চীন সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত ষষ্ঠ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু (মুক্তারপুর সেতু) সংস্কার প্রকল্পের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে রবিবার (৮ নভেম্বর) মুন্সীগঞ্জের ঢালী আম্বার নিভাস রিসোর্টে এক সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের মূল অধিবেশনের পূর্বে বাংলাদেশ ও চীনের প্রতিনিধিরা যৌথভাবে সংস্কারকৃত মুক্তারপুর সেতুর বিভিন্ন অংশ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন শেষে সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল হোসেন, চীনা দূতাবাসের কাউন্সেলর সং ইয়াং এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা চায়না রেলওয়ে ১৮তম ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানী লিমিটেডের আন্তর্জাতিক শাখার জেনারেল ম্যানেজার জ্যু ডিয়েন। অনুষ্ঠানে উভয় দেশের সেতু কর্তৃপক্ষ, প্রকৌশলী, পরামর্শক ও সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বোতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা জানান, মুন্সীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করা, পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি এবং জনগণের নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াতের মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেতুটির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারোপযোগী রাখতে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ উদ্যোগে এই সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার এটি একটি বড় নিদর্শন। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক চীন সফরে সে দেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠককে অত্যন্ত অর্থবহ উল্লেখ করে বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এর মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে এবং বাংলাদেশের বড় বড় যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে চীনের অবদান আরও বৃদ্ধি পাবে।
প্রকল্পের চুক্তিগত তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ১০ জুলাই স্বাক্ষরিত 'Exchange of Letters'-এর মাধ্যমে এই সংস্কার প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। প্রকৌশল, সংগ্রহ ও নির্মাণ (EPC) ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চীনের প্রতিষ্ঠান 'China Railway 18th Bureau Group Co. Ltd.'। ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর সংস্কার কাজ শুরু হয়ে চলতি বছরের ২১ অক্টোবর তা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়।
সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে সেতুর বিয়ারিং প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, বিমের নিচের অংশের শক্তিবৃদ্ধিসহ মূল কাঠামোগত মেরামতি করা হয়েছে এবং ফুটপাতের স্টিল প্লেট ও স্ল্যাব সংস্কার ও প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া স্টিল মেইনটেন্যান্স প্ল্যাটফর্ম ও ভার্টিক্যাল ল্যাডার স্থাপন, রেলিং উন্নয়ন, রিফ্লেক্টিভ রোড স্ট্যাড ও রোড মার্কিং বসানো এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট নির্মাণ, Seismic Locking Device স্থাপন এবং নির্দেশনামূলক ও গতিসীমা সাইনবোর্ড যুক্ত করা হয়েছে।
নির্মাণকাজ শেষে যৌথ কারিগরি পরিদর্শনের পর হস্তান্তরের স্বার্থে As-built Drawings, রক্ষণাবেক্ষণ ম্যানুয়াল ও চেকলিস্ট প্রস্তুত করে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশী প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটিতে দুই বছরের জন্য 'Quality Warranty Period' নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে 'External Technical Acceptance Certificate' হস্তান্তরের মাধ্যমে সংস্কার প্রকল্পের সমাপনী কাজ সম্পন্ন করা হয়। সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ সফল বাস্তবায়নের জন্য চীন সরকার, চীনা দূতাবাস, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও কারিগরি দলসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় শিগগিরই দ্বিতীয় মুক্তারপুর সেতু (১০ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু) নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।




