*ইমারত পরিদর্শক বিমান বড়ুয়ার প্রত্যক্ষ মদদ
নজরুল ইসলাম: নগরীর জামালখানের আসকারদীঘির পাড়ে(এস আলমের পাহাড়) একটি প্রভাবশালী বাইন্যা সিন্ডিকেট বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ের একটি প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনকে বৃদ্ধিঙ্গালী দেখিয়ে পাহাড় নিধন করে ১৭তলা ভবন নির্মাণ করে ৯২টি ফ্লাট বাড়ি বানিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকায় বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মহানগরে বাইন্যা সিন্ডিকেটের খপ্পড়ে পড়ে অনেক সনাতনী জমির শেয়ার ক্রয় করে সর্বসান্ত হয়েছে।এই সিন্ডিকেটের পৃথক পৃথক গ্রুফের সদস্যরা হলেন-চন্দন ধর,মাইকেল দে,খোকন ধর,সজল ধর,পিকলু ধর,মিন নাথ ধর ও বরুণ হাজারী। এদের মধ্যে অনেকেই অবৈধ স্বর্ণ চোরাচালানী ব্যবসায় নিয়োজিত।এছাড়াও এদের অনেকের বিরুদ্ধে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের নগরের বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে।
অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিলেও সিডিএ’র ইমারত পরিদর্শক বিমান বড়ুয়ার প্রত্যক্ষ ইন্ধনে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের অসাধু কিছু কর্মকর্তার সহযোগিতায় গোপনে আবার নির্মাণ কাজ শুরু করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পাহাড় নিধন করে ভবন নির্মাণ করার আগে পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশন, সিডিএসহ সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরের কোন অনুমোদন না নিয়ে জোর পূর্বক কাজ শুরু করেছে। অবৈধভাবে ভবন নির্মানের কাজ করতে গিয়ে প্রশাসন লোক দেখানো অভিযানে সামান্য জরিমানা করলেও তাদের এ হেন অবৈধ কর্মকান্ড থেমে নেই বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
প্রশাসনের একটি গ্রুপ ও স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতাদের সাথে গোপন সমঝোতায় এ অবৈধ কাজ চলমান রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নগরীর জামালখান ওয়ার্ডের আসকরদীঘি পাড় এলাকায় সংরক্ষিত পাহাড়ের ঢালের সর্বোচ্চ চূড়া ১২৭ ফুট উঁচু। সেই পাহাড়টি সরকারের রেকর্ডে বাড়ি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। এই ভূমিতে ৮৬ শর্তে ১৭তলা করে তিনটি টাওয়ার নির্মাণের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এমপি ও মন্ত্রী, সিটি মেয়র প্রভাব খাটিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) থেকে অনুমোদন নেন। এসব শর্তের মধ্যে ভবন নির্মাণের আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আবশ্যক। কিন্তু ছাড়পত্র না নিয়েই দিনে রাতে পাহাড় কেটে চলছে ভবন নির্মাণের কাজ। বিভিন্ন কৌশলে জায়গার হাত বদল হয়ে কথিত সাংবাদিক পরিচয় দানকারী সজল চৌধুরী, পিতা বিমলেন্দু চৌধুরী, খোকন ধর, পিতা- মৃত বিপিন চন্দ্র ধর,হিমেল দাশ, পিতা শান্তিপদ দাশ, অমল কৃঞ নাথ, পিতা- মিলন কান্তি নাথ, সুভাষ নাথ,পিতা- মৃত অশ্বিনী নাথ, রনজিত কুমার দে, পিতা- রাখাল চন্দ্র দে, রূপক সেনগুপ্তসহ ৯২ জনের বাইন্য সিন্ডিকেটের নাম হাতে এসেছে।
নথি দৃষ্টে জানা গেছে,শূন্য দশমিক ৫০৭৯ একরের এই জায়গা ১০কোটি টাকায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কিনেছেন তারা। জায়গাটি জামালখান এসএস খালেদ রোডের গ্রিন্ডল্যাজ ব্যাংকের পাহাড় বলে পরিচিত। ভবন নির্মাণের অনুমোদনের আবেদনের সময় জায়গার যে কন্টুর ম্যাপ (ভূমির অবস্থানগত উচ্চতা যে মানচিত্রে বোঝা যায়) জমা দিয়েছে, সেখানেও এই জায়গায় সর্বোচ্চ চূড়ার উচ্চতা ১২৭ ফুট দেখানো হয়েছে।
কাগজ পত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি ৯২ জনের নামে জমিটির নামজারি হয়। সিডিএতে জমা দেওয়া নথিতে দেখা যায়, রহমতগঞ্জ মৌজার ১৯৬৬ নম্বর বিএস খতিয়ানে ৫০২ (অংশ) দাগ বাড়ি হিসেবে লিপিবদ্ধ। বিএস জরিপে এই জায়গা বাড়ি হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। আসকারদীঘির পূর্ব পাড়, জামালখান প্রেস ক্লাব, এসএস খালেদ রোড ও হেমসেন লেনের মধ্যবর্তী প্রায় আধা বর্গ কিলোমিটার এলাকাটি একটি পাহাড়। এই পাহাড়ের চূড়ায় অনেক আগে একটি বাংলো ছিল, সেই হিসেবে হয়তো তা বাড়ি হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা বাড়ি শ্রেণির ভূমি নয়।
১৯৮৫ সালের দিকে দেশে বিএস জরিপের সময় তা বাড়ি হিসেবে রেকর্ড হয়েছে, যা রহমতগঞ্জ মৌজার ৭৮১ নম্বর খতিয়ানে উল্লেখ রয়েছে। পরে ১৬৯৪ নম্বর খতিয়ানেও তা বাড়ি হিসেবে নামজারি হয়েছে। বহুতল ভবনের অনুমোদন প্রতি ১৭তলার তিনটি ভবন নির্মাণের নগর উন্নয়ন কমিটির অনুমোদন পায় ২০২০ সালের নগরীর আওয়ামী লীগ সরকারের সেই সময়ে স্থানীয় এমপি ও মন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও ৭ মার্চ ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের অনুমোদন পায় ২০২২ সালের ১১ মে এবং বিশেষ প্রকল্পের ছাড়পত্র পায় ২০২৩ সালের ৫ মার্চ।
সর্বশেষ ইমারত নির্মাণ কমিটির কাছ থেকে তিনটি বেইজমেন্ট ও ১৪তলা (পাহাড়ে বেইজমেন্ট হয় না, বাস্তবে তিনটি পার্কিং ফ্লোর ও ১৪তলা আবাসিক মোট ১৭তলা) ভবনের অনুমোদন নেওয়া হয় ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল। নগর উন্নয়ন কমিটি ৭টি, বিশেষ কমিটি ২৫টি, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র কমিটি ২২টি, ইমারত নির্মাণ কমিটি ৩২টি শর্ত দিয়েছিল ভবনগুলো নির্মাণে। যদিও চার কমিটির এই ৮৬ শর্তের অনেকগুলোরই একটির সঙ্গে আরেকটির মিল আছে।
২০১০ সালের সংশোধিত পরিবেশ আইনে পাহাড়কাটা সম্পূর্ণ নিষেধ। তবে জাতীয় স্বার্থে সরকারের প্রয়োজনে অনুমোদন সাপেক্ষে পাহাড়কাটা যেতে পারে। তবে এরপর থেকে এ পর্যন্ত কোনো পাহাড়কাটার অনুমোদন পরিবেশ অধিদপ্তর দেয়নি। অপরদিকে, ২০০৮সালের ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী পাহাড়ে স্বল্প উচ্চতার ভবন নির্মাণ করতে পারলেও নগর উন্নয়ন কমিটির অনুমোদন লাগবে। একই কথা বলা রয়েছে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ)। সেখানে জামালখান ও আসকারদীঘির পাহাড়ের কথা উল্লেখ করে সরাসরি বলা হয়েছে, স্বল্প উচ্চতার কম ঘনত্বের উচ্চবিত্তের আবাসন ভবনের অনুমোদন দেওয়া যাবে।
৯২ ফ্ল্যাটের অনুমোদনও দেওয়া হয়নি। ২০০৮ সালে গেজেট আকারে প্রকাশিত হওয়া ড্যাপ অনুযায়ী সিডিএ ইমারত নির্মাণ কমিটি অনুমোদন দিয়ে থাকে। ড্যাপ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কেউ নকশা জমা দিলে তা নগর উন্নয়ন কমিটির কাছে যায়। নগর উন্নয়ন কমিটি সবকিছু পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেন। ড্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই এলাকায় বহুতল ভবন করার অনুমতি দেওয়ার কথা নয়। কিন্তু পাহাড়টিতে ১৭তলার ৩টি টাওয়ারে ৯২টি ফ্ল্যাটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতগুলো ফ্ল্যাটের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর উন্নয়ন কমিটির একাধিক সদস্য।
অবৈধভাবে ভবন নিমাণ করে ফ্লাট ব্যবসা করার বিষয়ে জানতে চাইলে মালিকদের একজন খোকন ধর বলেন, জায়গাটি আমরা অনেকে অংশীদার হিসেবে নিয়েছি, আমাদের মধ্যে কারো কারো অসহযেগিতা আছে, কাগজ পত্র যেগুলো ছিল না সেগুলো আমরা ঠিক করার চেষ্ঠা করছি, আওয়ামী লীগ সরকার পতন হওয়ার পর প্রশাসনের অনেক কিছু পরিবতন হয়েছে না হয় এতদিন আমাদের কাজ শেষ হয়ে যেত।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগাম মেট্টো পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বলেন, পাহাড় কেটে ভবন নিমাণ করার বিষয়ে এলাকা থেকে বিভিন্নভাবে খবর আসছে, এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আশা করি অল্প সময়ের মধে উক্ত এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হবে।
সিডিএ’র অথরাইজ অফিসার-২ তানজীব হোসেন জানান, এই জায়গা নিয়ে বিরোধ রয়েছে শুনেছি তথ্য গোপন করে সিডিএ থেকে অনুমোদন নেয়া হয়েছিল, সিটি কপোরেশনের মাজিস্টেট অভিযান চালিয়ে নিমাণ কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল শুনছিলাম এখন কি অবস্থা আমার জানা নেই।
এ বিষয়ে চট্টগাম সিটি কপোরেশনের নিবাহী মাজিস্টেট সর্ববিদ্যা জানান, নিয়ম মাফিক ভবন নির্মাণ না করায় নির্মাণাধীন ভবনের কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, তারা বিধি ভঙ্গ করে ভবন নির্মাণ করতে চেয়েছিল তাদের জরিমানা করা হয়েছিল এখন যদি কাজ আবার করার চেষ্ঠা করে আবার জরিমানা করা হবে, কাজ বন্ধ রাখার জন নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।




