বিশেষ প্রতিবেদক: নগরীর ব্যাটারি গলির বাসা থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই নিখোঁজ হন সাংবাদিক গোলাম সারোয়ার। তিন দিন পর ২০২০ সালের ১ নভেম্বর সীতাকুণ্ডের একটা খালের পাশের ঝোপের ভেতরে প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় তাঁকে উদ্ধার করে পুলিশ। ২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টার থেকে ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলামকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে ওই রাতেই চিহ্নিত অপহরণকারী তার স্ত্রীর কাছে ফোন করে ৮০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে তাকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয় আইন শৃংখলা বাহিনী। গত দুই বছরে চট্টগ্রামে বেশ কিছু অপহরণের সংগঠিত ঘটনায় অপহৃত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারগুলো আতংক এখনো কাটেনি বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানার ব্যাটারি গলির বাসা থেকে বের হওয়ার পরই নিখোঁজ হন সাংবাদিক গোলাম সরওয়ার। ওই বছরের ১ নভেম্বর সীতাকুন্ডের খালের পাশের ঝোপের ভেতর থেকে প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা। পরে সরওয়ার কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। বর্তমানে তার পরিবার আতংকে রয়েছে।
এদিকে পুনরায় অপহরণ আতংকে দিন কাটাচ্ছে মেসার্স আর.এস. কর্পোরেশন ও এস.এন. ট্রেড এর পরিচালক ও মিরসরাই জোরারগঞ্জ দূর্গাপুরের আ. হাকিম মুন্সীর বাড়ী মরহুম আবুল কালামের পুত্র মো. সাইফুল ইসলাম। বর্তমানে স্ত্রী সন্তান নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ওই ব্যবসায়ীর পরিবার। এর আগে হয়রানির শিকার সাইফুল ইসলামকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করলে দায়েরকৃত মামলায় পুলিশ অভিযোগপত্রও দাখিল করে। সাইফুল ইসলাম হালিশহরের মধ্যম রামপুরের (ফকির গলি)মৃত সামশুল আলমের পুত্র নওশাদ মাহমুদ রানার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনেন। এসব হয়রানি থেকে বাঁচতে প্রশসনের উর্ধোতন মহলের সহযোগিতা কামনা করছেন।
২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর সাইফুলকে নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টার থেকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে আশি লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবী করার অভিযোগ রয়েছে রানার বিরুদ্ধে। পরদিন ১৭ অক্টোবর সাইফুলের স্ত্রীর হালিশহর থানায় রানার বিরুদ্ধে একটি মামলা (নং- ১৯(১০)২০) করলে মহানগর গোয়েন্দা (পশ্চিম) পুলিশ আদালতে অভিয়োগপত্র দাখিল করেন। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।
একাধিক মামলা ও সালিশী আপোষনামায় জানা গেছে, সাইফুলের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে নওশাদ মাহমুদ রানা কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করাকালীন ব্যবসায়ীক ক্ষতির চেষ্টা করলে ২০১৮ সালে তাকে বিতাড়িত করার পর বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সাইফুলের উপর হামলার চেষ্টা করে। ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারী রানার সহিত সাইফুলের লিখিত আপোষনামার শতানুসারে সাইফুল রানাকে ৯৬ লক্ষ টাকা পরিশোধ করার পর রানা ভবিষ্যতে আর কোনরূপ টাকা দাবী করিবে না মর্মে অঙ্গীকার করে। এতেও ক্ষান্ত হয়নি রানা। পরে তাকে অপহরণ করা হয়।
আক্ষেপের সহিত সাইফুল ইসলাম বলেন, নওশাদ মাহমুদ রানা আমার প্রতিষ্ঠানের ৭০০০ বিল অফ এন্ট্রি ও ৭০ কোটি টাকা পাওয়ার নাটক করছে। আমার প্রতিষ্ঠান থেকে লুটে নেয়া আমার স্বাক্ষরিত খালি চেক ব্যবহার করে একের পর এক মিথ্যা মামলা করছে। রানার সহিত যাবতীয় লেনদেন সম্পূর্ণ হওয়ার পরবর্তীতে কোনরূপ ব্যবসায়িক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও পরবর্তীতে তাহার বরাবরে আমি চেক প্রদান করার বক্তব্যও হাস্যকর। সাইফুল বলেন, রানা নানানভাবে আমি ও আমার পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে, তার দাবীমত টাকা না পেলে আমাদের চরম ক্ষতি করবে এবং আরো মিথ্যা মামলা জড়িয়ে দিবে।
সাইফুল বলেন, আমি ও আমার পরিবার এখন নিরাপদ নই। যেকোনো মুহূর্তে আমাকে ও আমার পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করতে পারে। আমি নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি।
জানা গেছে, চট্টগ্রামের হালিশহরে গত ৩১ মার্চ স্কুলে যাওয়ার পথে ১৪ বছর বয়সী ৯ম শ্রেণির এক ছাত্রীকে অপহরণের অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করেন ওই শিক্ষার্থীর পরিবার। সে মামলার প্রেক্ষিতে দীর্ঘ ৩ মাস পর র্যাব নারায়ণগঞ্জ থেকে তাকে উদ্ধার করে। বর্তমানে অপহরণের শিকার ওই শিক্ষার্থী ও তার পরিবারের এখনো আতংক কাটেনি বলে জানা গেছে।
এছাড়া চট্টগ্রামে এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ‘অপহরণ’ করে অটোরিকশা করে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ চেকপোস্টে ধরা পড়ে চার যুবক। গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর
রাত আড়াইটার দিকে খুলশী থানার আমবাগান এলাকার এক চেকপোস্টে ওই চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অপহরণের একটি মামলা করেছেন ওই মাদ্রাসা ছাত্রীর বাবা। ওই পরিবারের এখনো আতংক কাটেনি বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে নবম শ্রেনীতে পড়ুয়া নাবালক ছাত্রীকে অপহরণ করে বিয়ে করেন সন্দ্বীপের ফরহাদ। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাত আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানাধীন কানন আবাসিক এলাকা থেকে সন্দ্বীপ উপজেলার মুছাপুর গ্রামের মাহফুজুর রহমানের ছেলে মো. ফরহাদকে (২২) গ্রেফতার করা হয়।
এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাট থানার পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকা থেকে ৫ বছর বয়সী এক শিশুকে অপহরণ করার ১২ ঘন্টার মধ্যে অপহৃত শিশুকে উদ্ধারের পাশাপাশি মূল অপহরণকারীকে গত ১১ জুন সন্ধ্যা ৬টায় কক্সবাজার থেকে গ্রেফতার করা হয়।
চট্টগ্রাম থেকে দেড় বছরের এক শিশুকে অপহরণ করে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় নেওয়ার পর গত ১৫ এপ্রিল সেখানের খড়কি এলাকা থেকে শিশুকে উদ্ধার ও তিনজনকে গ্রেফতা করে পুলিশ। এছাড়া চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থেকে অপহরণের শিকার ৪ বছর বয়সী এক শিশুকে কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধারের পর শিশুটিকে আদালতের মাধ্যমে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের ৮ জানুয়ারি সকালে হিলভিউ আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর রোডের বাসা থেকে চকোলেটের লোভ দেখিয়ে শিশুটিকে নিয়ে যায় টেকনাফ হ্নীলা এলাকার মোসারিকুল হাসান প্রকাশ রিফাত (২০) নামে এক যুবক। পরে শিশুটির মুক্তিপণ হিসেবে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। গত ২২ জুন চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে অপহরণ ও ধর্ষণের শিকার ১১ বছরের নাবালিকা কিশোরী গাজীপুর থেকে উদ্ধার করা হয়। ধর্ষক ও অপহরণকারী রেজাউল ইসলাম(২৮) কে র্যাব গ্রেফতার করে। ওই সব অপহরণের শিকার ও তাদের পরিবারগুলো এখনো আতংকে দিন অতিবাহিত করছে।




