*পাহাড় উধাও, বনভূমি দখলে সিন্ডিকেট—অভিযোগ বন কর্মকর্তার যোগসাজশ
*এক বছরে বদলে গেছে বনভূমির চিত্র—গাছের জায়গায় গোড়ালি, পাহাড়ে ঘরবাড়ি
*প্রতিবাদ করলেই মামলা ও হয়রানির অভিযোগ
বিজন কুমার বিশ্বাস, কক্সবাজার: চকরিয়া উপজেলার ডুলহাজারা বনবিটের আওতাধীন বিশাল বনভূমি দ্রুতই হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক রূপ। এক সময়ের ঘন সবুজ বন এখন অনেকাংশেই পরিণত হয়েছে প্রায় বিরানভূমিতে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ কেটে ফেলার যেন চলছে এক নীরব মহোৎসব। ফলে বনের প্রাণীকুল তাদের আবাসস্থল হারিয়ে লোকালয়ের দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকায় আর বড় গাছ নেই—শুধু পড়ে আছে সদ্য কাটা গাছের গোড়ালি। দেখে মনে হয়, খুব সম্প্রতি নির্বিচারে গাছ নিধন চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে স্কেভেটর ও ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে টিলা ও বালুসমৃদ্ধ পাহাড় কেটে মাটি বিক্রিরও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, বনবিটের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ মদদে ‘বনখেকো’ ও ‘মাটিখেকো’ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ডুলহাজারা বনবিট কর্মকর্তা শাহরিয়ার আমিন, হেডম্যান মনজুর আলম এবং সিপিজি সদস্য আলী আকবরের মধ্যে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
একাধিক সূত্র জানায়, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের অধীনে প্রায় ১৩ হাজার ৪৪৪ একর বনভূমির মধ্যে অন্তত ৫৫৪ দশমিক ৮১ একর ইতোমধ্যে ১ হাজার ৯৪৮ জনের দখলে চলে গেছে। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বন ধ্বংস হয়েছে ডুলহাজারা বনবিট এলাকায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত এক বছরে বনভূমির ভেতরে ব্যাপক হারে গড়ে উঠেছে বসতঘর, দোকানপাট এমনকি কিছু স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। বিশেষ করে রেললাইনের পশ্চিম পাশে ফুটেরঝিরি এলাকায় গহীন বন প্রায় সম্পূর্ণ উজাড় করে বসতি স্থাপন করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, কেউ গাছ কাটার প্রতিবাদ করলে তাকে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
রিংভং বনবিট এলাকার বাসিন্দা নুরুল আমিন জানান, গত ১২ রমজানে গাছ চোরদের বাধা দিতে গিয়ে তিনি উল্টো মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে কারাভোগ করেন। তার দাবি, সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তার নির্দেশেই তাকে ফাঁসানো হয়েছে।
পাহাড়ে বসবাসকারী কয়েকজন বলেন, “গাছ চোরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, বরং নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হয়। এতে করে কেউ আর প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না।
পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে বন উজাড় অব্যাহত থাকলে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, পুরো এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হবে। পাহাড় কেটে ফেলার ফলে ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডুলহাজারা বনবিটের এই চলমান ধ্বংসযজ্ঞ রোধে জরুরি ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। নইলে অচিরেই এই বনভূমি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।




