নিজস্ব প্রতিবেদক: সম্প্রতি সরকার বেনাপোলের পাশাপাশি ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা কাষ্টমস স্টেশনের মাধ্যমে সুতা আমদানির ক্ষেত্রে পার্শিয়াল শিপমেন্টের (আংশিক চালান) জটিলতা নিরসন করে আদেশ জারি করেছে। এতে করে শতভাগ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখিত স্থলবন্দরগুলো দিয়ে পার্শিয়াল শিপমেন্টে (আংশিক চালান) ভারত থেকে সুতা আমদানি করতে পারবে। ফলে দ্রুততার সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্পাদন করা যাবে। গতকাল রবিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুুরে চট্টগ্রাম বিজিএমইএ’র মাহাবুব আলী হলে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিজিএমই এর সভাপতি ফারুক হাসান।

তিনি বলেন, বিজিএমইএ সকল স্থল বন্দরের মাধ্যমে সুতা আমদানি ও আংশিক চালানের জটিলতা নিরসনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়ে আসছিলো। সরকারের এই পদক্ষেপ গ্রহন শিল্পকে আরও গতিশীল করবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্যের অবাধ বিচরণে কোন প্রতিবন্ধকতা কাম্য নয়।পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে বাংলাদেশ আজ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ডেনিমের ক্ষেত্রে চীনকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এখন প্রথম অবস্থানে। সরকারের নীতিগত সহযোগিতায় ইউরোপের বাজারে আমরা অতি শ্রীঘ্রই এক নম্বর অবস্থান নিতে সমর্থ হবো। আজ আমাদের পোশাক কারখানাগুলো কেবল নিরাপদই নয়, বরং আরও গতিশীল, আধুনিক, জ্বালানি-সাশ্রয়ী এবং পরিবেশ বান্ধব হয়ে উঠেছে। ইউএসজিবিসি কর্তৃক প্রত্যয়িত সর্বাধিক সংখ্যক সবুজ কারখানার আবাসস্থল, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ এবং সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব পোশাক প্রস্তুতকারক দেশ হিসাবে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। আমাদের এখন ১৮৩টি লিড গ্রিন কারখানা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ৬০টি প্লাটিনাম রেটেড এবং ১০৯টি গোল্ড রেটেড।

বিজিএমই এর সভাপতি ফারুক হাসান বলেন,২০২২ সালে আমাদের ৩০টি কারখানা গ্রিন হয়েছে। কোন একক বছরে এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যক গ্রিন কারখানার সংখ্যা। তবে আমরা এখানেই থেমে যেতে চাই না। বিজিএমইএ প্রতিনিয়ত কাজ করছে পোশাকখাতে গ্রিন কারখানার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য।পোশাক শিল্পে সবুজ শিল্প গড়ে তুলতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করার জন্য স্বীকৃতিস্বরুপ বিজিএমইএ ২০২১ টঝএইঈ খবধফবৎংযরঢ় অধিৎফ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছে। কোভিড মহামারির কারনে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এক প্রচন্ড বাস্তবতার সম্মুক্ষীন হয়। কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি, কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রনোদনা প্যাকেজটি শিল্পকে সেই কঠিন সময়ে টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। তবে কোভিড মহামারি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্যেই পোশাক শিল্প আবারও নতুন করে চ্যালেঞ্জের সম্মুক্ষীন হয়েছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে।। যার প্রভাব পড়েছে আমাদের পোশাক শিল্পে। আইএমএফ এর পূর্বাভাষ অনুযায়ী বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২২ সালে ৩.২% থেকে ২০২৩ সালে ২.৭% এ হ্রাস পাবে। পাশাপাশি, বিশ্ব বানিজ্যের প্রবৃদ্ধি ২০২২ সালে ৪.৩% থেকে হ্রাস পেয়ে ২০২৩ সালে ২.৫% এ দাঁড়াবে। ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানি সহ প্রধান বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধি যে হ্রাস পাচ্ছে, তা দৃশ্যমান।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ সারা বিশ্বেই দেখা দিয়েছে মূল্যস্ফীতি। উন্নত দেশগুলোও কৃচ্ছ্রসাধন করছে। সেসব দেশের মানুষও কমিয়ে দিয়েছে কেনাকাটা। তাই, পোশাকের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। আমরা দেখছি যে আমদানিকরা একসঙ্গে বড় অর্ডার না দিয়ে ছোট স্লটে অর্ডার দিচ্ছে। তারা সহসা অর্ডার বাতিল করছেন, আবার অনেক μেতা ডেফার্ড পেমেন্ট এর দিকে ঝুঁকেছেন। আমাদের জানামতে, এ মুহুর্তে পূর্ন সক্ষমতা ব্যবহার করে কারখানা চালানোর মতো কোন অর্ডার কোন কারখানারই কাছে নেই।যদিও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২২ সালে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ৪৫.৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানির নতুন রেকর্ড গড়েছে এবং ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২৭.৬৪% বৃদ্ধি পেয়েছে এর পেছনের কারন হলো কাঁচামালের বাড়তি দামের কারনে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া এবং অপেক্ষাকৃত উচ্চ মূল্যের পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি।

বিজিএমই এর সভাপতি ফারুক হাসান লিখিত বক্তব্যে বলেন, গত দেড় বছরে সুতার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৬২%, কন্টেইনার ভাড়া বেড়েছে ৩৫০%-৪৫০%, ডাইস ও ক্যামিকেলের খরচ বৃদ্ধি ৬০%, গত বছরের শুরুতে মজুরি বৃদ্ধি ৭.৫%, গত ৫ বছরে পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০%-৪৫% বেড়েছে। কোভিডের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা পরিচালনায় খরচ আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তিন বছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ভবিষ্যতে কন্টেইনার ও ফ্রেইট খরচ বাড়ানো ছাড়াও নন কটন পণ্য উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল প্রেট্রোকেমিক্যাল চিপস এর দাম আরও বাড়িয়ে দিবে। অন্যদিকে, বিশ্ব জুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের কারনে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের অপ্রতুলতার কারনে কারখানাগুলোতে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালানো হচ্ছে। এতে করে শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা ক্রমবর্ধমানভাবে কমছে। এছাড়া সম্প্রতি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ২০২৩ সালে প্রতি ঘনমিটারে গ্যাসের মূল্য ২০২২ সালের তুলনায় ১৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, অতি সম্প্রতি সরকার আবাসিক, সার ও চা উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাস ছাড়া অন্যখাতে গ্যাসের দাম ১৪ থেকে ১৭৯% পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যা কার্যকর হবে ০১ ফেব্রুয়ারি থেকে। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টের গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বেড়ে ৩০ টাকা (৮৮% বৃদ্ধি) হবে। বৃহৎ শিল্পের ক্ষেত্রে এই দাম ১১ টাকা ৯৮ পয়সা থেকে বেড়ে ৩০ টাকা হচ্ছে (১৫০% বৃদ্ধি)। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিল্পের ব্যয় বৃদ্ধির এই ভার বহনের সক্ষমতা নেই।

সরকারের প্রতি আমাদের একান্ত অনুরোধ, খাত ভিত্তিক গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতিতে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের অবদানের কথা বিবেচনা করে এ’খাতকে আরো গুরুত্ব দেয়া। এছাড়া গ্যাস আমদানীর ক্ষেত্রে আমদানীর উপর ভ্যাট ও টেক্স প্রত্যাহার করার জন্য আমি বিশেষ ভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনারা গ্যাস সঞ্চালনে সিস্টেম লস কমিয়ে আনুন, অবৈধ সংযোগগুলো বন্ধ করে দিয়ে গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করুন। শিল্পের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুতের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করুন। সেই সাথে শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করুন। এর পাশাপাশি খঘএ আমদানিতে দীর্ঘ মেয়াদী কন্ট্রাক্টের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় শিল্পের সকল স্টেকহোল্ডার – উদ্যোক্তা, সরকার, ব্র্যান্ড/μেতা, নীতি নির্ধারক, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা সবার ঐক্যবদ্ধ সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।

যেহেতু চলমান বৈশ্বিক সংকটে বিশ্ব পোশাক বাজারের আকার ছোট হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব বাজারে শেয়ার বাড়িয়ে আমাদের অবস্থান সুসংহত রাখাই আমাদের মূল অভিপ্রায়। উল্লেখ্য যে সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সে মন্দাভাবের কারনে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় সর্ববৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পোশাক শিল্পের অগ্রযাত্রা মসৃন রাখা জরুরি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পোশাক কারখানাগুলো উৎপাদন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই সংকটময় মুহুর্তে শিল্পে উৎসে কর কমানো হলে তা শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ন সহায়তা হবে।
আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের কাছে আমাদের একান্ত অনুরোধ, তৈরি পোশাক শিল্পে উৎসে কর যা এ বছরে ১% করা হয়েছে, তা পূর্ববতী বছরের ন্যায় একই পর্যাযে বহাল রাখা হোক। এটি করা হলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়বে, কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে এবং সর্বোপরি রপ্তানি বাড়বে, যা বৈদেশিক রিজার্ভে অবদান রাখবে। আর পোশাক শিল্প শক্তিশালী অবস্থানে গেলে অর্থনীতির অন্যান্য খাতগুলোও উপকৃত হবে।

উদীয়মান পরিস্থিতি শিল্পের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ দুটিই সৃষ্টি করেছে। আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সুযোগগুলো গ্রহন করতে চাই।নন-কটন বা ম্যান-মেইড ফাইবার ভিত্তিক পোশাক রপ্তানিতে প্রণোদনা টেকসই হওয়ার কারনে বিশ্ববাজারে এখন নন-কটন পোশাক পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। টেক্সটাইল খাতের মধ্যে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত হচ্ছে ম্যান-মেইড ফাইবার-ভিত্তিক ইয়ার্ন ও ফ্যাব্রিক্স, যেমন পলিয়েস্টার, ভিনকস, স্প্যানডেক্স, মেলাঞ্জ। আপনাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে বিশ্ব বাজারে কটন বস্ত্রের শেয়ার এবং পোশাকের ব্যবহার মাত্র ২৬%, সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত তৈরি পোশাকের ৭৫% কটন পণ্যগুলোতে আবদ্ধ।

যদিও ভ্যালু চেইনে এগিয়ে থাকার জন্য বিজিএমইএ তার সদস্যদেরকে প্রতিনিয়ত সাধারন পোশাকের পাশাপাশি উচ্চ মূল্যের বা ব্যতিক্রমী পোশাক তৈরিতে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিচ্ছে, তারপরও যারা এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহন করবে, তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রণোদনা থাকা জরুরি। নন-কটন বা ম্যান-মেইড ফাইবার ভিত্তিক পোশাক রপ্তানিতে প্রণোদনা দেয়ার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

নন-কটন বস্ত্র ও পোশাকখাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য একটি বিশেষ স্কীম গ্রহন করা হোক। এর মাধ্যমে ২০২৯ পরবর্তী সময়ে ডাবল ট্রান্সফরমেশন রুলস প্রতিপালন করে জিএসপি প্লাস এর জন্য আমরা প্রস্তুত হতে পারবো। শুল্ক ও কাষ্টমস সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলোর সহজীকরণ পোশাক রপ্তানিকারকদের বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকা এবং পরিবর্তিত বিশ্ব বানিজ্যের প্রেক্ষাপটে পোশাক শিল্পের জন্য যে সুযোগগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো গ্রহনের জন্য ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াগুলো, বিশেষ করে শুল্ক ও কাষ্টমস সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো সহজীকরণ করা জরুরি।

বন্ড লাইসেন্সে এইচএস কোডের সাথে নতুন কাঁচামাল ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট উপকরণগুলো অন্তর্ভূক্তকরণের মতো প্রক্রিয়াগুলো সহজীকরণও প্রয়োজন। আমরা মনে করি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও ব্যবসার সক্ষমতা বিকাশের জন্য একটির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে বাজারের চাহিদা ও সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নীতি ও পদ্ধতি উভয়ই সংশোধন ও হালনাগাদ (আপডেট) করা জরুরি।

ইজ অব ডুয়িং বিজন্যাস

ব্যবসা পরিচালনা সহজীকরনে (ইজ অব ডুয়িং বিজন্যাস) আমরা এখনও পিছিয়ে আছি। সে জায়গায় উন্নতি করা দরকার। বিশেষ করে ম্যান-মেইড ফাইবারভিত্তিক টেক্সটাইল খাতে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষন করার লক্ষ্যে ব্যবসা সহজীকরণের উদ্যোগ গ্রহন করা জরুরি। লজিষ্টিক সেবা প্রদানে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। আমরা মনে করি, ব্যবসা-বানিজ্যে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিতকরণে আমাদের একটি নিজস্ব মানদন্ড থাকা বাঞ্চনীয়। সেইসঙ্গে তা প্রতিনিয়ত নজরদারির আওতায় রাখতে হবে।

সরকারের নীতি সহায়তার সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক শিল্পখাত থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিজিএমইএ। গত অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩৫%। চীন থেকে গত কয়েক বছরে অনেক ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে এসেছে। আগামী ৮ বছরে এর পরিমান আরও বাড়বে। চীন যেহেতু পরিবেশগত কারণে টেক্সটাইল থেকে সরে আসছে, ফলে সঙ্গত কারণেই সেগুলো বাংলাদেশে আসবে বলে আমরা ধারনা করছি। আমরা এই সুযোগগুলো গ্রহন করতে চাই।

বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) এর ২০২১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের শেয়ার মাত্র ৬.৪০%। এ বাজারেও নিজের শেয়ার আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে বাংলাদেশের। এ সুযোগ গ্রহনের জন্য ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি টেকসই করার লক্ষ্যে পোশাকখাতে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, বিশেষ করে নন-কটন এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণের উপর আমরা জোর দিয়েছি। উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের সব দেশেই পোশাক রপ্তানি করার পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি।

বিজিএমইএ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়াতে লিড টাইম হ্রাস করা, সর্বশেষ প্রযুক্তি গ্রহন করা, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করা এবং কারখানাগুলোকে আরও টেকসই করার জন্য কারখানাগুলোর জন্য “সেন্টার অব ইনোভেশন, এফিশিয়েন্স অ্যান্ড ওএসএইচ” প্রতিষ্ঠা করেছে, যা গত নভেম্বরে বিজিএমইএ এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত “মেইড ইন বাংলাদেশ উইক” চলাকালে মাননীয় বানিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, এমপি উদ্বোধন করেছেন।

বিজিএমইএ পোশাক শিল্প রূপকল্প ঘোষনা

টেকসই পোশাক শিল্প গড়তে বিজিএমইএ পোশাক শিল্প রূপকল্প ঘোষনা করেছে। এই রূপকল্পের ২০টি লক্ষ্য হলো – কার্বন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানো, টেকসই কাঁচামাল ব্যবহার ৫০ শতাংশে উন্নীতকরণ, শোভন কাজের পরিবেশ শতভাগ নিশ্চিত করা, পানির অপচয় ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা, ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার শতভাগে নামিয়ে আনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ২০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া, গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবহার ৩০ শতাংশ হ্রাস, নারী-পুরুষের সমতা শতভাগ নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান ৬০ লাখে উন্নীত করা, উৎপাদনশীলতা ৬০% উন্নীত করা, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি প্রভৃতি। তবে এই রূপকল্প বাস্তবায়নে অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে মানসম্পন্ন অবকাঠামো সরাসরি যুক্ত।

অবকাঠামো উন্নয়নে অনেক পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পদ্মা সেতু নির্মান হয়েছে, ঢাকা মেট্রোরেল উদ্বোধন করা হয়েছে, কর্ণফুলী টানেলের নির্মান কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে, শাহজালাল বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মান ও ঢাকা-এলিভেটেড এক্সপ্রেসের কাজ জোরেসোরে চলছে। আরও অনেক মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

বে-টার্মিনাল নির্মাণ

আমদানি- রপ্তানি কার্যμমে μমবর্ধমান প্রবৃদ্ধিকে সামনে রেখে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে কন্টেইনার ইয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, কী-গ্যান্ট্রি μেন সহ প্রয়োজনীয় হ্যান্ডলিং ইক্যুপমেন্ট সংযোজন, ৪,৫০০ টিউজ কন্টেইনার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন পতেঙ্গা কন্টেইনার কার্যμম পরীক্ষা মূলক ভাবে শুরু, বন্দর জেটিতে ১০ মিটার ড্রাফটের বড় জাহাজ বার্থিংকরণ সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও সরকার চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবসা-বাণিজ্যের জবমরড়হধষ ঐঁন হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা অংশ হিসেবে বে-টার্মিনাল নির্মানের পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। পতেঙ্গা উপকূলে প্রস্তাবিত বে-টার্মিনালে ২৪ঘন্টা জাহাজ চলাচল সম্ভব হবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুসারে, ১২ মিটার পর্যন্ত ডেফথ এর জাহাজ বার্থ নিতে পারবে। বে-টার্মিনাল এর চুড়ান্ত কাজ সম্পাদন হলে প্রায় ১৫টি জাহাজ এক সাথে বার্থ নিতে পারবে। এতে আমদানি-রপ্তানিতে সময় এবং খরচ অনেকাংশে হ্রাস পাবে এবং রপ্তানি বাণিজ্যের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

মাতারবাড়ী গভীর সমূদ্র বন্দর

প্রধানমন্ত্রীর ফাস্টট্র্যাক প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় মাতারবাড়ী গভীর সমূদ্র বন্দরের কার্যμমের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। নির্মাণ সম্পন্ন হলে ৭৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি জেটি চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতার সাথে যুক্ত হবে। মাতারবাড়ি বন্দরে প্রায় ১০ হাজার কনটেইনার নিয়ে ১৬ মিটার গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারবে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে মাদার ভেসেল সমূহ (বড় জাহাজ) সমুদ্রে গভীরতা না থাকার কারণে বাংলাদেশে আসতে পারে না। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর চালু হলে উক্ত বন্দরের মাধ্যমে বড় বড় জাহাজের মাধ্যমে সরাসরি আমদানি-রপ্তানি কার্যμম পরিচালনা করা যাবে। এ’ক্ষেত্রে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর সমূহের ব্যবহার অনেকাংশে কমবে। এতে করে পোশাক শিল্পে লিড টাইম কমবে, খরচ সাশ্রয় হবে।

গার্মেন্ট পার্ক

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘গার্মেন্ট পার্ক’ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জমির জন্য বিজিএমইএ কয়েক কিস্তিতে টাকা দিয়েছে। যতদ্রুত সম্ভব বিজিএমইএ’কে অনতি বিলম্বে জায়গা বুঝিয়ে দেয়ার জন্য সরকারের সদয় দৃষ্টি আকর্ষন করেন।

বন্দরনগরী চট্রগ্রামে বিপুল সংখ্যক পোশাক কারখানা রয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিশাল অবদান রাখছে। “চট্রগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (সিবিইউএফটি)” নামে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করার অনুমোদন দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি গত ২১ জানুয়ারি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি কর্তৃক উদ্বোধন করা হয়েছে এবং আগামী মার্চ’২০২৩ ইং তারিখ থেকে পূর্ণাঙ্গ কার্যμম শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।  এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের জন্য চট্রগ্রামে এক খন্ড জমি প্রতীকি মূল্যে বিজিএমইএ’র অনুকূলে বরাদ্দ প্রদান করা হোক। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি পুরোপুরি চালু হলে ঐ অঞ্চলের মানব সম্পদের দক্ষতার উন্নয়ন হবে।

শিল্পখাত

বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাত আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে চলেছে, যার গুরুত্ব প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে উল্লেখ রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে একটি স্বনির্ভর ও উন্নত অর্থনীতির দেশ হওয়ার যে রূপকল্প নিয়ে আমরা কাজ করছি, তা অর্জনের জন্য রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতি নানাভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাষ অনুযায়ী, আগামী এক-দুই দশকে এক ট্রিলিয়ন তথা এক লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পরিনত হতে পারে এই দেশ। গত ছয় বছরে দেশের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৪%। সেটি যদি ৫ শতাংশেও নামে, তাতেও ২০৪০ সালের মধ্যেই এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মাইলফলক স্পর্শ করবে বাংলাদেশ। আর প্রবৃদ্ধি ১০% হলে ২০৩০ সালেই সেখানো পৌঁছানো সম্ভব। তাই, আমাদের অর্থনীতির সকল সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।

পোশাকখাত

পোশাকখাত আমাদের গর্ব। কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা আজ এ খাতটির উপর নির্ভরশীল। আগামীদিনে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে ভিশন তৈরি করেছে, তা বাস্তবায়নে পোশাকখাতের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এখাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন আর অগ্রগতির গল্পগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারলে সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো কঠিন হয়ে যাবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক: সম্প্রতি সরকার বেনাপোলের পাশাপাশি ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা কাষ্টমস স্টেশনের মাধ্যমে সুতা আমদানির ক্ষেত্রে পার্শিয়াল শিপমেন্টের (আংশিক চালান) জটিলতা নিরসন করে আদেশ জারি করেছে। এতে করে শতভাগ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখিত স্থলবন্দরগুলো দিয়ে পার্শিয়াল শিপমেন্টে (আংশিক চালান) ভারত থেকে সুতা আমদানি করতে পারবে। ফলে দ্রুততার সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্পাদন করা যাবে। গতকাল রবিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুুরে চট্টগ্রাম বিজিএমইএ’র মাহাবুব আলী হলে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিজিএমই এর সভাপতি ফারুক হাসান।

তিনি বলেন, বিজিএমইএ সকল স্থল বন্দরের মাধ্যমে সুতা আমদানি ও আংশিক চালানের জটিলতা নিরসনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়ে আসছিলো। সরকারের এই পদক্ষেপ গ্রহন শিল্পকে আরও গতিশীল করবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্যের অবাধ বিচরণে কোন প্রতিবন্ধকতা কাম্য নয়।পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে বাংলাদেশ আজ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ডেনিমের ক্ষেত্রে চীনকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এখন প্রথম অবস্থানে। সরকারের নীতিগত সহযোগিতায় ইউরোপের বাজারে আমরা অতি শ্রীঘ্রই এক নম্বর অবস্থান নিতে সমর্থ হবো। আজ আমাদের পোশাক কারখানাগুলো কেবল নিরাপদই নয়, বরং আরও গতিশীল, আধুনিক, জ্বালানি-সাশ্রয়ী এবং পরিবেশ বান্ধব হয়ে উঠেছে। ইউএসজিবিসি কর্তৃক প্রত্যয়িত সর্বাধিক সংখ্যক সবুজ কারখানার আবাসস্থল, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ এবং সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব পোশাক প্রস্তুতকারক দেশ হিসাবে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। আমাদের এখন ১৮৩টি লিড গ্রিন কারখানা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ৬০টি প্লাটিনাম রেটেড এবং ১০৯টি গোল্ড রেটেড।

বিজিএমই এর সভাপতি ফারুক হাসান বলেন,২০২২ সালে আমাদের ৩০টি কারখানা গ্রিন হয়েছে। কোন একক বছরে এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যক গ্রিন কারখানার সংখ্যা। তবে আমরা এখানেই থেমে যেতে চাই না। বিজিএমইএ প্রতিনিয়ত কাজ করছে পোশাকখাতে গ্রিন কারখানার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য।পোশাক শিল্পে সবুজ শিল্প গড়ে তুলতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করার জন্য স্বীকৃতিস্বরুপ বিজিএমইএ ২০২১ টঝএইঈ খবধফবৎংযরঢ় অধিৎফ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছে। কোভিড মহামারির কারনে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এক প্রচন্ড বাস্তবতার সম্মুক্ষীন হয়। কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি, কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রনোদনা প্যাকেজটি শিল্পকে সেই কঠিন সময়ে টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। তবে কোভিড মহামারি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্যেই পোশাক শিল্প আবারও নতুন করে চ্যালেঞ্জের সম্মুক্ষীন হয়েছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে।। যার প্রভাব পড়েছে আমাদের পোশাক শিল্পে। আইএমএফ এর পূর্বাভাষ অনুযায়ী বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২২ সালে ৩.২% থেকে ২০২৩ সালে ২.৭% এ হ্রাস পাবে। পাশাপাশি, বিশ্ব বানিজ্যের প্রবৃদ্ধি ২০২২ সালে ৪.৩% থেকে হ্রাস পেয়ে ২০২৩ সালে ২.৫% এ দাঁড়াবে। ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানি সহ প্রধান বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধি যে হ্রাস পাচ্ছে, তা দৃশ্যমান।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ সারা বিশ্বেই দেখা দিয়েছে মূল্যস্ফীতি। উন্নত দেশগুলোও কৃচ্ছ্রসাধন করছে। সেসব দেশের মানুষও কমিয়ে দিয়েছে কেনাকাটা। তাই, পোশাকের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। আমরা দেখছি যে আমদানিকরা একসঙ্গে বড় অর্ডার না দিয়ে ছোট স্লটে অর্ডার দিচ্ছে। তারা সহসা অর্ডার বাতিল করছেন, আবার অনেক μেতা ডেফার্ড পেমেন্ট এর দিকে ঝুঁকেছেন। আমাদের জানামতে, এ মুহুর্তে পূর্ন সক্ষমতা ব্যবহার করে কারখানা চালানোর মতো কোন অর্ডার কোন কারখানারই কাছে নেই।যদিও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২২ সালে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ৪৫.৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানির নতুন রেকর্ড গড়েছে এবং ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২৭.৬৪% বৃদ্ধি পেয়েছে এর পেছনের কারন হলো কাঁচামালের বাড়তি দামের কারনে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া এবং অপেক্ষাকৃত উচ্চ মূল্যের পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি।

বিজিএমই এর সভাপতি ফারুক হাসান লিখিত বক্তব্যে বলেন, গত দেড় বছরে সুতার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৬২%, কন্টেইনার ভাড়া বেড়েছে ৩৫০%-৪৫০%, ডাইস ও ক্যামিকেলের খরচ বৃদ্ধি ৬০%, গত বছরের শুরুতে মজুরি বৃদ্ধি ৭.৫%, গত ৫ বছরে পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০%-৪৫% বেড়েছে। কোভিডের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা পরিচালনায় খরচ আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তিন বছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ভবিষ্যতে কন্টেইনার ও ফ্রেইট খরচ বাড়ানো ছাড়াও নন কটন পণ্য উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল প্রেট্রোকেমিক্যাল চিপস এর দাম আরও বাড়িয়ে দিবে। অন্যদিকে, বিশ্ব জুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের কারনে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের অপ্রতুলতার কারনে কারখানাগুলোতে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালানো হচ্ছে। এতে করে শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা ক্রমবর্ধমানভাবে কমছে। এছাড়া সম্প্রতি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ২০২৩ সালে প্রতি ঘনমিটারে গ্যাসের মূল্য ২০২২ সালের তুলনায় ১৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, অতি সম্প্রতি সরকার আবাসিক, সার ও চা উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাস ছাড়া অন্যখাতে গ্যাসের দাম ১৪ থেকে ১৭৯% পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যা কার্যকর হবে ০১ ফেব্রুয়ারি থেকে। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টের গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বেড়ে ৩০ টাকা (৮৮% বৃদ্ধি) হবে। বৃহৎ শিল্পের ক্ষেত্রে এই দাম ১১ টাকা ৯৮ পয়সা থেকে বেড়ে ৩০ টাকা হচ্ছে (১৫০% বৃদ্ধি)। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিল্পের ব্যয় বৃদ্ধির এই ভার বহনের সক্ষমতা নেই।

সরকারের প্রতি আমাদের একান্ত অনুরোধ, খাত ভিত্তিক গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতিতে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের অবদানের কথা বিবেচনা করে এ’খাতকে আরো গুরুত্ব দেয়া। এছাড়া গ্যাস আমদানীর ক্ষেত্রে আমদানীর উপর ভ্যাট ও টেক্স প্রত্যাহার করার জন্য আমি বিশেষ ভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনারা গ্যাস সঞ্চালনে সিস্টেম লস কমিয়ে আনুন, অবৈধ সংযোগগুলো বন্ধ করে দিয়ে গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করুন। শিল্পের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুতের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করুন। সেই সাথে শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করুন। এর পাশাপাশি খঘএ আমদানিতে দীর্ঘ মেয়াদী কন্ট্রাক্টের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় শিল্পের সকল স্টেকহোল্ডার – উদ্যোক্তা, সরকার, ব্র্যান্ড/μেতা, নীতি নির্ধারক, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা সবার ঐক্যবদ্ধ সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।

যেহেতু চলমান বৈশ্বিক সংকটে বিশ্ব পোশাক বাজারের আকার ছোট হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব বাজারে শেয়ার বাড়িয়ে আমাদের অবস্থান সুসংহত রাখাই আমাদের মূল অভিপ্রায়। উল্লেখ্য যে সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সে মন্দাভাবের কারনে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় সর্ববৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পোশাক শিল্পের অগ্রযাত্রা মসৃন রাখা জরুরি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পোশাক কারখানাগুলো উৎপাদন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই সংকটময় মুহুর্তে শিল্পে উৎসে কর কমানো হলে তা শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ন সহায়তা হবে।
আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের কাছে আমাদের একান্ত অনুরোধ, তৈরি পোশাক শিল্পে উৎসে কর যা এ বছরে ১% করা হয়েছে, তা পূর্ববতী বছরের ন্যায় একই পর্যাযে বহাল রাখা হোক। এটি করা হলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়বে, কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে এবং সর্বোপরি রপ্তানি বাড়বে, যা বৈদেশিক রিজার্ভে অবদান রাখবে। আর পোশাক শিল্প শক্তিশালী অবস্থানে গেলে অর্থনীতির অন্যান্য খাতগুলোও উপকৃত হবে।

উদীয়মান পরিস্থিতি শিল্পের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ দুটিই সৃষ্টি করেছে। আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সুযোগগুলো গ্রহন করতে চাই।নন-কটন বা ম্যান-মেইড ফাইবার ভিত্তিক পোশাক রপ্তানিতে প্রণোদনা টেকসই হওয়ার কারনে বিশ্ববাজারে এখন নন-কটন পোশাক পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। টেক্সটাইল খাতের মধ্যে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত হচ্ছে ম্যান-মেইড ফাইবার-ভিত্তিক ইয়ার্ন ও ফ্যাব্রিক্স, যেমন পলিয়েস্টার, ভিনকস, স্প্যানডেক্স, মেলাঞ্জ। আপনাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে বিশ্ব বাজারে কটন বস্ত্রের শেয়ার এবং পোশাকের ব্যবহার মাত্র ২৬%, সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত তৈরি পোশাকের ৭৫% কটন পণ্যগুলোতে আবদ্ধ।

যদিও ভ্যালু চেইনে এগিয়ে থাকার জন্য বিজিএমইএ তার সদস্যদেরকে প্রতিনিয়ত সাধারন পোশাকের পাশাপাশি উচ্চ মূল্যের বা ব্যতিক্রমী পোশাক তৈরিতে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিচ্ছে, তারপরও যারা এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহন করবে, তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রণোদনা থাকা জরুরি। নন-কটন বা ম্যান-মেইড ফাইবার ভিত্তিক পোশাক রপ্তানিতে প্রণোদনা দেয়ার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

নন-কটন বস্ত্র ও পোশাকখাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য একটি বিশেষ স্কীম গ্রহন করা হোক। এর মাধ্যমে ২০২৯ পরবর্তী সময়ে ডাবল ট্রান্সফরমেশন রুলস প্রতিপালন করে জিএসপি প্লাস এর জন্য আমরা প্রস্তুত হতে পারবো। শুল্ক ও কাষ্টমস সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলোর সহজীকরণ পোশাক রপ্তানিকারকদের বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকা এবং পরিবর্তিত বিশ্ব বানিজ্যের প্রেক্ষাপটে পোশাক শিল্পের জন্য যে সুযোগগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো গ্রহনের জন্য ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াগুলো, বিশেষ করে শুল্ক ও কাষ্টমস সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো সহজীকরণ করা জরুরি।

বন্ড লাইসেন্সে এইচএস কোডের সাথে নতুন কাঁচামাল ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট উপকরণগুলো অন্তর্ভূক্তকরণের মতো প্রক্রিয়াগুলো সহজীকরণও প্রয়োজন। আমরা মনে করি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও ব্যবসার সক্ষমতা বিকাশের জন্য একটির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে বাজারের চাহিদা ও সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নীতি ও পদ্ধতি উভয়ই সংশোধন ও হালনাগাদ (আপডেট) করা জরুরি।

ইজ অব ডুয়িং বিজন্যাস

ব্যবসা পরিচালনা সহজীকরনে (ইজ অব ডুয়িং বিজন্যাস) আমরা এখনও পিছিয়ে আছি। সে জায়গায় উন্নতি করা দরকার। বিশেষ করে ম্যান-মেইড ফাইবারভিত্তিক টেক্সটাইল খাতে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষন করার লক্ষ্যে ব্যবসা সহজীকরণের উদ্যোগ গ্রহন করা জরুরি। লজিষ্টিক সেবা প্রদানে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। আমরা মনে করি, ব্যবসা-বানিজ্যে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিতকরণে আমাদের একটি নিজস্ব মানদন্ড থাকা বাঞ্চনীয়। সেইসঙ্গে তা প্রতিনিয়ত নজরদারির আওতায় রাখতে হবে।

সরকারের নীতি সহায়তার সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক শিল্পখাত থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিজিএমইএ। গত অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩৫%। চীন থেকে গত কয়েক বছরে অনেক ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে এসেছে। আগামী ৮ বছরে এর পরিমান আরও বাড়বে। চীন যেহেতু পরিবেশগত কারণে টেক্সটাইল থেকে সরে আসছে, ফলে সঙ্গত কারণেই সেগুলো বাংলাদেশে আসবে বলে আমরা ধারনা করছি। আমরা এই সুযোগগুলো গ্রহন করতে চাই।

বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) এর ২০২১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের শেয়ার মাত্র ৬.৪০%। এ বাজারেও নিজের শেয়ার আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে বাংলাদেশের। এ সুযোগ গ্রহনের জন্য ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি টেকসই করার লক্ষ্যে পোশাকখাতে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, বিশেষ করে নন-কটন এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণের উপর আমরা জোর দিয়েছি। উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের সব দেশেই পোশাক রপ্তানি করার পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি।

বিজিএমইএ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়াতে লিড টাইম হ্রাস করা, সর্বশেষ প্রযুক্তি গ্রহন করা, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করা এবং কারখানাগুলোকে আরও টেকসই করার জন্য কারখানাগুলোর জন্য “সেন্টার অব ইনোভেশন, এফিশিয়েন্স অ্যান্ড ওএসএইচ” প্রতিষ্ঠা করেছে, যা গত নভেম্বরে বিজিএমইএ এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত “মেইড ইন বাংলাদেশ উইক” চলাকালে মাননীয় বানিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, এমপি উদ্বোধন করেছেন।

বিজিএমইএ পোশাক শিল্প রূপকল্প ঘোষনা

টেকসই পোশাক শিল্প গড়তে বিজিএমইএ পোশাক শিল্প রূপকল্প ঘোষনা করেছে। এই রূপকল্পের ২০টি লক্ষ্য হলো – কার্বন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানো, টেকসই কাঁচামাল ব্যবহার ৫০ শতাংশে উন্নীতকরণ, শোভন কাজের পরিবেশ শতভাগ নিশ্চিত করা, পানির অপচয় ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা, ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার শতভাগে নামিয়ে আনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ২০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া, গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবহার ৩০ শতাংশ হ্রাস, নারী-পুরুষের সমতা শতভাগ নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান ৬০ লাখে উন্নীত করা, উৎপাদনশীলতা ৬০% উন্নীত করা, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি প্রভৃতি। তবে এই রূপকল্প বাস্তবায়নে অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে মানসম্পন্ন অবকাঠামো সরাসরি যুক্ত।

অবকাঠামো উন্নয়নে অনেক পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পদ্মা সেতু নির্মান হয়েছে, ঢাকা মেট্রোরেল উদ্বোধন করা হয়েছে, কর্ণফুলী টানেলের নির্মান কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে, শাহজালাল বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মান ও ঢাকা-এলিভেটেড এক্সপ্রেসের কাজ জোরেসোরে চলছে। আরও অনেক মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

বে-টার্মিনাল নির্মাণ

আমদানি- রপ্তানি কার্যμমে μমবর্ধমান প্রবৃদ্ধিকে সামনে রেখে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে কন্টেইনার ইয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, কী-গ্যান্ট্রি μেন সহ প্রয়োজনীয় হ্যান্ডলিং ইক্যুপমেন্ট সংযোজন, ৪,৫০০ টিউজ কন্টেইনার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন পতেঙ্গা কন্টেইনার কার্যμম পরীক্ষা মূলক ভাবে শুরু, বন্দর জেটিতে ১০ মিটার ড্রাফটের বড় জাহাজ বার্থিংকরণ সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও সরকার চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবসা-বাণিজ্যের জবমরড়হধষ ঐঁন হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা অংশ হিসেবে বে-টার্মিনাল নির্মানের পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। পতেঙ্গা উপকূলে প্রস্তাবিত বে-টার্মিনালে ২৪ঘন্টা জাহাজ চলাচল সম্ভব হবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুসারে, ১২ মিটার পর্যন্ত ডেফথ এর জাহাজ বার্থ নিতে পারবে। বে-টার্মিনাল এর চুড়ান্ত কাজ সম্পাদন হলে প্রায় ১৫টি জাহাজ এক সাথে বার্থ নিতে পারবে। এতে আমদানি-রপ্তানিতে সময় এবং খরচ অনেকাংশে হ্রাস পাবে এবং রপ্তানি বাণিজ্যের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

মাতারবাড়ী গভীর সমূদ্র বন্দর

প্রধানমন্ত্রীর ফাস্টট্র্যাক প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় মাতারবাড়ী গভীর সমূদ্র বন্দরের কার্যμমের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। নির্মাণ সম্পন্ন হলে ৭৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি জেটি চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতার সাথে যুক্ত হবে। মাতারবাড়ি বন্দরে প্রায় ১০ হাজার কনটেইনার নিয়ে ১৬ মিটার গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারবে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে মাদার ভেসেল সমূহ (বড় জাহাজ) সমুদ্রে গভীরতা না থাকার কারণে বাংলাদেশে আসতে পারে না। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর চালু হলে উক্ত বন্দরের মাধ্যমে বড় বড় জাহাজের মাধ্যমে সরাসরি আমদানি-রপ্তানি কার্যμম পরিচালনা করা যাবে। এ’ক্ষেত্রে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর সমূহের ব্যবহার অনেকাংশে কমবে। এতে করে পোশাক শিল্পে লিড টাইম কমবে, খরচ সাশ্রয় হবে।

গার্মেন্ট পার্ক

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘গার্মেন্ট পার্ক’ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জমির জন্য বিজিএমইএ কয়েক কিস্তিতে টাকা দিয়েছে। যতদ্রুত সম্ভব বিজিএমইএ’কে অনতি বিলম্বে জায়গা বুঝিয়ে দেয়ার জন্য সরকারের সদয় দৃষ্টি আকর্ষন করেন।

বন্দরনগরী চট্রগ্রামে বিপুল সংখ্যক পোশাক কারখানা রয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিশাল অবদান রাখছে। “চট্রগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (সিবিইউএফটি)” নামে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করার অনুমোদন দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি গত ২১ জানুয়ারি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি কর্তৃক উদ্বোধন করা হয়েছে এবং আগামী মার্চ’২০২৩ ইং তারিখ থেকে পূর্ণাঙ্গ কার্যμম শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।  এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের জন্য চট্রগ্রামে এক খন্ড জমি প্রতীকি মূল্যে বিজিএমইএ’র অনুকূলে বরাদ্দ প্রদান করা হোক। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি পুরোপুরি চালু হলে ঐ অঞ্চলের মানব সম্পদের দক্ষতার উন্নয়ন হবে।

শিল্পখাত

বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাত আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে চলেছে, যার গুরুত্ব প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে উল্লেখ রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে একটি স্বনির্ভর ও উন্নত অর্থনীতির দেশ হওয়ার যে রূপকল্প নিয়ে আমরা কাজ করছি, তা অর্জনের জন্য রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতি নানাভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাষ অনুযায়ী, আগামী এক-দুই দশকে এক ট্রিলিয়ন তথা এক লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পরিনত হতে পারে এই দেশ। গত ছয় বছরে দেশের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৪%। সেটি যদি ৫ শতাংশেও নামে, তাতেও ২০৪০ সালের মধ্যেই এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মাইলফলক স্পর্শ করবে বাংলাদেশ। আর প্রবৃদ্ধি ১০% হলে ২০৩০ সালেই সেখানো পৌঁছানো সম্ভব। তাই, আমাদের অর্থনীতির সকল সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।

পোশাকখাত

পোশাকখাত আমাদের গর্ব। কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা আজ এ খাতটির উপর নির্ভরশীল। আগামীদিনে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে ভিশন তৈরি করেছে, তা বাস্তবায়নে পোশাকখাতের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এখাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন আর অগ্রগতির গল্পগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারলে সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো কঠিন হয়ে যাবে।