খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় হত্যা, হামলা ও সংঘর্ষের প্রতিবাদে জেলাতে হাজারো জনতার শহীদ জুনান ও রুবেলের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, দাহক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। জেলা সদর নারাঙহিয়া ও স্বনিভর এলাকায় সেনাবাহিনীর গুলিতে অভিযোগে নিহত শহীদ জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। এতে নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুসারে নিজেদের বাড়িতে অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে তাদের দাহক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
আজ শনিবার(২১ সেপ্টেম্বর) প্রথমে সকাল ১১টায় শহীদ রুবেল ত্রিপুরার নিজ গ্রাম পল্টনজয় পাড়ায় তাঁর দাহক্রিয়া অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। দাহক্রিয়ার আগে তার মরদেহের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। চিতায় আগুন দিয়ে রুবেল ত্রিপুরার দাহক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
শ্বরলাল ত্রিপুরা বলেন, শহীদ রবেল ত্রিপুরা ছিলেন খাগড়াছড়ির সদর পল্টনজয় পাড়া গ্রামের এক নিস্তাবান ও সাহসী যুবক। তিনি দেশ ও পাহাড়ি জাতির পক্ষে লড়তে গিয়ে বীরের মতো শহীদ হয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, খাগড়াছড়িতে উগ্রবাদী সেটেলার দ্বারা পাহাড়িদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদ জানাতে ও যাতে খাগড়াছড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটতে না পারে তার জন্য তিনি বেশ কয়েকজন যুবককে সংগঠিত করে স্বর্নিভর এলাকায় ছুটে যান, আর সেই রাতেই তিনি সেনাবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। রুবেল ত্রিপুরার মৃত্যুতে শুধু গ্রামের মানুষই নয়, সারা পাহাড়ে আজ শোকের ছায়া পড়েছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও মানুষের মাঝে।
তিনি বলেন, রুবেল ত্রিপুরা নিরপরাধ হয়েও বিনা কারণে সেনাবাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলিতে শহীদ হয়েছে, আমরা সেনাবাহিনীর এমন দুঃশাসনের প্রতি নিন্দা জানাচ্ছি।
পরে দুপুর ২ঘটিকার সময়ে শহীদ জুনান চাকমাকে তার নিজ গ্রাম জামতুলি যুবরাজ পাড়ায় দাহক্রিয়া করা হয়। দাহক্রিয়ার আগে এলাকার সর্বস্তরের জনগণ জুনান চাকমার মরদেহের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শহীদ জুনান চাকমার মরদেহ বহন করে নেয়া হয়েছে।
এতে পেরাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কান্তিলাল চাকমা বলেন, জুনান চাকমা শুধু জামতুলি যুবরাজ পাড়ার সন্তান নয়, সে সমগ্র জুম্মজাতির বীর সন্তান। তার মৃত্যুুটাই পাহাড়ের সমান। কারণ সে জাতির ক্রান্তি লগ্নে তার তাজা প্রাণ বলি দিয়েছেন। সে অমর, যুগ যুগ ধরে জাতি স্মরণ করবে।
সংহতি জানিয়ে এতে আরো বক্তব্য রাখেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) খাগড়াছড়ি সদর সংগঠক প্রকাশ চাকমা।
তিনি বলেন, দীঘিনালায় উগ্রবাদী সেটলার বাঙালি কর্তৃক পাহাড়িদের উপর যে সাম্প্রদায়িক হামলা তা বন্ধের জন্য সেনাবাহিনী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি হয়নি, বরং তারা নিরব ছিল। এমতাবস্থায় খাগড়াছড়িতে দীঘিনালা ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্র-যুবকসহ সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমেছে, যাতে খাগড়াছড়িতেও সেটলার বাঙালিদের হামলা রুখে দেয়া যায়। কিন্তু সেনাবাহিনী পাহাড়িদের নিরাপত্তা না দিয়ে উল্টো যারা ঘটনার প্রতিবাদ জানাচ্ছিল, হামলা প্রতিরোধের জন্য পথে নেমেছিল তাদেরকেই এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা ও আহত করেছে। আর এতে জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরা নিহত হয়েছেন এবং আরো বহু মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, আমরা পাহাড়ে নিপীড়নমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মানে ন্যায়ের পক্ষে কথা বলছি এবং সর্বদা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে যাবো। আগামী দিনে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অস্তিত্ব রক্ষা না হওয়ার পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তিনি অবিলম্বে জুনান চাকমা ও রুবেল ত্রিপুরার হত্যার ঘটনা সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক জড়িত সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদেরকে অপসারণপূর্বক আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান। একই সাথে তিনি নিহত-আহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও সুকিকিৎসার দাবি করেন।
উল্লেখ্য, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ রাতে দীঘিনালায় পাহাড়িদের ওপর সেটলার হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিতে গিয়ে স্বনিভর এলাকায় সেনাবাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলিতে রুবেল ত্রিপুরা ও জুনান চাকমা নিহত হন। এছাড়া আরো ১২জনের অধিক গুরুতর আহতসহ বহু লোক আহত হন।
প্রসঙ্গত, খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় পাহাড়ি ও বাঙালির সংঘর্ষের জের ধরে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতভর জেলা সদরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে সদরসহ পুরো জেলায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। রাতের গোলাগুলি ও বিকেলের সংঘর্ষের ঘটনায় তিন জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত শতাধিক।
উল্লেখ্য খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা শহরের পানখাইয়া পাড়া নিউজিল্যান্ডের নোয়াপাড়া এলাকা থেকে মো: মামুন(৩০) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বুধবার(১৮ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। চুরির দায়ের অপরাধে গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়েছে এমনটাই ধারণা করছেন এলকাবাসী। বুধবার ভোরে পানখাইয়া পাড়া এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত মামুন জেলা শহরের মধ্যশালবাগান এলাকার মৃত নূর নবীর ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মামুন শালবাগান নিজ এলাকায় কাঠের ফার্নিচারের ব্যবসা করেন। মামুন চুরির অপরাধে এর আগেও বেশ কয়েকবার জেল খেটেছেন। তার মরদেহের পাশে একটি মোটর সাইকেল পড়েছিলো।
আরো উল্লেখ্য, বাঙ্গালী সংগঠনগুলোর দাবী, একটি আঞ্চলিক দলের সদস্যরা তাকে হত্যা করে। সেনাবাহিনী সৃষ্ট ইউপিডিএফ গনতান্তিক(সংস্কার) সংগঠনকে দায়ী করেছে। এ ঘটনার ভিডিও স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে বাঙালিদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। বুধবার সকালে খাগড়াছড়ি জেলা সদরে এক বাঙালি যুবককে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিকেলে দীঘিনালা সরকারি কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল হামলা চালানো হয়। হামলার ঘটনার জেরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ফাঁকাগুলি ও অর্ধ শতাধিক দোকানপাটে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে পাহাড়িদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা, খুন ও বিহার-ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিযেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)। এছাড়া দলটি ঢাকায় বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র-জনতার আয়োজিত সমাবেশ থেকে ঘোষিত তিন পার্বত্য জেলায়(রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) ৭২ঘন্টা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচির প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন জানিযেছে।




