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, দলের ভেতর এখন কোনো চেইন অব কমান্ড বা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নেই। ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সব জায়গায় বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে। যারা বিগত বছরগুলোর কঠিন আন্দোলনে ঘরে লুকিয়ে ছিল বা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল, তারা এখন বড় নেতা সেজে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এবং নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। অন্যদিকে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্যারিয়ার ধ্বংস করে রাজনীতি ধরে রাখল, তারা আজ কোণঠাসা। এই প্রবীণ নেতার দাবি, গ্রুপিং রাজনীতি এখন নেতা থেকে শুরু করে কর্মী পর্যায় পর্যন্ত বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, যা দলের সামগ্রিক শক্তিকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে এবং দলকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

​বর্তমান সময়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ তীব্র কোন্দল এবং একশ্রেণীর সুযোগসন্ধানী নেতার প্রচ্ছন্ন সহযোগিতার কারণে বন্দরনগরীতে এক ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে কিংবা প্রতিপক্ষ গ্রুপকে ঘায়েল করতে গিয়ে বিএনপির কতিপয় সুবিধাবাদী নেতা ভিন্ন কোণ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন। আর এই চরম সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে প্রকাশ্যে আকস্মিক বা ঝটিকা মিছিল করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের ব্যানারে শ্লোগান দিয়ে এসব ঝটিকা মিছিল ও নাশকতামূলক তৎপরতার খবর গণমাধ্যমে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তৃণমূলের যে কর্মীরা এই নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের রাজপথে প্রতিহত করার কথা ছিল, তারা এখন নিজেদের দলের সিনিয়রদের অবহেলা ও কোন্দলে চরম ক্ষুব্ধ ও নিষ্ক্রিয়। অন্যদিকে, বিএনপির কিছু সুবিধাভোগী নেতা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে বা নিজস্ব স্বার্থে সাবেক শাসকদলের পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং তাদের সেল্টার দিচ্ছেন। ফলে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো পুনরায় মাঠ গরম করার সাহস পাচ্ছে। এই সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে ত্যাগী কর্মীরা আরও বেশি কোণঠাসা বোধ করছেন এবং ধানের শীষের সাধারণ সমর্থকেরা মনে করছেন, দলের ভেতরের মীরজাফরদের কারণেই দীর্ঘদিনের রাজপথের অর্জন হাতছাড়া হতে বসেছে।

চট্টগ্রাম বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের দিকে গভীর মনোযোগ দিলে দলটির নিজস্ব গঠনতন্ত্রের স্পষ্ট লঙ্ঘন চোখে পড়ে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ সাধারণত দুই বছর হওয়ার কথা এবং আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বছরের পর বছর ধরে এখানে আহ্বায়ক কমিটি বহাল রয়েছে। একইভাবে, দলের মূল নিয়মনীতি অনুযায়ী কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে বা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব নির্বাচনের স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামে অনেক ক্ষেত্রেই ওপর থেকে কমিটি চাপিয়ে দেওয়া এবং ব্যক্তিগত গ্রুপিংয়ের ভিত্তিতে পদ বণ্টনের অভিযোগ নিত্যদিনের। এছাড়া দলের শৃঙ্খলা রক্ষা ও ক্ষতিকর গ্রুপিং দমনের যে কঠোর বিধান গঠনতন্ত্রে রয়েছে, তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন চট্টগ্রামে দেখা যাচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও এক চোখা নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে, যা কোন্দলকে আরও উসকে দিচ্ছে এবং নিষিদ্ধ শত্রুপক্ষকে মাঠে নামার পরোক্ষ সুযোগ করে দিচ্ছে।

চট্টগ্রামে বিএনপির এই সাংগঠনিক স্থবিরতা কোনো একটি নির্দিষ্ট জোনে বা এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়; উত্তর, দক্ষিণ এবং মহানগর—তিনটি সাংগঠনিক জেলাই একই দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত। বন্দরনগরীর প্রাণকেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও মহানগর বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উপদলীয় রাজনীতি সবচেয়ে প্রকট। বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত নেতারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে যতটা ব্যস্ত, সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধিতে বা সাধারণ মানুষকে দলের পক্ষে টানতে ততটা আন্তরিক নন। ফলে ওয়ার্ড পর্যায়ে কোনো নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনসভা বা কর্মী সমাবেশ নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার গ্রামীণ ও শহরতলী এলাকায় বিএনপির বিশাল ভোটব্যাংক ও বিপুল জনসমর্থন থাকলেও সমন্বয়ের অভাবে এবং নেতৃত্বের অহমিকার কারণে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এখানেও গ্রুপিংয়ের রাজনীতি এত তীব্র যে, এক গ্রুপের নেতা কোনো কর্মসূচি দিলে অন্য গ্রুপ তা শুধু বর্জনই করে না, বরং পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে, যার কারণে সাধারণ কর্মীরা চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান এবং মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষের কাছে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।

​একটি বৃহৎ ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের শক্তি যে মূলত তৃণমূল কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের নিবিড় ও আস্থার সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে, তা আজ সর্বজনস্বীকৃত। দেশের প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি দলটির দূরপাল্লার রাজনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। বিশিষ্টজনদের অভিমত হলো, কর্মীরা যদি একবার বুঝতে পারেন যে তাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগের, জেলের এবং মামলার কোনো মূল্য নেই এবং কেবল নির্দিষ্ট কোনো নেতার অন্ধ অনুসারী না হলে পদ পাওয়া যাবে না, তবে তারা দলবিমুখ হয়ে পড়বেন। নিষ্ক্রিয় ও হতাশ কর্মীবাহিনী নিয়ে কোনো বড় রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন বা আগামী দিনের রাজপথের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম যেহেতু দেশের সামগ্রিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, তাই এখানকার সাংগঠনিক দুর্বলতা সরাসরি কেন্দ্রের রাজনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং কেন্দ্রকে দুর্বল করে তোলে।

তবে মাঠের সব অভিযোগ ঢালাওভাবে স্বীকার করতে নারাজ চট্টগ্রাম বিএনপির বর্তমান শীর্ষস্থানীয় ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, একের পর এক মিথ্যা মামলা এবং বিগত বছরগুলোর চরম দমন-পীড়নের কারণে অনেক সময় নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দ্রুত কাউন্সিল করা বা বড় সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। তবে তারা এই বিষয়ে একমত যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দল পুনর্গঠন ও গতিশীল করার কোনো বিকল্প নেই। দলীয় নেতৃত্বের একাংশের মতে, এই সাংগঠনিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তৃণমূলের কর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে তাদের অভাব-অভিযোগ শুনতে হবে এবং মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে। একই সাথে পকেট কমিটি বা লবিং কালচার চিরতরে বন্ধ করে যারা অতীতে দলের জন্য জীবন বাজি রেখেছেন, তাদের যোগ্য স্থানে বসাতে হবে। নেতা-ভিত্তিক উপদলীয় রাজনীতি কঠোর হস্তে দমন করে দল-ভিত্তিক একক চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা করা এবং আহ্বায়ক কমিটির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে গঠনতন্ত্র মোতাবেক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্মেলন সম্পন্ন করাই এখন প্রধান কাজ।

চট্টগ্রামে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা আজ আর গোপন কোনো অন্দরের বিষয় নয়, এটি এখন দৃশ্যমান ও অনস্বীকার্য বাস্তব। দলটির শক্তির মূল উৎস এর বিশাল জনসমর্থন ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীবাহিনী, যারা শত কষ্টের মাঝেও ধানের শীষের আদর্শকে বুকে ধরে রেখেছে। কিন্তু নেতৃত্বের উদাসীনতা, হাইব্রিড নেতাদের দাপট, লবিং কালচার এবং অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণে সেই প্রদীপ্ত শক্তিতে মরিচা ধরতে শুরু করেছে। রাজনীতিতে কোনো জেলাই চিরকাল কারও দুর্গ থাকে না, যদি না তাকে সঠিক পরিচর্যা করা হয়। বিএনপি যদি আগামী দিনের রাজনীতিতে চট্টগ্রামে নিজের ঐতিহ্যগত আধিপত্য, রাজনৈতিক শক্তি এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখতে চায়, তবে অবিলম্বে দলটির হাইকমান্ডকে চট্টগ্রামের দিকে বিশেষ ও জরুরি নজর দিতে হবে। গঠনতন্ত্রের অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের অবসান, সুবিধাবাদীদের বহিষ্কার এবং ত্যাগী ও প্রবীণ নেতাদের যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল চট্টগ্রামের এই সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটানো সম্ভব। অন্যথায়, তীব্র কোন্দল এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের এই নীরব অভিমানে দলটির শক্তিশালী ভিত্তি ধসে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যা আখেরে দলটিকে এক চরম মাশুল দিতে বাধ্য করবে।পরিশেষে বলা যায়, চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সচেতন মানুষ সবসময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এই অঞ্চলের বিএনপি সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে নানা চড়াই-উতরাই পার করে দলের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেছেন। কিন্তু নেতৃত্বের এই দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা ও সমন্বয়হীনতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে জনসমর্থন থাকলেও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে মাঠের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

সুবিধাবাদীদের প্রশ্রয় দিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী শক্তিকে প্রকাশ্যে মিছিল করার সুযোগ করে দেওয়ার এই আত্মঘাতী খেলা বন্ধ না হলে সাধারণ জনগণ বিএনপির ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে। কেন্দ্রকে বুঝতে হবে যে, চট্টগ্রাম হাতছাড়া হওয়া মানে পুরো দেশের রাজনীতিতে এক বিরাট ধাক্কা খাওয়া। তাই কোনো ব্যক্তিবিশেষের পকেট ভারী করার রাজনীতিকে প্রশ্রয় না দিয়ে, প্রকৃত ও আদর্শিক নেতাকর্মীদের সামনে এনে দলকে পুনরুজ্জীবিত করাই হবে সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি এবং বুদ্ধিমানের কাজ।

লেখকঃ এম,সফিউল আজম চৌধুরী,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম।

এম,সফিউল আজম চৌধুরী :-একটি রাজনৈতিক দলের প্রাণস্পন্দন এবং টিকে থাকার মূল চালিকাশক্তি লুকিয়ে থাকে তার তৃণমূলের ওপর। কেন্দ্র যত বড় বা দূরদর্শী সিদ্ধান্তই নিক না কেন, মাঠপর্যায়ের কর্মীরা যদি সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে ঢাল হয়ে না দাঁড়ান, তবে কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি, শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস এবং political power বা রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘পাওয়ার হাউস’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বন্দর নগরীসহ পুরো চট্টগ্রামে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি কি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে? মাঠপর্যায়ের চরম বিশৃঙ্খলা, দীর্ঘদিনের আহ্বায়ক কমিটির স্থবিরতা, গ্রুপিংয়ের রাজনীতি এবং ত্যাগীদের অবমূল্যায়নের যে চিত্র বর্তমানে উঠে আসছে, তা দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে দলটির তৃণমূলের বড় একটি অংশ তীব্র ক্ষোভে ফুঁসছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো জেলার রাজনীতিতে।

​চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার বিভিন্ন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও ইউনিট পর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে কথা বললে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ, তীব্র হতাশা এবং একাকীত্বের চিত্র ফুটে ওঠে। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের একাংশের স্পষ্ট অভিযোগ হলো, দলের কঠিন সময়ে কিংবা সাধারণ সাংগঠনিক কার্যক্রমে কর্মীদের খোঁজখবর নেওয়ার এবং তাদের মূল স্রোতে সম্পৃক্ত রাখার ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে পর্যাপ্ত উদ্যোগের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এক প্রবীণ তৃণমূল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান যে, বছরের পর বছর মার খেয়ে, মামলা-হামলার শিকার হয়ে এবং দিনের পর দিন পরিবার ছেড়ে যারা ফেরারি জীবন যাপন করলেন, এখন দল গোছানোর সময় তাদের কোনো খোঁজই নেওয়া হচ্ছে না। তার মতে, বড় বড় নেতারা এসি রুমে বসে নিজেদের সুবিধামতো সিদ্ধান্ত নেন, অথচ মাঠের কর্মীদের আবেগ-অনুভূতির কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই। ফলে মাঠের কর্মীরা এখন নিজেদের দলেই পরবাসী ও চরম অবহেলিত মনে করছেন। এই অবহেলার কারণে অনেক নিবেদিত প্রাণ কর্মী রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন, যা দলের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনছে।

এই ক্ষোভ কেবল একজন নির্দিষ্ট কর্মীর নয়, বরং চট্টগ্রাম বিএনপির একটা বড় অংশের। কর্মীদের মূল অভিযোগ, আন্দোলন বা সংকটের সময়ে তাদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, স্বাভাবিক সময়ে বা দল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তাদের সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। চট্টগ্রাম বিএনপির সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক দুর্বলতার জায়গা হলো দীর্ঘকাল ধরে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে দল চালানো। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, একটি আহ্বায়ক কমিটির মূল দায়িত্ব হলো নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে, সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে, পূর্ণাঙ্গ সম্মেলন করে একটি নতুন ও শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে দেওয়া। কিন্তু চট্টগ্রামে উত্তর, দক্ষিণ কিংবা মহানগর—সবখানেই এই আহ্বায়ক সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। এক কমিটি ভেঙে আরেক আহ্বায়ক কমিটি করা হচ্ছে, কিন্তু কোনো কমিটিই পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে না। এর ফলে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না, যা দলের গঠনতান্ত্রিক কাঠামোর সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং সাধারণ কর্মীদের কর্মস্পৃহাকে ম্লান করে দিচ্ছে।এর চেয়েও বড় সংকট তৈরি করেছে তথাকথিত সুযোগসন্ধানী ও হাইব্রিড নেতাদের দাপট।

ত্যাগী ও রাজপথের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের পেছনে ঠেলে দিয়ে অর্থ, পেশীশক্তি ও লবিংয়ের জোরে একশ্রেণীর নব্য নেতা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে নিচ্ছেন বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার এক প্রবীণ সাবেক শীর্ষ নেতা দলের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করতে গিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, দলের ভেতর এখন কোনো চেইন অব কমান্ড বা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নেই। ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সব জায়গায় বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে। যারা বিগত বছরগুলোর কঠিন আন্দোলনে ঘরে লুকিয়ে ছিল বা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল, তারা এখন বড় নেতা সেজে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এবং নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। অন্যদিকে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্যারিয়ার ধ্বংস করে রাজনীতি ধরে রাখল, তারা আজ কোণঠাসা। এই প্রবীণ নেতার দাবি, গ্রুপিং রাজনীতি এখন নেতা থেকে শুরু করে কর্মী পর্যায় পর্যন্ত বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, যা দলের সামগ্রিক শক্তিকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে এবং দলকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

​বর্তমান সময়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ তীব্র কোন্দল এবং একশ্রেণীর সুযোগসন্ধানী নেতার প্রচ্ছন্ন সহযোগিতার কারণে বন্দরনগরীতে এক ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে কিংবা প্রতিপক্ষ গ্রুপকে ঘায়েল করতে গিয়ে বিএনপির কতিপয় সুবিধাবাদী নেতা ভিন্ন কোণ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন। আর এই চরম সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে প্রকাশ্যে আকস্মিক বা ঝটিকা মিছিল করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের ব্যানারে শ্লোগান দিয়ে এসব ঝটিকা মিছিল ও নাশকতামূলক তৎপরতার খবর গণমাধ্যমে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তৃণমূলের যে কর্মীরা এই নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের রাজপথে প্রতিহত করার কথা ছিল, তারা এখন নিজেদের দলের সিনিয়রদের অবহেলা ও কোন্দলে চরম ক্ষুব্ধ ও নিষ্ক্রিয়। অন্যদিকে, বিএনপির কিছু সুবিধাভোগী নেতা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে বা নিজস্ব স্বার্থে সাবেক শাসকদলের পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং তাদের সেল্টার দিচ্ছেন। ফলে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো পুনরায় মাঠ গরম করার সাহস পাচ্ছে। এই সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে ত্যাগী কর্মীরা আরও বেশি কোণঠাসা বোধ করছেন এবং ধানের শীষের সাধারণ সমর্থকেরা মনে করছেন, দলের ভেতরের মীরজাফরদের কারণেই দীর্ঘদিনের রাজপথের অর্জন হাতছাড়া হতে বসেছে।

চট্টগ্রাম বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের দিকে গভীর মনোযোগ দিলে দলটির নিজস্ব গঠনতন্ত্রের স্পষ্ট লঙ্ঘন চোখে পড়ে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ সাধারণত দুই বছর হওয়ার কথা এবং আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বছরের পর বছর ধরে এখানে আহ্বায়ক কমিটি বহাল রয়েছে। একইভাবে, দলের মূল নিয়মনীতি অনুযায়ী কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে বা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব নির্বাচনের স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামে অনেক ক্ষেত্রেই ওপর থেকে কমিটি চাপিয়ে দেওয়া এবং ব্যক্তিগত গ্রুপিংয়ের ভিত্তিতে পদ বণ্টনের অভিযোগ নিত্যদিনের। এছাড়া দলের শৃঙ্খলা রক্ষা ও ক্ষতিকর গ্রুপিং দমনের যে কঠোর বিধান গঠনতন্ত্রে রয়েছে, তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন চট্টগ্রামে দেখা যাচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও এক চোখা নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে, যা কোন্দলকে আরও উসকে দিচ্ছে এবং নিষিদ্ধ শত্রুপক্ষকে মাঠে নামার পরোক্ষ সুযোগ করে দিচ্ছে।

চট্টগ্রামে বিএনপির এই সাংগঠনিক স্থবিরতা কোনো একটি নির্দিষ্ট জোনে বা এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়; উত্তর, দক্ষিণ এবং মহানগর—তিনটি সাংগঠনিক জেলাই একই দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত। বন্দরনগরীর প্রাণকেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও মহানগর বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উপদলীয় রাজনীতি সবচেয়ে প্রকট। বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত নেতারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে যতটা ব্যস্ত, সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধিতে বা সাধারণ মানুষকে দলের পক্ষে টানতে ততটা আন্তরিক নন। ফলে ওয়ার্ড পর্যায়ে কোনো নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনসভা বা কর্মী সমাবেশ নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার গ্রামীণ ও শহরতলী এলাকায় বিএনপির বিশাল ভোটব্যাংক ও বিপুল জনসমর্থন থাকলেও সমন্বয়ের অভাবে এবং নেতৃত্বের অহমিকার কারণে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এখানেও গ্রুপিংয়ের রাজনীতি এত তীব্র যে, এক গ্রুপের নেতা কোনো কর্মসূচি দিলে অন্য গ্রুপ তা শুধু বর্জনই করে না, বরং পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে, যার কারণে সাধারণ কর্মীরা চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান এবং মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষের কাছে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।

​একটি বৃহৎ ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের শক্তি যে মূলত তৃণমূল কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের নিবিড় ও আস্থার সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে, তা আজ সর্বজনস্বীকৃত। দেশের প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি দলটির দূরপাল্লার রাজনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। বিশিষ্টজনদের অভিমত হলো, কর্মীরা যদি একবার বুঝতে পারেন যে তাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগের, জেলের এবং মামলার কোনো মূল্য নেই এবং কেবল নির্দিষ্ট কোনো নেতার অন্ধ অনুসারী না হলে পদ পাওয়া যাবে না, তবে তারা দলবিমুখ হয়ে পড়বেন। নিষ্ক্রিয় ও হতাশ কর্মীবাহিনী নিয়ে কোনো বড় রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন বা আগামী দিনের রাজপথের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম যেহেতু দেশের সামগ্রিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, তাই এখানকার সাংগঠনিক দুর্বলতা সরাসরি কেন্দ্রের রাজনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং কেন্দ্রকে দুর্বল করে তোলে।

তবে মাঠের সব অভিযোগ ঢালাওভাবে স্বীকার করতে নারাজ চট্টগ্রাম বিএনপির বর্তমান শীর্ষস্থানীয় ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, একের পর এক মিথ্যা মামলা এবং বিগত বছরগুলোর চরম দমন-পীড়নের কারণে অনেক সময় নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দ্রুত কাউন্সিল করা বা বড় সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। তবে তারা এই বিষয়ে একমত যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দল পুনর্গঠন ও গতিশীল করার কোনো বিকল্প নেই। দলীয় নেতৃত্বের একাংশের মতে, এই সাংগঠনিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তৃণমূলের কর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে তাদের অভাব-অভিযোগ শুনতে হবে এবং মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে। একই সাথে পকেট কমিটি বা লবিং কালচার চিরতরে বন্ধ করে যারা অতীতে দলের জন্য জীবন বাজি রেখেছেন, তাদের যোগ্য স্থানে বসাতে হবে। নেতা-ভিত্তিক উপদলীয় রাজনীতি কঠোর হস্তে দমন করে দল-ভিত্তিক একক চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা করা এবং আহ্বায়ক কমিটির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে গঠনতন্ত্র মোতাবেক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্মেলন সম্পন্ন করাই এখন প্রধান কাজ।

চট্টগ্রামে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা আজ আর গোপন কোনো অন্দরের বিষয় নয়, এটি এখন দৃশ্যমান ও অনস্বীকার্য বাস্তব। দলটির শক্তির মূল উৎস এর বিশাল জনসমর্থন ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীবাহিনী, যারা শত কষ্টের মাঝেও ধানের শীষের আদর্শকে বুকে ধরে রেখেছে। কিন্তু নেতৃত্বের উদাসীনতা, হাইব্রিড নেতাদের দাপট, লবিং কালচার এবং অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণে সেই প্রদীপ্ত শক্তিতে মরিচা ধরতে শুরু করেছে। রাজনীতিতে কোনো জেলাই চিরকাল কারও দুর্গ থাকে না, যদি না তাকে সঠিক পরিচর্যা করা হয়। বিএনপি যদি আগামী দিনের রাজনীতিতে চট্টগ্রামে নিজের ঐতিহ্যগত আধিপত্য, রাজনৈতিক শক্তি এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখতে চায়, তবে অবিলম্বে দলটির হাইকমান্ডকে চট্টগ্রামের দিকে বিশেষ ও জরুরি নজর দিতে হবে। গঠনতন্ত্রের অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের অবসান, সুবিধাবাদীদের বহিষ্কার এবং ত্যাগী ও প্রবীণ নেতাদের যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল চট্টগ্রামের এই সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটানো সম্ভব। অন্যথায়, তীব্র কোন্দল এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের এই নীরব অভিমানে দলটির শক্তিশালী ভিত্তি ধসে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যা আখেরে দলটিকে এক চরম মাশুল দিতে বাধ্য করবে।পরিশেষে বলা যায়, চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সচেতন মানুষ সবসময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এই অঞ্চলের বিএনপি সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে নানা চড়াই-উতরাই পার করে দলের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেছেন। কিন্তু নেতৃত্বের এই দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা ও সমন্বয়হীনতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে জনসমর্থন থাকলেও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে মাঠের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

সুবিধাবাদীদের প্রশ্রয় দিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী শক্তিকে প্রকাশ্যে মিছিল করার সুযোগ করে দেওয়ার এই আত্মঘাতী খেলা বন্ধ না হলে সাধারণ জনগণ বিএনপির ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে। কেন্দ্রকে বুঝতে হবে যে, চট্টগ্রাম হাতছাড়া হওয়া মানে পুরো দেশের রাজনীতিতে এক বিরাট ধাক্কা খাওয়া। তাই কোনো ব্যক্তিবিশেষের পকেট ভারী করার রাজনীতিকে প্রশ্রয় না দিয়ে, প্রকৃত ও আদর্শিক নেতাকর্মীদের সামনে এনে দলকে পুনরুজ্জীবিত করাই হবে সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি এবং বুদ্ধিমানের কাজ।

লেখকঃ এম,সফিউল আজম চৌধুরী,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম।