ডেস্ক রির্পোট: ভারতের উত্তর প্রদেশে বারাণসিতে জ্ঞানবাপী মসজিদ মামলার রায় দিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। মসজিদ কর্তৃপক্ষের আপত্তি ও আর্জি খারিজ করে আদালত সোমবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) মসজিদের ভূগর্ভস্থ কুঠুরিতে হিন্দুদের পুজোপাঠ জারি থাকার পক্ষে রায় দিয়েছে।
এর আগে বারাণসি জেলা আদালতও এ মামলায় হিন্দুদের পক্ষে রায় দিয়েছিল। সে রায়ের বিরুদ্ধেই এলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল মুসলিম ‘আঞ্জুমান ইন্তেজামিয়া মসজিদ কমিটি’। বলা হয়েছিল পুজোয় স্থগিতাদেশ দেয়ার কথা। কিন্তু এলাহাবাদ হাইকোর্ট এদিন বারাণসি জেলা বিচারকের ৩১ জানুয়ারির রায়ই বহাল রেখেছে।
মসজিদ কমিটির আর্জি খারিজ করে রায়ে আদালত বলেছে, ১৯৯৩ সালে উত্তর প্রদেশের সেই সময়কার মুখ্যমন্ত্রী সমাজবাদী পার্টির মুলায়ম সিং যাদব জ্ঞানবাপি মসজিদের ভূর্গভস্থ কুঠুরিতে হিন্দুদের পুজো বন্ধের যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা অবৈধ ছিল।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর ব্যস জি কা তয়খানা সিল করে দেয়া হয়েছিল। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরই পদত্যাগ করেছিলেন সে সময়কার মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং। তার সরকারও ভেঙে দেয়া হয়েছিল। এতে প্রেসিডেন্টের শাসনের পথ সুগম হয়।
পরের বছর বিধানসভা নির্বাচনে মুলায়ম সিং যাদব ক্ষমতায় আসেন। এরপর আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তার সরকার জ্ঞানবাপি মসজিদের ভূগর্ভস্থ কুঠুরি সিল করে দেয়।
হিন্দু পক্ষের দাবি ছিল, রাজ্য সরকার তয়খানায় পুজো বন্ধ করেছে। কিন্তু আবার এই পুজো শুরুর অধিকার দেয়া উচিত। এরপরই গত মাসে জেলা আদালত এক আদেশে পুজো ফের শুরুর পক্ষে রায় দেয়।
এনডিটিভি জানায়, তয়খানায় পূজো করার অধিকার দাবি করে নিম্ন আদালতে মামলা করেছিলেন শৈলেন্দ্র কুমার পাঠক ব্যস নামের এক ব্যক্তি। শৈলেন্দ্রর ভাষ্য, তার পরিবার ব্রিটিশ আমল থেকে তয়খানায় পুজো করে এসেছে।
সোমবারের রায়ে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বলেছে, “শৈলেন্দ্রর পরিবার ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত জ্ঞানবাপি মসজিদের তয়খানায় যে পুজো-অর্চনা করে এসেছে, তা অবৈধভাবে বন্ধ করেছে রাজ্য সরকার। পুজো বন্ধের লিখিত কোনও আদেশ দেওয়া হয়নি।
“ভারতের সংবিধানের ২৫ তম অনুচ্ছেদে নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা মঞ্জুর করা হয়েছে। ফলে শৈলেন্দ্রর পরিবার, যারা তয়খানায় পুজো-অর্চনা করে আসছিল, তাদের সেই অধিকার কেবল মৌখিক আদেশ দিয়ে বন্ধ করা যেতে পারে না। সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার রাজ্য ইচ্ছাকৃতভাবে নেওয়া পদক্ষেপের মাধ্যমে কেড়ে নিতে পারে না।”
আদালতের রায়ে আরো বলা হয়, শৈলেন্দ্র পাঠক বলেছেন যে, ভূর্গভস্থ কুঠুরিটি ১৫৫১ সাল থেকে তাদের পরিবারের দখলে আছে। তিনি কয়েক প্রজন্ম ধরে এটি পরিবারের দখলে থাকার দলিলও (উইল) জমা দিয়েছেন।
আদালত জানায়, “১৯৩৬ সালে সেই সময়কার রাজ্য সরকার জ্ঞানবাপি সমজিদের যে মানচিত্র দাখিল করেছিল, তাতে ‘ব্যস জি কা তয়খানা’ দেখা গেছে। আঞ্জুমান ইন্তেজামিয়া মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি, যারা জেলা আদালতের পুজো শুরুর পক্ষের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে, তারা ওই তয়খানার ওপর নিজেদের দখল থাকার প্রমাণ দিতে পারেনি।
সে কারণে আদালত বলছে, বিতর্কিত ওই ভূর্গভস্থ কুঠুরির ওপর বাদীপক্ষ তাদের দখল থাকার পোক্ত প্রমাণ দেয়ায় এবং আবেদনকারী নিজেদের দখল প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের যুক্তি অকার্যকর হয়েছে। এটি এখন অনস্বীকার্য যে, কুঠুরিটিতে হিন্দু পূণ্যার্থীদের উপাসনা এবং পুজো অর্চনা বন্ধ করাটা তাদের স্বার্থ পরিপন্থি হবে।
জ্ঞানবাপী মসজিদের এই ব্যস জি কা তয়খানায় পুজোর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই আইনি লড়াই চলে এসেছে। হিন্দুদের দাবি, মন্দির ভবনের দক্ষিণ দিকে এই কুঠুরি রয়েছে। সেখানেই মূর্তিপুজো হত।
১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর মাসের পর পুরোহিত ব্যসকে এই চত্বরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়া হয়, ব্যারিকেড দেয়া হয় কুঠুরিটিতে। সেখানে যা কিছু পুজার্চনা হত, সব রাতারাতি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ব্যস পরিবার বংশ পরম্পরায় সেখানে পুজো করে এসেছে।
হিন্দু ধর্মের পুজো সংক্রান্ত সামগ্রী প্রাচীনকাল থেকেই তয়খানায় রয়েছে বলে দাবি হিন্দুদের। রাজ্য সরকার এবং জেলা প্রশাসন ১৯৯৩ সালে সেখানে আচমকা পুজো বন্ধ করে কুঠুরি সিল করে দেয়।
হিন্দুদের আর্জি ছিল, একজনকে জ্ঞানবাপীর ভেতরে ভূগর্ভস্থ কক্ষে নিযুক্ত করা হোক। পুজোর সময় তিনি গোটা প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন।
গত ১৭ জানুয়ারি আদালত এই পর্যবেক্ষক নিয়োগ করার অনুমতিও দেয়। হিন্দুদের আরো দাবি ছিল, ভূগর্ভে এখনো যে হিন্দু মূর্তিগুলি রয়েছে, সেগুলোকে পুজা করার অনুমতি দিক আদালত।
৩১ জানুয়ারিতে বারাণসি জেলা আদালতের বিচারক এ দাবি মেনে নেন। ব্যস তয়খানা অর্থাৎ, জ্ঞানবাপীর এই ভূগর্ভস্থ কুঠুরিতে হিন্দুদের পুজোর অনুমতি দেয়া হয়।




