মাহবুবুর রহমান
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, চাকরিজীবী, কৃষক, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষের আগ্রহ তুঙ্গে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, কর্মসংস্থান সংকট এবং রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জের মধ্যে এবার সরকার দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বাজেট প্রণয়নের পথে এগিয়েছে। বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যম, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং নীতি-নির্ধারকদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—এবারের বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনার একটি বড় পরীক্ষাও বটে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা স্বাধীনতার পর দেশের সর্ববৃহৎ বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা
বাজেট প্রণয়নের সময় দেশের অর্থনীতি বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও চিকিৎসা খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। অন্যদিকে, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ তুলনামূলক ইতিবাচক থাকলেও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, ডলারের চাহিদা এবং রাজস্ব ঘাটতি অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে এবারের বাজেটকে একদিকে জনকল্যাণমূলক, অন্যদিকে আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত রাখতে সরকারকে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

রাজস্ব আহরণ: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান শর্ত হচ্ছে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি। প্রতি বছরই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি দেখা যায়। এ কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবার করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে কর কাঠামো সহজ করার দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো হলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। অনলাইন গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত বিভিন্ন মতামতে বলা হয়েছে, ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার এবং তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন চালু করা গেলে রাজস্ব আদায়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়বে?
মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হচ্ছে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী সংগঠন করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এর ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সাধারণ করদাতারা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে করমুক্ত সীমা বাড়ানো হলে সরকারের রাজস্ব আয় কিছুটা কমতে পারে। এজন্য কর প্রশাসনকে আরও দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কী থাকছে?
সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—বাজারদর কমবে কি না। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেট একা মূল্যস্ফীতি কমাতে পারে না; তবে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন, আমদানি সহজীকরণ এবং বাজার তদারকি জোরদারের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। সম্ভাব্য বাজেটে কৃষি ভর্তুকি, খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বরাদ্দ বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
বাংলাদেশে বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা এবং খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণের আলোচনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু ভাতার পরিমাণ বাড়ালেই হবে না; উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। বায়োমেট্রিক যাচাই এবং ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার করলে অপচয় ও অনিয়ম কমবে।

কর্মসংস্থান: বাজেটের কেন্দ্রে
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবারের বাজেটে কর্মসংস্থানকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নতুন কর্মী নিয়োগে কর ছাড়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রণোদনা এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি চাকরি নয়; বেসরকারি খাত, স্টার্টআপ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমেই বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।

শিক্ষা খাতের প্রত্যাশা
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দীর্ঘদিনের দাবি। দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ডিজিটাল শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য অধিক বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া স্মার্ট অর্থনীতি গঠন সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব
করোনার অভিজ্ঞতার পর স্বাস্থ্য খাতকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়ন, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিশেষায়িত হাসপাতাল বৃদ্ধি এবং ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর আলোচনা রয়েছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা
কৃষি এখনও বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের ভর্তুকি, সেচ সুবিধা, কৃষিযন্ত্র বিতরণ এবং কৃষিঋণ সম্প্রসারণের দাবি রয়েছে। অনলাইন বিশ্লেষণগুলোতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি গবেষণা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

অবকাঠামো উন্নয়ন
বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সড়ক, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ এবং নগর অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে চলমান প্রকল্পগুলোর দ্রুত ও সুশাসনভিত্তিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত স্থিতিশীলতা, কর কাঠামোর সরলীকরণ এবং ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানোর দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ী মহল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া টেকসই কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। তাই বাজেটে শিল্প খাতের জন্য প্রণোদনা, রপ্তানি সহায়তা এবং এসএমই উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব থাকতে পারে।

ডিজিটাল অর্থনীতি ও স্টার্টআপ
তথ্যপ্রযুক্তি খাত বর্তমানে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর একটি। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ ফান্ড, উদ্ভাবন সহায়তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের দাবিও উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রস্তাবে যুব উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসার জন্য কর সুবিধার কথা বলা হয়েছে।

বাজেট বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, বড় বাজেট ঘোষণা করাই সাফল্য নয়; বরং কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ বিভাগ ইতোমধ্যে বাজেট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা (BIP), iBAS++ ব্যবস্থার ব্যবহার এবং ত্রৈমাসিক ব্যয় পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে অপচয় কমানো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
সাধারণ মানুষ বাজেট থেকে মূলত চারটি বিষয় প্রত্যাশা করে— নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে উন্নত সেবা। করের চাপ কমানো। অনলাইন গণমাধ্যমের জরিপ ও মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানুষ উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়।

শেষ কথা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। একদিকে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা; অন্যদিকে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার চাহিদা—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই সরকারকে বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে। বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যম, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং নীতি বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে স্পষ্ট যে এবারের বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ে—রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুশাসনভিত্তিক বাস্তবায়ন। বাজেট যদি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে, বিনিয়োগ বাড়াতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়, তাহলে তা শুধু একটি আর্থিক দলিল নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।

মাহবুবুর রহমান, লেখক ও গবেষক। ই-মেইল: lvlchkm885@gmail.com 

মাহবুবুর রহমান
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, চাকরিজীবী, কৃষক, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষের আগ্রহ তুঙ্গে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, কর্মসংস্থান সংকট এবং রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জের মধ্যে এবার সরকার দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বাজেট প্রণয়নের পথে এগিয়েছে। বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যম, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং নীতি-নির্ধারকদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—এবারের বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনার একটি বড় পরীক্ষাও বটে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা স্বাধীনতার পর দেশের সর্ববৃহৎ বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা
বাজেট প্রণয়নের সময় দেশের অর্থনীতি বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও চিকিৎসা খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। অন্যদিকে, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ তুলনামূলক ইতিবাচক থাকলেও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, ডলারের চাহিদা এবং রাজস্ব ঘাটতি অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে এবারের বাজেটকে একদিকে জনকল্যাণমূলক, অন্যদিকে আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত রাখতে সরকারকে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

রাজস্ব আহরণ: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান শর্ত হচ্ছে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি। প্রতি বছরই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি দেখা যায়। এ কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবার করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে কর কাঠামো সহজ করার দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো হলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। অনলাইন গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত বিভিন্ন মতামতে বলা হয়েছে, ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার এবং তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন চালু করা গেলে রাজস্ব আদায়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়বে?
মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হচ্ছে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী সংগঠন করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এর ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সাধারণ করদাতারা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে করমুক্ত সীমা বাড়ানো হলে সরকারের রাজস্ব আয় কিছুটা কমতে পারে। এজন্য কর প্রশাসনকে আরও দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কী থাকছে?
সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—বাজারদর কমবে কি না। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেট একা মূল্যস্ফীতি কমাতে পারে না; তবে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন, আমদানি সহজীকরণ এবং বাজার তদারকি জোরদারের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। সম্ভাব্য বাজেটে কৃষি ভর্তুকি, খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বরাদ্দ বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
বাংলাদেশে বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা এবং খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণের আলোচনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু ভাতার পরিমাণ বাড়ালেই হবে না; উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। বায়োমেট্রিক যাচাই এবং ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার করলে অপচয় ও অনিয়ম কমবে।

কর্মসংস্থান: বাজেটের কেন্দ্রে
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবারের বাজেটে কর্মসংস্থানকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নতুন কর্মী নিয়োগে কর ছাড়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রণোদনা এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি চাকরি নয়; বেসরকারি খাত, স্টার্টআপ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমেই বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।

শিক্ষা খাতের প্রত্যাশা
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দীর্ঘদিনের দাবি। দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ডিজিটাল শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য অধিক বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া স্মার্ট অর্থনীতি গঠন সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব
করোনার অভিজ্ঞতার পর স্বাস্থ্য খাতকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়ন, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিশেষায়িত হাসপাতাল বৃদ্ধি এবং ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর আলোচনা রয়েছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা
কৃষি এখনও বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের ভর্তুকি, সেচ সুবিধা, কৃষিযন্ত্র বিতরণ এবং কৃষিঋণ সম্প্রসারণের দাবি রয়েছে। অনলাইন বিশ্লেষণগুলোতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি গবেষণা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

অবকাঠামো উন্নয়ন
বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সড়ক, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ এবং নগর অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে চলমান প্রকল্পগুলোর দ্রুত ও সুশাসনভিত্তিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত স্থিতিশীলতা, কর কাঠামোর সরলীকরণ এবং ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানোর দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ী মহল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া টেকসই কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। তাই বাজেটে শিল্প খাতের জন্য প্রণোদনা, রপ্তানি সহায়তা এবং এসএমই উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব থাকতে পারে।

ডিজিটাল অর্থনীতি ও স্টার্টআপ
তথ্যপ্রযুক্তি খাত বর্তমানে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর একটি। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ ফান্ড, উদ্ভাবন সহায়তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের দাবিও উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রস্তাবে যুব উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসার জন্য কর সুবিধার কথা বলা হয়েছে।

বাজেট বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, বড় বাজেট ঘোষণা করাই সাফল্য নয়; বরং কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ বিভাগ ইতোমধ্যে বাজেট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা (BIP), iBAS++ ব্যবস্থার ব্যবহার এবং ত্রৈমাসিক ব্যয় পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে অপচয় কমানো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
সাধারণ মানুষ বাজেট থেকে মূলত চারটি বিষয় প্রত্যাশা করে— নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে উন্নত সেবা। করের চাপ কমানো। অনলাইন গণমাধ্যমের জরিপ ও মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানুষ উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়।

শেষ কথা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। একদিকে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা; অন্যদিকে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার চাহিদা—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই সরকারকে বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে। বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যম, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং নীতি বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে স্পষ্ট যে এবারের বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ে—রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুশাসনভিত্তিক বাস্তবায়ন। বাজেট যদি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে, বিনিয়োগ বাড়াতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়, তাহলে তা শুধু একটি আর্থিক দলিল নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।

মাহবুবুর রহমান, লেখক ও গবেষক। ই-মেইল: lvlchkm885@gmail.com