ঢাকা ব্যুরো: ঢাকা শহরে মেট্রোরেল চলবে- এমন দিন আর খুব বেশি দূরে নয়। কম সময়ে মেট্রোরেলে চলে যাওয়া যাবে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। থাকবে না যানজট। মেট্রোরেল যাবে মাথার উপর দিয়ে, কিন্তু নিচের রাস্তার অবস্থা কী হবে- যখন এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে নগরবাসী, তখনই মেট্রোরেলের নিচের সড়ক পরিপাটি করে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ইন্টিগ্রেটেড করিডোর ম্যানেজমেন্ট (আইসিএম) নামের একটি প্রকল্পের আওতায় মিরপুর-১২ নম্বর থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত মেট্রোরেলের নিচের সড়কে কাজ করা হবে। এ লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছে।
মেট্রোরেল এমআরটি-৬ এর স্টেশন ও উড়াল সড়কের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ২০১৭ সালের ২ আগস্ট। কাজ শুরুর পর রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলো সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। দিনের পর দিন চলাচলে চরম নাজেহাল হতে হয়েছে নগরবাসীকে। সবকিছু ঠিক থাকলে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল চলবে আগামী ডিসেম্বরেই। তবে মেট্রোরেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি উড়াল সড়কের নিচের রাস্তাগুলো। ভঙ্গুর এলোমেলো এসব রাস্তা সাজাতে উদ্যোগ নিয়েছেন ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম। এমনকি জায়গা অধিগ্রহণ ছাড়া মেট্রোরেলের যাত্রীদের জন্য ফুটপাতে ল্যান্ডিংয়ের ব্যবস্থা নিয়ে বহুবার প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
সূত্রমতে, মেট্রোরেলকে কেন্দ্র করে যে জীবনব্যবস্থা গড়ে উঠবে, তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে এই পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ স্টেশনকেন্দ্রিক যে অর্থনৈতিক বলয় গড়ে উঠবে, এর সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে জনসাধারণকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যেই আইসিএম প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সড়কের সামগ্রিক উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছে ডিএনসিসির। আইসিএম প্রকল্পের আওতায় মিরপুর-১২ নম্বর থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত মেট্রোরেলের নিচের সড়কে এই কাজ করা হবে। প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের শেষে শুরু হয়ে ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে।
জনগণের চলাচলে গতি ফেরাতে ডিএনসিসির এমন পরিকল্পনাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন নগরবিদরা। এ নিয়ে সমন্বয়হীনতার কথাও বলেছেন তারা। নগরবিদদের মতে, পরিকল্পনার অভাবেই প্রশান্তির মেট্রোরেলের সুফল নাগরিকদের কাছে থেকেও যেন বহুদূর। তারা বলছেন, আইসিএম প্রকল্পটি মেট্রোরেল প্রকল্পের সঙ্গেই যুক্ত; তাহলে এই পরিকল্পনা আলাদা কেন? এই প্রকল্প সিটি করপোরেশন নয়; মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষেরই করার কথা। এটা মেট্রোরেল ডিজাইনের অংশ। কিন্তু মেট্রোরেলের ডিজাইন কখনোই প্রকাশ হয়নি। একটা স্টেশনের পাশের ভবনের ডিজাইন
কেমন হবে, রাস্তা কেমন হবে? আমরা কেউই জানি না। তাছাড়া এই প্রকল্পের কাজ শুরু হলে জনভোগান্তি বাড়বে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধযুগ রাজধানীর সড়কগুলো মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের দখলে থাকার পর আবারো যাবে আইসিএম প্রকল্পের দখলে। শুধু তাই নয়, থাকছে যথা সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ার শঙ্কাও।
জানতে চাইলে ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, সম্প্রতি এমএমসি (মেয়র মাইগ্রেশন কাউন্সিল) ও বিশ্বব্যাংকের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছিলাম। সেখানে বাংলাদেশের বৈরী জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে জলবায়ু ফান্ডের দাবি জানাই। একই সঙ্গে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হলে কেমন হবে আমাদের নাগরিকসেবা সমূহ, তার বাস্তব অভিজ্ঞতা নিতে নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন শহরের বিভিন্ন স্থান, স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে মতবিনিময় করি। সাধারণ মানুষকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়েও পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছে।
মেয়র বলেন, আইসিএম প্রকল্পের আওতায় মিরপুর-১২ থেকে ফার্মগেট হয়ে বাংলামোটর পর্যন্ত এমআরটি-৬ লাইনকে কেন্দ্র করে শহরে যে পরিবর্তন আসবে সেটার সঙ্গে খাপ খাইয়ে আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে।
আইসিএম প্রকল্পে যা রয়েছে : আইসিএম প্রকল্পে নাগরিকদের চলাচলে বাড়তি সুবিধা দিতে ১০ কিলোমিটার সড়কে অবকাঠামো উন্নয়নে যেসব কাজ করা হবে তার মধ্যে থাকছে- ৫০টি ইলেকট্রিক বাস নামানো, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা, বাস-বে, যাত্রীছাউনি, আধুনিক টিকেট বিক্রয়কেন্দ্র, মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগ সড়কের উন্নয়ন, ট্রাফিক সংকেতের আধুনিকায়ন, সেন্ট্রাল ট্রাফিক কন্ট্রোল সেন্টার নির্মাণ, পার্কিং সুবিধা, সাইকেল লেন, ট্রাফিক ফ্লো ব্যবস্থাপনা, জনগণকে রোড ব্যবহারে শিক্ষা প্রদান কার্যক্রম।
এক্ষেত্রে মেট্রোরেলের নিচের কানেকটিভিটি কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, কী ধরনের ফুটপাত হবে, মানুষ ট্রলি নিয়ে কীভাবে রেলের কাউন্টারে পৌঁছাবে, সাইকেল কোথায় রাখা হবে- সেই অনুযায়ী সাইকেল লেন করা- টোটাল ডিজাইন বিশ্বব্যাংক করে দেবে। ৫০টি ইলেকট্রিক্যাল বাসেরও তারা ফান্ডিং করবে। এছাড়া সিভিল এভিয়েশনের ভেতরে ডিএনসিসি নিজস্ব তত্ত্বাবধানে যে খাল খনন করেছে সেই খালের পাড় বাঁধাই করা, সাইকেল লেন এবং বৃক্ষ রোপণ কার্যক্রম আইসিএম প্রজেক্টের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইসিএম প্রজেক্ট নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, আইসিএম কাজটি আরো আগে শুরু হওয়ার দরকার ছিল। এছাড়া মেট্রোরেলে ওঠানামার পদ্ধতিতে বিশৃঙ্খলতার কারণে যানজট পরিস্থিতির আরো খারাপ হতে পারে। আমরা এখন চিন্তা করছি মেট্রোরেলের নিচের একটা করিডোরের কথা। কিন্তু ঢাকার প্রায় প্রতিটি রোডের জন্যই এই মাল্টিমডেলের জন্য পরিকল্পনা প্রয়োজন। খণ্ডিতভাবে নগর চর্চা করলে যেটা হয় বা আমাদের যখন কোনো বিপদ আসে তখন তা সমাধান করি। আইসিএমও সেরকম একটি।
তিনি বলেন, মেট্রোরেল চলুক বা না চলুক, সব জায়গারই করিডোর প্ল্যান দরকার। যদিও কোন কর্তৃপক্ষ এটা নিয়ে কাজ করবে এটার গাইডলাইনও নেই। সড়কে ট্রাফিক জ্যাম এবং দুর্ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। এটা নিয়েও ভাবা দরকার। এটা না হলে নগরীর ব্যবস্থাপনায় সেই অর্থে উপকার পাওয়া যাবে না।
মেট্রোরেলের কাজ শুরু হওয়ার এত পরে কেন আইসিএম প্রজেক্টের কথা ভাবা হচ্ছে- জানতে চাইলে প্রজেক্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিএনসিসির কর্মকর্তারা জানান, মেট্রোরেলের কাজ চলাকালে গণপরিবহন চলার ক্ষেত্রে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। এ সময় সড়কের কাজ করা কঠিন ছিল। মেট্রোরেল কাজের সময় সেফটি এবং সিকিউরিটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এটা আন্তর্জাতিক পদ্ধতি। তখন এ প্রকল্পের আওতায় অন্য কোনো কাজ করা সেফটি এবং সিকিউরিটির জন্য হুমকি ছিল। ভেতরে অন্য কাজগুলো করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। এর জন্যই বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আইসিএম প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়নি।
জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশী ব্রি. জে. আমিরুল ইসলাম বলেন, আগামী ১০০ বছরের জন্য মেট্রোরেল করা হচ্ছে। এর সুফল পেতে হলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সমন্বয়ের বিকল্প নেই। ল্যান্ডিং স্টেশনে পাবলিক স্পেস খুব জরুরি। এগুলো নিশ্চিত করতে না পারলে জনগণের ভোগান্তি কমবে না। তাইতো মেট্রোরেল চালু হলে এর নিচের রাস্তা, ড্রেন, শাখা রোড, রাস্তার লাইট, পরিবেশ – এগুলোর সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে আমরা আইসিএম প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। সব কিছুই এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ডিজাইনের কাজ চলছে।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মেট্রোরেল। এখানে প্রায় সব ওঠানামার স্থান ফুটপাতে। যখনই স্টেশনগুলোতে যাত্রীরা উঠবে বা নামবে তখনই শুরু হবে ভোগান্তি। জট তৈরি হবে। এছাড়া যারা নিজস্ব গাড়ি নিয়ে আসবেন, রাখারও স্থান নেই। মেট্রোরেল স্টেশন থেকে নেমে বাসায় যাওয়ার ক্ষেত্রেও বিড়ম্বনা পোহাতে হবে। কাজটি তো মেট্রোরেল প্রকল্পের সঙ্গেই যুক্ত, তাহলে এই পরিকল্পনা আলাদা কেন? ডিএনসিসির উচিত বিষয়টি খোলামেলাভাবে প্রকাশ করা।




