ঢাকা ব্যুরো: বিচার বিভাগের পুরো মনোযোগ এখন ফৌজদারি মামলার দিকে। তারিখ পড়ছে সপ্তাহের এ-মাথা ও-মাথা। সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তি-তর্ক-শুনানি চলছে রাত-দিন। সামনেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটিকে সামনে রেখে ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তিতে ধুম পড়েছে আদালত পাড়ায়। বাদী, বিবাদী, সাক্ষী, আদালত সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ত্রাহি দশা। সকালে সাক্ষ্য নেয়া শেষতো বিকেলে জেরা।
বিশেষত, যারা রাজনৈতিক মামলার আসামি তাদের হাজির করা হচ্ছে সকাল-দুপুর-বিকেলে রুটিন করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন ধুন্ধমার ছোটাছুটি আদালত পাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি। বিচার সংশ্লিষ্টরা সমস্ত মনোযোগ যেন ঢেলে দিয়েছেন ফৌজদারি মামলার ওপর। ঢাকা কোর্টে প্রতিদিনই থাকছে একাধিক রায়।
বলা বাহুল্য, এসব রায়ে সাজা পাচ্ছেন কেবল সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলের নেতা-কর্মীরা। গত দু’মাসে বিএনপি’র অন্তত ৪৭৮ জন (প্রায় ৫শ’) নেতা-কর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা, বিভাগ, জেলা এমনকি থানা-ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী। সাজা থেকে বাদ পড়ছে না বহু আগে মৃত আসামি, গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তি, প্রবাসী এমনকি শিশু পর্যন্ত।
ফৌজদারি মামলার এই অস্বাভাবিক গতিকে অনেক আইনজীবী ‘সুপারসনিক গতি’ও বলছেন। মামলার এই গতিতে মুগ্ধ অনেক আইনজীবীকে বলতে শোনা যায়, আহা! মামলার এই গতি যদি সব মামলার ক্ষেত্রেই সবসময় থাকতো! তাহলে মামলা জট বহু আগেই ঠাঁই নিতো জাদুঘরে।
সরকারি পরিসংখ্যান মতে, দেশের আদালতগুলোতে বিভিন্ন পর্যায়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪২ লাখ। এর মধ্যে ৩৬ লাখ ৬৩ হাজার ৫টি মামলা বিচারাধীন অধস্তন আদালতে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগে বিচারাধীন ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪৭টি। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ পারিবারিক কোন্দল, হানাহানি, ধর্ষণ, খুন, লুটপাট, চুরি-ডাকাতি, হামলা, ভাঙচুর, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, বোমা হামলা, পুলিশের কাজে বাধা দান, রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, জালিয়াতি, আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার, মানবপাচার, মাদক ব্যবসা, পাচার, ঘুষ, দুর্নীতির মামলা। আইনে যা ফৌজদারি অপরাধজনিত মামলা হিসেবে বিবেচিত।
ফৌজদারি মামলার মধ্যেও শুধুমাত্র ‘নাশকতা’ ‘ভাঙচুর’ ‘হামলা’ ‘পুলিশের কাজে বাধাদান’ মামলার ‘বিচার’ চলছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। যেসব মামলার প্রায় সবগুলোই গত দেড় দশকে দায়ের হয়েছে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। যা ‘রাজনৈতিক মামলা’ হিসেবে পরিচিত।
রাজনৈতিক মামলার মধ্যে এখন সাজা দেয়া হচ্ছে বিশেষত: ২০০৯ সালে নির্বাচন পরবর্তী, ২০১৪ সাল এবং ২০১৮ সালে নির্বাচন-পূর্ববর্তী মামলায়। বিএনপি’র দেয়া হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছর ২৫ জুলাই পর্যন্ত বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭১টি মামলা করা হয়। এসব মামলার আসামি ৪০ লাখের বেশি। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরের ৫০ থানায় ১৭ হাজার ৫৮৩টি মামলা রয়েছে। গত ৪ মাসে দায়ের হয়েছে অন্তত ১ হাজারের বেশি মামলা। এ মামলাগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে সরকারবিরোধী আন্দোলনরত নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের প্রয়োজনে।
২০০৯, ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর ‘বিচার’ চলছে ‘পুরনো মামলা নিষ্পত্তি’র উদ্যোগ স্বরূপ। সরকারের তরফ থেকে এ কথা স্বীকারও করা হয়েছে। চলতি বছর ২০ সেপ্টেম্বর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক স্পষ্টতই বলেছেন, আমি প্রসিকিউশন বিভাগকে পুরনো মামলা আগে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে বলেছি। পুরনো মামলা নিষ্পত্তি করতে যেসব উদ্যোগ নেয়া দরকার তার সবই নেবে সরকার। এখানে আলাদা করে বিএনপি’র নেতাদের মামলা নিষ্পত্তির কোনো নির্দেশনা আমরা দিইনি। তার এ কথায় লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, ‘পুরনো মামলা’ বলতে শুধু ফৌজদারি মামলাকেই বোঝানো হয়েছে।
যুগ যুগ ধরে আদালতে ঝুলে থাকা লাখ লাখ দেওয়ানি মামলা ‘পুরনো মামলা’র সংজ্ঞায় পড়েনি। ফলে জমিজমা সংক্রান্ত মামলাগুলোর বর্তমান হাল-অবস্থা আলোচনায় আসছে না। যদিও দেওয়ানি এবং ফৌজদারি আদালতের গঠন এবং কার্যাবলি আলাদা। একটি পর্যায় পর্যন্ত দু’ধরনের মামলার বিচারকও আলাদা। কিন্তু মামলাগুলো যখন অতিরিক্ত জেলা জজের আদালতে যায় তখন ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার বিচারক হয়ে যান অভিন্ন।
এ পর্যায়ে এদেশের বিচার ব্যবস্থায় একই বিচারক একসঙ্গে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। দুই মামলার জন্য আলাদা বিচারক থাকলেও কখনও কখনও একই এজলাসে পালাক্রমে বিচার কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে তাদের। একই বিচারক একাধিক বিষয়ে বিভিন্ন আদালত পরিচালনা করছেন। যথেষ্ট সময় না পাওয়ায় তার পক্ষে একটি মামলার সমাধানে আসা কঠিন। মামলার শুরু থেকে রায় প্রদান পর্যন্ত বহু বিচারকের পরিবর্তন ঘটে। দেওয়ানি মামলা জটের এটিও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। গত অর্ধ-শতাব্দীতেও এই ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেনি। যে কারণে রাজনৈতিক ফৌজদারি মামলার প্রতি অধিক মনোযোগের ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেওয়ানি মামলায়।




