ঢাকা ব্যুরো: নির্বাচনকে এখন ইলেকশন না বলে সিলেকশন বলা যায়। নির্বাচনের নামে যা চলছে তাকে কোন ভাবেই নির্বাচন বলা যায় না। যেহেতু নির্বাচন কমিশন সিলেকশন করবে না তাই নির্বাচন কমিশনকে আর সিলেকশনও কমিশন বলা যাবে না। সিলেকশন করা হবে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে, ইলেকশন কমিশনের কাজ হবে সিলেকশনকে বৈধতা দেয়া। তাই ইলেকশন কমিশনকে বলা যায় ইলেকশন ভেলিডেশন কমিশন। আজ মঙ্গলবার (০১ আগস্ট) দুপুরে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয় মিলনায়তনে ঢাকা মহানগর উত্তর এর বিশেষ সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের আইনগত ক্ষমতা কমিয়ে দেয়া হয়েছে। দলীয় লোকজন নিয়োগ দিয়ে নির্বাচন কমিশন করায়ত্ব করা হয়েছে। সরকারের নির্দেশ শতভাগ বাস্তবায়ন করবে এমন লোকজন নিয়োগ দেয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনে। ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে ছিলো দেশী ও বিদেশীরা। সরকার ইচ্ছে করলে এই নির্বাচনটা সঠিক করতে পারতো। মানুষের প্রত্যাশা অগ্রাহ্য করে নিজেদের মত করেই নির্বাচনটি করেছে। এ কারনেই ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যেতে চায় না। কারন, তারা জানে যেখানেই ভোট দেবে নির্বাচিত হবে সরকারের পছন্দের প্রার্থী। এজেন্ট ও সমর্থকদের ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে এক প্রার্থীকে আইন শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর সামনে মারধর করা হয়েছে।
জিএম কাদের বলেন, যারা ভোট কেন্দ্র দখল করে সন্ত্রাস করে তাদেরই সহায়তা করে আইন শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। দেশী ও বিদেশীরা দেখেছে এই সরকারের অধীনে কেমন নির্বাচন হয়। ৩০ জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রামের উপনির্বাচনে আমাদের প্রার্থী জানিয়েছেন, ভোট কেন্দ্রে ভোটাররা আসেননি তাই প্রিসাইডিং অফিসাররা বসে বসে ইভিএম-এ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছে। যেখানে ১ ভাগ ভোট হচ্ছে না, সেখানে ১০ থেকে ১১ ভাগ ভোট দেখাতে তারা এটা করেছে। আগামীতে নির্বাচনের নামে এমন সিলেকশনে গেলে লাভ কী ? বর্তমান সরকার তো তাদের অধীনের নির্বাচনের মডেল দেখিয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন ব্যবস্থা সাজিয়েছে যাতে তারাই নির্বাচিত হতে পারে। ইচ্ছে মত নির্বাচন ব্যবস্থা কায়েম রাখেতে সরকার দমন পীড়ন চালু করেছে। দেশে এমন দমন-পীড়ন ও নিমর্মতা কোন সরকার করে নাই।
তিনি বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা একজন নাগরিকের দায়িত্ব। সরকারের ভুল-ত্রæটি ধরিয়ে দেয়া নাগরিকের কর্তব্য তাই সমালোচনা করতে দিতে হবে। জবাবদিহিতাহীন একটি সংস্কৃতি সৃষ্টি করতেই সরকার এমন করছে। ব্যাংক, বিদ্যুত ও মেগা প্রকল্পের নামে লুটপাট হচ্ছে। জনগনের মাথায় দিনে পর দিন ঋণের বোঝা বেড়েই চলছে। অভাবের কারনে একশ্রেনীর মানুষ বাঁচতে পারছে না। তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। আর শাসক শ্রেনীর মানুষেরা বিলাষবহুল জীবন যাপন করছে। মানুষের কষ্ট নিয়ে তারা ঠাট্টা-মসকারা করে বলে, দেশের মানুষ স্বর্গে বাস করছে। ঋণের দায়ে জর্জরিত অর্থনীতি পঙ্গু করে, জোড়াতালি দিয়ে তারা আবারো ক্ষমতায় আসতে চাচ্ছে। মাদকের মাধ্যমে দেশের যুব সমাজ ধংস করা হচ্ছে। মাদক বিক্রির সাথে ক্ষমতাসীনরা জড়িত আছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি ধংস করা হচ্ছে, ইতিহাস বিবৃত করা হচ্ছে। নির্বাচনের নামে সিলেকশনে যাওয়া না যাওয়ার ব্যপারে আমাদের দল যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই হবে। আমি শুধু আমার উপলব্ধি তুলে ধরছি। লোভ লালসায় যারা আক্রান্ত হবে তাদের ভবিষ্যত সুখকর হবে না। দেশের মানুষ অত্যান্ত বিক্ষুব্ধ।
জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের এমপি বলেন, বিশ্ববাসী বর্তমান পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে। বিভ্রান্তিমূলক সংবাদের ব্যাপারে বিশ^বাসী সজাগ আছে। এমন বাস্তবতায় আমরা ঘরে বসে থাকলে দেশ বিপযন্ত হবে। জনগনের কাছে এটি মুক্তির লড়াই। জনগন এই অবস্থা থেকে মুক্তি চায়। যারা জনগণের মুক্তির জন্য লড়াই করবে, জনগন তাদের পক্ষে থাকবে। আমাদের রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করতে হবে। সত্যিকারের নির্বাচনের জন্য যে আন্দোলন তাতে সমর্থন দিতে হলে মাঠেই দিতে হবে। নির্বাচন ব্যবস্থা যে বিপর্যস্ত এ নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। নির্বাচন ব্যবস্থা সঠিক করতে আমাদের কাজ করা উচিত। মানুষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ ভাবে।
তিনি বলেন, মানুষ বিকল্প চায় কিন্তু আমরা বিকল্প হতে পারিনি। কারন, আমাদের রাজনীতি সঠিক ছিলো না। বিএনপি আমাদের অনেক ক্ষতি করতে চেয়েছে, আমরা সেটা রুখতে পেরেছি। কিন্ত আওয়ামী লীগ ঘরের ভিতরে ঢুকে আমাদের দল ভাংতে চেয়েছে। এখনো চেষ্টা করছে, তারা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। একারনেই মানুষ আমাদের গৃহপালিত মনে করে আর আওয়ামী লীগ মনে করে আমাদের কোরবানী করা যায়। জনগণের পক্ষে থাকলেই তাদের সমর্থন আদায় সম্ভব হবে। অনির্বাচিত বা অসাংবিধানিক সরকার কোন বিষয় না, আমরা মানুষের ভোটাধিকার চাই। সুষ্ঠু নির্বাচন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা যুদ্ধ ও সংবিধানের চেতনা। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত হলেই শাসনক গোষ্ঠী জনগনের কাছে জবাবদিহিতা করতে বাধ্য হবে।
জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর উত্তর এর আহবায়ক ও পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টুর সভাপতিত্বে এবং জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর উত্তর এর সদস্য সচিব ও পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম পাঠান এর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সভায় গোলাম মোহাম্মদ কাদের আরো বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে, অনির্বাচিত সরকার বা সংবিধানের বাইরে যারা ভোট চাইবে তাদের প্রতিহত করা হবে। কিন্তু সরকার ছাড়া সকল দলই নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তন চাচ্ছে। কারন, এই নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোটে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে না। অনির্বাচিত ও অসাংবিধানিক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য একটি আন্দোলন এখন চলছে। এর আগে একই দাবিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দুটি আন্দোলন হয়েছিলো ১৯৯১ ও ২০০৬ থেকে ২০০৭ সালে। ১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টি সরকার ক্ষমতায় ছিলো। জাতীয় পার্টি সরকার আইনগত ও সাংবিধানিক ভাবে বৈধ সরকার ছিলো। পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচিত রাষ্ট্র প্রধান ছিলেন। তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বামপন্থীরা এই আন্দোলন করেছিলেন। তারা চেয়েছিলো অনির্বাচিত ও অসাংবিধানিক সরকার। ২০০৬ থেকে ২০০৭ সালে অনির্বাচিত ও অসাংবিধানিক সরকারের অধীনে আরেকটি আন্দোলন হয়েছিলো আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে। ক্ষমতায় থাকতে সেই আন্দোলনের বিরোধীতা করেছিলো শুধু বিএনপি। কারন, বিএনপি পক্ষপাতদুষ্টু তত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেছিলো।
এসময় জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান আরো বলেন, দীঘদিন থেকে দেশের মানুষ বৈষম্য থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে। ব্রিটিশরা ডিভাইড এন্ড রুল করে বৈষম্যের মাধ্যমে এদেশর মানুষকে শোষন করতো। বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতেই ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিলো। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর স্বৈরশাসকরা অঞ্চল ভিত্তি বিভাজন করে এ দেশের মানুষকে জুলুম-নিষ্পেষন করে। এর থেকে মুক্তি পেতে দেশের মানুষ স্বায়াত্ব শাসন চেয়েছিলো এবং মনে করেছিলো মুক্তির জন্য নিজেদের একটি দেশ দরকার।
এসময় জাতীয় পার্টি মহাসচিব মোঃ মুজিবুল হক চুন্নু এমপি বলেছেন, দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনা, দেশের মানুষ ভোটাধিকার চায়। সরকার সমর্থকদের লুটপাট আর দুঃশাসনে দেশের মানুষ অতিষ্ঠ। ঘুষ না দিলে চাকরি মেলে না। এমন দেশ আমরা চাই না। দেশের মানুষ জাতীয় পার্টির শাসনামল ফিরে পেতে চায়। দেশের মানুষ সুশানের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।
জাতীয় পাটির চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর উত্তরের জরুরি সভায় জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আলহাজ্ব শফিকুল ইসলাম সেন্টুর সভাপতিত্বে এবং জাতীয় পার্টির ভাইস-চেয়ারম্যান,ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব মোঃ জাহাঙ্গীর আলম পাঠানের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন – জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের এমপি ও পার্টির মহাসচিব বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ মুজিবুল হক চুন্নু এমপি।
জরুরি সভায় উপস্থিত ছিলেন – প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহিদুর রহমান টেপা,মীর আব্দুস সবুর আসুদ,হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন,এডভোকেট মোঃ রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, নাজমা আক্তার এমপি,চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা শেরিফা কাদের এমপি, মোঃ সেলিম উদ্দিন,আমানত হোসেন আমানত, বীরমুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মমতাজ উদ্দিন,বীরমুক্তিযোদ্ধা তৈয়বুর রহমান, মোঃ মাশরেকুল আজম রবি, ভাইস-চেয়ারম্যান আহসান আদেলুর রহমান এমপি, যুগ্ম মহাসচিব মোঃ সামসুল হক, সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ নাসির উদ্দিন সরকার,মোঃ হেলাল উদ্দিন,দফতর সম্পাদক -২ এম এ রাজ্জাক খান, সমাজ কল্যাণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা,তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার এলাহান উদ্দিন,যুগ্ম দফতর সম্পাদক সমরেশের মন্ডল মানিক । ঢাকা মহানগর উত্তরের বিভিন্ন থানার নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন -আলাউদ্দিন আহমেদ, প্রিন্সিপাল মোস্তফা চৌধুরী, জাহিদ হাসান,মোহাম্মদ আলী, আব্দুস সাত্তার, নজরুল ইসলাম সরদার, মোঃ আলমগীর হোসেন, আবুল বাশার, ইব্রাহিম, রফিকুল আলম সেলিম,এস এম হাসেম, আমিনুল হক , মোকতার হোসেন মাসুম,বজলুর রহমান মৃধা,মেজর (অঃ) আনিসুর রহমান ।




