বিশেষ প্রতিবেদক: সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পরিকল্পিতভাবে সারা দেশে সুষমভাবে শিল্পায়নের লক্ষ্য নিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় সরকার। আর এজন্য প্রণয়ন করা হয় ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন, ২০১০’। যার পথ ধরে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেজা। যার গভর্নিং বডির প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে বেজার গভর্নিং বডি।
দেশের প্রস্তাবিত ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ৬৮টি। এর মধ্যে ১৫টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন, যেখানে নির্মাণাধীন রয়েছে ৩৭টি শিল্প প্রতিষ্ঠান। সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ২ শতাধিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ৬ হাজার ৭৬২ একর জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যেখানে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ২৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এই বিনিয়োগের বিপরীতে সাড়ে আট লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বেজা কর্তৃপক্ষ বলছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরীতে থাকছে কেন্দ্রীয় তিনটি বর্জ্য শোধনাগার। কমপ্লায়েন্স বিবেচনায় ৩৩ হাজার একর আয়তনের এই শিল্প নগরীর ১৭ হাজার একর ভূমিতে কারখানা স্থাপন করা যাবে। বাকিটা থাকবে সবুজায়ন এবং উন্মুক্ত। এখন পর্যন্ত ২০টি দেশি-বিদেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান শিল্প স্থাপনের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এখানে প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৪১ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার।

এ ছাড়াও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৩৫২ একর জমির ওপর অবস্থিত শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যেই দু’টি শিল্প কারখানা উৎপাদনে রয়েছে এবং তিনটি শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজ চলছে। এ ছাড়া জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলেও তিনটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।
বেসরকারি উদ্যোগে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের মাধ্যমে শিল্পায়নের গতিকে ত্বরান্বিত করতে সরকারের নেয়া পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন হচ্ছে দ্রুত গতিতে। ইতোমধ্যেই ২৯টি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে ১৩টি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। চূড়ান্ত লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৮টি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ইতোমধ্যেই উৎপাদন শুরু করেছে। যেখানে উৎপাদনে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৭টি। এ সব শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ হয়েছে সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, জার্মানি, ভারত ও নরওয়েসহ বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এসব বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে।
এই বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ৭৮ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত সিটি গ্রুপের ইকোনোমিক জোনে এ পর্যন্ত ৭৫৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে।সেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ছয় হাজার কর্মীর। এ ছাড়া ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ১১০ একর জমির ওপর অবস্থিত মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনোমিক জোনে প্রায় অর্ধবিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। সেখানে ইতোমধ্যেই কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১১ হাজার কর্মীর।

সরকারি ও বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি বর্তমানে চারটি ’গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট’ বা ’জিটুজি’ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনোমিক জোন বা জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৭৮৩ একর জমিতে চাইনিজ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনোমিক জোন, এবং মিরসরাইয়ে ৮৫৬ একর জমিতে ও মোংলায় ১১০ একর জমিতে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল।
এগুলোর পাশাপাশি ৩টি পর্যটন পার্ক উন্নয়নেরও কাজ চলমান রয়েছে বেজার অধীনে। এগুলো হল- মহেশখালীর সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক, টেকনাফের সাবরাং ও নাফ ট্যুরিজম পার্ক। সাবরং ট্যুরিজম পার্কে ইতোমধ্যেই ২২টি প্রতিষ্ঠানকে জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সেখানে উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুন বলেন,বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে থাকে। বেজার গভর্নিং বোর্ড এ পর্যন্ত ৯৭টি অর্থনৈতিক জোনের স্থান নির্ধারণের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি অর্থনৈতিক অঞ্চল বিভিন্ন পর্যায়ে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য অর্থনৈতিক অঞ্চলেগুলোর ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সমীক্ষার কাজ চলমান। যে ২৯টি অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নাধীন রয়েছে, তার মধ্যে ১১টি অঞ্চল থেকে পণ্য উৎপাদন ও রফতানির কাজ শুরু হয়েছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের। অর্থনৈতিক এ অঞ্চলে অচিরেই আরও ৫২টি শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে আসতে যাচ্ছে। যেখানে কর্মসংস্থান হবে আরও অর্ধ লাখ মানুষের।
বেজা বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন করে, এর মধ্যে গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট বা জিটুজি, বেজার নিজস্ব জোন আছে, প্রাইভেট ইকোনোমিক জোন রয়েছে,স্পেশাল জোন রয়েছে। এভাবে মোট ছয়টি ক্যাটাগরির ইকোনোমিক জোন রয়েছে।
বেজা নিজের উদ্যোগে যে সব অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন করছে, তার মধ্যে মিরসরাইয়ে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর সবচেয়ে বড়। এখানে ইতোমধ্যেই ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এখানে বর্তমানে মোট ২২টি শিল্প নির্মাণাধীন রয়েছে। আরও ২৫ থেকে ৩০টি শিল্প নির্মাণের কাজ অচিরেই শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন অথরিটি বা বেপজাকে আলাদা জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সেখানেও এখন বিভিন্ন ধরনের শিল্প কারখানা নির্মাণের কাজ চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রকৃত শিল্পায়নের সূচনা হবে। এবং বাংলাদেশের গর্ব করার মতো একটা জায়গা হবে।

শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প উৎপাদন শুরু হয়েছে, জামালপুরে খুব শিগগিরই শিল্প উৎপাদন শুরু হবে। এ ছাড়া মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ চলছে। সিরাজগঞ্জে ১১০০ একর জমির ওপর বেজার নিজস্ব উদ্যোগের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের কাজ চলছে। জিটুজি পদ্ধতিতে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যেই শিল্প উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া চীনা অর্থনৈতিক জোনের পাশাপাশি ভারতীয় অর্থনৈতিক জোন ও দক্ষিণ কোরিয়াও অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে কুড়িগ্রামে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন এবং বিনিয়োগের ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছেন ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক। তিনি কুড়িগ্রাম পরিদর্শন করেন। নীলফামারীতে একটি ইকোনোমিক জোন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, সেখানেও জায়গা নির্ধারণ করা আছে।
কুষ্টিয়ায় অর্থনৈতিক জোনের সমীক্ষা শেষ করে এখন উন্নয়নের জন্য ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে মোংলায় অর্থনৈতিক জোনের কাজ চলমান রয়েছে। গোপালগঞ্জে একটি অর্থনৈতিক জোন তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া গেছে।
পাশাপাশি ঢাকার নবাবগঞ্জে একটি অর্থনৈতিক জোন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এভাবে সারা বাংলাদেশে যেন পরিকল্পিত শিল্পায়ন হয় সেই লক্ষ্য নিয়ে বেজা কাজ করছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০৪১ সালের মধ্যে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো থেকেই ৪০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য রফতানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এগুলোর সবগুলোর বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হলে সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তার অন্যতম অংশীদার হবে বেজা।সুত্রঃ সময় টিভি




