*সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানির বিপদসীমা অতিক্রম
*কেরানিহাট-বান্দরবান সড়কে পানি উঠায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ
*সাঙ্গু নদীতে লাকড়ি কুড়াতে গিয়ে যুবক নিখোঁজ
সুকান্ত বিকাশ ধর, সাতকানিয়া: সাতকানিয়ায় বিগত পাঁচ দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের ফলে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিভিন্ন এলাকার বাঁধ উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন লোকজন। এদিকে উপজেলার কেরানিহাট- বান্দরবান সড়কের কয়েকটি স্থানে কোমর ও হাঁটু সমান পানি উঠায় বান্দরবানের সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এদিকে, আজ বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) ভোরে সাঙ্গু নদীতে লাকড়ি কুড়াতে গিয়ে আবদুল আলম (৩৬) নামে উপজেলার কালিয়াইশ ইউনিয়ন এলাকার এক যুবক নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার খোঁজ মেলেনি। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় অনেকের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকার পাশাপাশি খোদ উপজেলা প্রশাসনও বেকায়দায় রয়েছেন বলে ইউএনও জানিয়েছেন।
এছাড়া, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা মোকাবেলায় বিভিন্ন প্রস্তুতির পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তাৎক্ষণিক অসুখ সারাতে ইউনিয়ন ভিত্তিক মেডিকেল টিম গঠন করেছেন বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। তবে, পানি বন্দিরা এখনও কোন সরকারি ও বেসরকারি কোন ত্রাণ সহায়তা পায়নি বলে জানিয়েছেন।
নদীর পানিতে তলিয়ে যাওয়া যুবকের বিষয়ে কালিয়াইশ (ইউপি) ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফেজ আহমেদ দি ক্রাইমকে বলেন, আবদুল আলম পেশায় একজন রিক্সা চালক। সে এলাকার কিছু লোকজন সাথে নিয়ে নৌকায় করে সাঙ্গু নদী থেকে লাকড়ি কুড়াতে গিয়ে পানিতে তলিয়ে নিখোঁজ হন। এখনো তার খোঁজ মেলেনি। তিনি এ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মাইঙ্গাপাড়া এলাকার ভেট্টা মিয়ার ছেলে। তার দুই ছেলে সন্তান রয়েছে।
জানা যায়, বিগত পাঁচ দিনের টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। রোববার গভীর রাত থেকে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি সাঙ্গু নদীর বাজালিয়া ইউনিয়নের চৌধুরী পাড়া পয়েন্ট দিয়ে পাড় উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করে। যা এখনো পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। এতে বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক, বাড়ি-ঘর, কৃষিজমি ও মৎস্য খামার তলিয়ে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে বাজালিয়া ইউনিয়নের চৌধুরী পাড়া পয়েন্ট দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ বেড়েছে।
এতে বড়দুয়ারা, মাহালিয়া, কাটাখালীকুল, নতুন পাড়া ও বটতল হিন্দু পাড়ার অধিকাংশ ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। আবার অনেক এলাকায় বসতঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, বাজার ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে সেখানকার পানিবন্দি পরিবারগুলোর রান্নাবান্না, বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিন পরিদর্শন ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুধবার(০৮ জুলাই) রাতে সাতকানিয়া পৌরসভার রামপুর বায়তুশ শরফ এলাকায় ডলু নদীর পাড় ভেঙে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করা শুরু করলে উপজেলার পশ্চিম এলাকার একাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে হাসমতের দোকান এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উপর দিয়ে সীমিত পরিসরে পানি প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া সাতকানিয়া এলাকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিষদ, থানা, সার্কেল অফিস, ভূমি অফিস এবং পৌরসভা কার্যালয়ের মাঠ ও চলাচলের রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া পৌরসভার প্রায় ওয়ার্ডের লোকজন পানি বন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
অপরদিকে উপজেলার চরতি, নলুয়া, কাঞ্চনা, ঢেমশা, সোনাকানিয়া, সাতকানিয়া সদর, পশ্চিম ঢেমশা , ছদাহা, বাজালিয়া, কেঁওচিয়া , পুরানগড়, আমিলাইষ, খাগরিয়া ইউনিয়নগুলোতে বন্যার পানি প্রবেশ করে। পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে উপজেলা প্রশাসনসহ একাধিক ব্যক্তি এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
পুরানগড় ইউনিয়নের সবজি চাষি আবদুল সওদাগর বলেন, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সবজি ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমার ৬০ শতক জমির বরবটি ও করলা ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আমার মতো আরও অনেকের একই অবস্থা। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠজুড়ে পানি আর পানি।
বাজালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম বড়দুয়ারা গ্রামের বাসিন্দা মো. সাইফুদ্দিন দি ক্রাইমকে বলেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে এ এলাকার অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আমাদের বাড়িতেও পানি ঢুকে পড়েছে। বর্তমানে আমরা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় অবস্থায় নিয়েছি। এ ছাড়াও আমাদের চলাচলের একমাত্র সড়কটিতে কোমড় সমান পানি হওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
মৎস্য চাষি শহিদুল ইসলাম দি ক্রাইমকে বলেন, গত রাতে একটি পুকুরের চারপাশে জাল দিয়ে ঘেরা করার পরও ডুবে গেছে। ফলে ওই পুকুরে থাকা কয়েক লাখ টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে। এ ছাড়াও হরিণতোয়া সড়কের প্রবেশ মুখের পুকুরটিতে পানি ঢুকতে শুরু করছে। তারপরও চারপাশে জাল দিয়ে মাছ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
ঢেমশা ইউনিয়ন (ইউপি) পরিষদ এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু তাহের দি ক্রাইমকে বলেন, এ ইউনিয়নের প্রায় ওয়ার্ডের লোকজন পানি বন্দি অবস্থায় রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় কারো সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখনও পর্যন্ত কোন ত্রাণ সহায়তা সরকারের পক্ষ থেকে পায়নি। বলতে চরম কষ্টের মধ্যে এলাকার লোকজন দিন-যাপন করছেন।
নলুয়া ইউনিয়ন (ইউপি) পরিষদের সচিব মো.সেলিম দি ক্রাইমকে বলেন, এ ইউনিয়নে পাঁচ হাজারের অধিক লোক পানি বন্দি অবস্থায় রয়েছে। এখনো কোন সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় তাদের ত্রাণ দিতে পারিনি।
পশ্চিম ঢেমশা ইউনিয়ন (ইউপি) পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সরওয়ার কামাল দি ক্রাইমকে বলেন, এ ইউনিয়নে প্রায় পরিবার পানি বন্দি। খাবার সংকট, বিদ্যুৎ নাই, বিশুদ্ধ পানির অভাব সব মিলিয়ে লোকজন খুবই কষ্টে রয়েছে।
পানি বিজ্ঞান উপ বিভাগ চট্টগ্রামের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী ইমরান হাসান দি ক্রাইমকে বলেন, প্রতিমুহূর্তে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. অমিত দে দি ক্রাইমকে বলেন, বন্যা পরিস্থিতিতে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ইউনিয়নভিত্তিক মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। খরব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলমগীর দি ক্রাইমকে বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ঢেমশা ইউনিয়নের শুকনো খাবার বিতরণ করা শুরু করেছি। এরপর পর্যায়ক্রমে সোনাকানিয়া, বাজালিয়া, ছদাহা ও আমিলাইষ ইউনিয়নে বিতরণ করা হবে। এ ছাড়াও উপজেলার জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী এসে পৌঁছালে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বন্টন করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান দি ক্রাইমকে বলেন, উপজেলা পরিষদের কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। পানি বন্দি পরিবারের মাঝে আপাতত ১৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগামীকাল (শুক্রবার) ত্রাণ পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। তবে উপজেলার অধিকাংশ এলাকা ও সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এ কাজে বেগ পেতে হচ্ছে। তারপরও যত দ্রুত সম্ভব সহায়তা পৌঁছাতে আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় দ্রুত যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। মোট জনসংখ্যার ৭০% লোক অর্থাৎ পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ এখনো পানি বন্দি অবস্থায় দুর্ভোগে রয়েছেন।




