ঢাকা ব্যুরো: দেশের অর্থনীতিতে এখন বড় আতঙ্ক ডলার সঙ্কট। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর এ মুদ্রাটির দাপটে বেসামাল অর্থনীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগেও লাগাম টানা যাচ্ছে না। বাজারে ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোতেও প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে খোলা বাজারে বেশি টাকা দিলেই মিলছে এ মুদ্রা। ডলারের এ সংকটে পণ্য আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বাড়ন্ত মূল্যস্ফীতির পারদকে আরো উপরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তবে এ অস্থিরতা কবে নাগাদ শেষ হবে- এ প্রশ্নের সদুত্তর নেই কারো কাছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যে দাম রয়েছে তা থেকে নামার সম্ভাবনা খুবই কম, ওঠার সম্ভাবনাই বেশি। এজন্য ব্যাংকঋণে সুদহারের লাগাম তুলে স্থানীয় মুদ্রা টাকাকে সম্পদ হিসেবে ‘আকর্ষণীয়’ করতে হবে বলে মনে করেন তারা।

ব্যাংকাররা বলছেন, একদিকে ডলারের অস্থির ভাব, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির এই সময়ে ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের কথা ভেবে মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা না রেখে হাতে নগদ অর্থ রাখতে চাইছে। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেঁধে দেয়ায় ব্যাংকগুলোও বেশি সুদের হারে আমানত রাখতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সংকট মোকাবিলায় নগদ অর্থ সংকটে পড়া ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া বাড়িয়েছে। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গণমাধ্যমেক বলেন, ডলার সঙ্কটে বৈদেশিক ব্যাংকের রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, রপ্তানি, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই রিজার্ভ কমতে থাকলে ‘চাহিদা’ কমানোর জন্য ডলারের দাম বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক রাখতে সুদহারের ক্যাপ তুলে দেয়া দরকার। তবে সুদহারের সীমা তুলে দিলেও ডলারের ওপর তেমন কোন প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ঋণের সুদহার না বাড়ানোর কারণে অনেকেই সহজে ঋণ নিয়ে যাচ্ছে। এতে অর্থপাচার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাংক ঋণে সুদের হার বাড়ালে পাচার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে আসবে। ফলে ডলারের চাহিদাও কমে স্থিতিশীল হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা এবং গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমেক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলারের দাম কমবে না। তবে আর যেন না বাড়ে সে ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে যে দর রয়েছে তা থেকে নামার সম্ভাবনা খুবই কম, ওঠার সম্ভাবনাই বেশি। আমাদের ডলারের যে চাহিদা, আর সরবরাহ- সেখানে এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে। এখনো বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করছে। কাজেই আমাদের স্থিরতা এখনো আসেনি। ডলার বিক্রি করে দাম স্থিতিশীল রাখা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বিক্রি বন্ধ না করবে, ততদিন পর্যন্ত ডলারে স্থিরতা আসবে না, রিজার্ভও বাড়বে না। তবে ডলার বিক্রি বন্ধ করলে আবার সমস্যাও রয়েছে। এতে বাজারে ডলারের দাম বেড়ে যাবে। অর্থাৎ উভয় সঙ্কট রয়েছে। কাজেই পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে, মূল্যস্ফিতি কমাতে হবে, টাকাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। সেজন্য ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়াতে হবে। সুদহার বাড়ালেই টাকা আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। ডলারের সমস্যা সমাধান করতে হলে বাজারে ডলার সাপ্লাই বাড়াতে হবে। মূল্যস্ফিতির তুলনায় আমাদের আমানতের সুদহার কম। সুতরাং টাকাকে সম্পদ হিসেবে দামি করে তুলতে হবে।

এদিকে, কোনো ব্যাংক মোটাদাগে যেন আমদানি দায় নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ না হয়, সে জন্য ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবারও (১৩ অক্টোবর) কয়েকটি ব্যাংকের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৩ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত বিক্রি ছাড়িয়েছে চার বিলিয়ন ডলার। প্রচুর ডলার বিক্রির ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে কমে এখন ৩৬ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এদিকে নতুন করে এলসি খোলা কিছুটা কমলেও আমদানি দায় পরিশোধ এখনও বাড়ছে। আবার বাড়তে থাকা রেমিট্যান্স ও রপ্তানি সেপ্টেম্বরে কমেছে। এর মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক বাংলাদেশি ব্যাংকের ঋণসীমা কমিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে ডলারের বাজারে সংকট যেন বেড়েই যাচ্ছে। এমন সঙ্কটের মধ্যে ডলারের দাম পুননির্ধারণের দাবি জানিয়েছে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। অন্যদিকে ডলার বেচাকেনায় ব্যাংকগুলোর মুনাফার অর্ধেক অর্থ ফেরত চান আমদানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে এ ধরণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লারস অ্যাসোসিয়েশন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার কয়েকটি ব্যাংকের কাছে ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। এর বিপরীতে বাজার থেকে ৩৮ হাজার কোটি টাকার মতো উঠে এসেছে। গত অর্থবছর ৭৬২ কোটি ১৭ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়। এভাবে ডলার বিক্রির ফলে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ওঠা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমেছে। সর্বশেষ ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে ৯৫ টাকা দরে। এর আগে, বাংলাদেশ ব্যাংক যে দামে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করতো সেটিকে ‘ইন্টারব্যাংক এক্সচেঞ্জ রেট’ বা আন্তঃব্যাংক লেনদেন হার- নামে অভিহিত করা হতো। তবে চলমান ডলার সংকটের কারণে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা ও যোগানের সাথে তাল মিলিয়ে ডলারের দর নির্ধারিত না হওয়ায় ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে ডলার লেনদেন বন্ধ করে দেয়। এরপর দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় বাজারের স্থিতিশীলতা আনতে বিদেশি মুদ্রা লেনদেকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এবং ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) এক সভায় রপ্তানি আয় নগদায়নে ডলারের দাম ৯৯ টাকা ও দেশে আসা রেমিট্যান্সে ১০৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ওই দিন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নির্ধারিত ৯৫ টাকা দরে ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যে ডলার কেনাবেচার বাধ্যবাধকতাটি তুলে নেয়।

মুনাফার অর্ধেক অর্থ ফেরত চান ব্যবসায়ীরা: এদিকে ডলার বেচাকেনায় ব্যাংকগুলোর মুনাফার অর্ধেক অর্থ ফেরত চান আমদানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা। কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খোলার (এলসি) সময় ডলার সংকট দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ব্যাংকগুলো। সেই অর্থ সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতে খরচ না করে ব্যবসায়ীদের ফেরত দিতে গভর্নরের কাছে দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লারস অ্যাসোসিয়েশন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে দেয়া চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন ব্যাংক গত মে ও জুন মাসে কম দামে ডলার কিনে আমদানিকারকদের কাছে অনৈতিকভাবে বেশি দামে বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা করেছে। দেশে লোহার চাহিদা পূরণে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিকারকদের কাছ থেকে ডলারের অতিরিক্ত মূল্য হিসেবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ব্যাংকগুলো। তাই ব্যাংকগুলোর ডলার কেনাবেচায় অর্জিত অতিরিক্ত মুনাফার অর্থের মালিক দেশের আমদানিকারক। আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা ও আমদানি মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে মধ্যবর্তী সময়ে ডলারের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতির স্বার্থে আমদানি বাণিজ্যে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ীদের আর্থিকভাবে সুরক্ষা দেয়া জরুরি। এমন যুক্তিতে ডলার কেনাবেচায় অতিরিক্ত মুনাফার ৫০ শতাংশ সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতে খরচ না করে ব্যবসায়ীদের ফেরত দেয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সেপ্টেম্বরে আমদানি ব্যয় কিছুটা কমার কারণে ডলারের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৯৬ টাকা রেটে ডলার বিক্রি করছে। তবে গত বুধবার ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে ১০০ টাকা ৯৩ পয়সা থেকে ১০৭ টাকা ৪০ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করছে। এদিকে মানি এক্সচেঞ্জগুলোতে ১১৪ থেকে ১১৫ টাকায় ডলার বিক্রি হচ্ছে।

ভ্রমণ কোটা বাইরে রেখে ডলার সাশ্রয়ের পদক্ষেপ: দেশে সাত মাসের বেশি সময় ধরে ডলারের সংকট চলছে। পরিস্থিতি সামলাতে ইতোমধ্যে অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে ঋণের জোগান, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে কড়াকড়ি আরোপ এবং ব্যাংকের গাড়ি কেনা বন্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকের ডলার ধারণের সীমা (এনওপি) হ্রাস, রপ্তানিকারকের প্রত্যাবাসন কোটায় (ইআরকিউ) ধারণকৃত ডলারের ৫০ শতাংশ নগদায়ন, ইআরকিউ হিসাবে জমা রাখার সীমা কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে ভ্রমণ কোটা এসব পদক্ষেপের বাইরে রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই বলছেন- ডলার খরচের সীমা না কমানোয় অনেকেই প্রয়োজন ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন। এতে ডলার অপচয় হচ্ছে। এখন ভিসা আবেদনের সংখ্যা যে কোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ বলে জানা গেছে। সম্প্রতি বিশ্বের বৃহত্তম ভিসা আউটসোর্সিং ও বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক মিশনের জন্য প্রযুক্তি পরিষেবা বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান ভিএসএফ এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, গত বছরের ৯ মাসের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ভিসা আবেদনের হার ১৬০ শতাংশ বেড়েছে। এই হার মহামারীর আগের সময়ের সমান। এর কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে। পাশাপাশি দুবাই এক্সপো-২০২০ ও ফিফা বিশ্বকাপ-২০২২ এর মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলো পুনরায় চালু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও চালু হয়েছে।

ঢাকা ব্যুরো: দেশের অর্থনীতিতে এখন বড় আতঙ্ক ডলার সঙ্কট। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর এ মুদ্রাটির দাপটে বেসামাল অর্থনীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগেও লাগাম টানা যাচ্ছে না। বাজারে ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোতেও প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে খোলা বাজারে বেশি টাকা দিলেই মিলছে এ মুদ্রা। ডলারের এ সংকটে পণ্য আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বাড়ন্ত মূল্যস্ফীতির পারদকে আরো উপরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তবে এ অস্থিরতা কবে নাগাদ শেষ হবে- এ প্রশ্নের সদুত্তর নেই কারো কাছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যে দাম রয়েছে তা থেকে নামার সম্ভাবনা খুবই কম, ওঠার সম্ভাবনাই বেশি। এজন্য ব্যাংকঋণে সুদহারের লাগাম তুলে স্থানীয় মুদ্রা টাকাকে সম্পদ হিসেবে ‘আকর্ষণীয়’ করতে হবে বলে মনে করেন তারা।

ব্যাংকাররা বলছেন, একদিকে ডলারের অস্থির ভাব, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির এই সময়ে ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের কথা ভেবে মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা না রেখে হাতে নগদ অর্থ রাখতে চাইছে। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেঁধে দেয়ায় ব্যাংকগুলোও বেশি সুদের হারে আমানত রাখতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সংকট মোকাবিলায় নগদ অর্থ সংকটে পড়া ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া বাড়িয়েছে। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গণমাধ্যমেক বলেন, ডলার সঙ্কটে বৈদেশিক ব্যাংকের রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, রপ্তানি, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই রিজার্ভ কমতে থাকলে ‘চাহিদা’ কমানোর জন্য ডলারের দাম বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক রাখতে সুদহারের ক্যাপ তুলে দেয়া দরকার। তবে সুদহারের সীমা তুলে দিলেও ডলারের ওপর তেমন কোন প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ঋণের সুদহার না বাড়ানোর কারণে অনেকেই সহজে ঋণ নিয়ে যাচ্ছে। এতে অর্থপাচার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাংক ঋণে সুদের হার বাড়ালে পাচার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে আসবে। ফলে ডলারের চাহিদাও কমে স্থিতিশীল হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা এবং গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমেক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলারের দাম কমবে না। তবে আর যেন না বাড়ে সে ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে যে দর রয়েছে তা থেকে নামার সম্ভাবনা খুবই কম, ওঠার সম্ভাবনাই বেশি। আমাদের ডলারের যে চাহিদা, আর সরবরাহ- সেখানে এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে। এখনো বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করছে। কাজেই আমাদের স্থিরতা এখনো আসেনি। ডলার বিক্রি করে দাম স্থিতিশীল রাখা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বিক্রি বন্ধ না করবে, ততদিন পর্যন্ত ডলারে স্থিরতা আসবে না, রিজার্ভও বাড়বে না। তবে ডলার বিক্রি বন্ধ করলে আবার সমস্যাও রয়েছে। এতে বাজারে ডলারের দাম বেড়ে যাবে। অর্থাৎ উভয় সঙ্কট রয়েছে। কাজেই পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে, মূল্যস্ফিতি কমাতে হবে, টাকাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। সেজন্য ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়াতে হবে। সুদহার বাড়ালেই টাকা আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। ডলারের সমস্যা সমাধান করতে হলে বাজারে ডলার সাপ্লাই বাড়াতে হবে। মূল্যস্ফিতির তুলনায় আমাদের আমানতের সুদহার কম। সুতরাং টাকাকে সম্পদ হিসেবে দামি করে তুলতে হবে।

এদিকে, কোনো ব্যাংক মোটাদাগে যেন আমদানি দায় নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ না হয়, সে জন্য ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবারও (১৩ অক্টোবর) কয়েকটি ব্যাংকের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৩ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত বিক্রি ছাড়িয়েছে চার বিলিয়ন ডলার। প্রচুর ডলার বিক্রির ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে কমে এখন ৩৬ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এদিকে নতুন করে এলসি খোলা কিছুটা কমলেও আমদানি দায় পরিশোধ এখনও বাড়ছে। আবার বাড়তে থাকা রেমিট্যান্স ও রপ্তানি সেপ্টেম্বরে কমেছে। এর মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক বাংলাদেশি ব্যাংকের ঋণসীমা কমিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে ডলারের বাজারে সংকট যেন বেড়েই যাচ্ছে। এমন সঙ্কটের মধ্যে ডলারের দাম পুননির্ধারণের দাবি জানিয়েছে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। অন্যদিকে ডলার বেচাকেনায় ব্যাংকগুলোর মুনাফার অর্ধেক অর্থ ফেরত চান আমদানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে এ ধরণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লারস অ্যাসোসিয়েশন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার কয়েকটি ব্যাংকের কাছে ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। এর বিপরীতে বাজার থেকে ৩৮ হাজার কোটি টাকার মতো উঠে এসেছে। গত অর্থবছর ৭৬২ কোটি ১৭ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়। এভাবে ডলার বিক্রির ফলে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ওঠা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমেছে। সর্বশেষ ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে ৯৫ টাকা দরে। এর আগে, বাংলাদেশ ব্যাংক যে দামে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করতো সেটিকে ‘ইন্টারব্যাংক এক্সচেঞ্জ রেট’ বা আন্তঃব্যাংক লেনদেন হার- নামে অভিহিত করা হতো। তবে চলমান ডলার সংকটের কারণে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা ও যোগানের সাথে তাল মিলিয়ে ডলারের দর নির্ধারিত না হওয়ায় ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে ডলার লেনদেন বন্ধ করে দেয়। এরপর দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় বাজারের স্থিতিশীলতা আনতে বিদেশি মুদ্রা লেনদেকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এবং ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) এক সভায় রপ্তানি আয় নগদায়নে ডলারের দাম ৯৯ টাকা ও দেশে আসা রেমিট্যান্সে ১০৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ওই দিন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নির্ধারিত ৯৫ টাকা দরে ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যে ডলার কেনাবেচার বাধ্যবাধকতাটি তুলে নেয়।

মুনাফার অর্ধেক অর্থ ফেরত চান ব্যবসায়ীরা: এদিকে ডলার বেচাকেনায় ব্যাংকগুলোর মুনাফার অর্ধেক অর্থ ফেরত চান আমদানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা। কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খোলার (এলসি) সময় ডলার সংকট দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ব্যাংকগুলো। সেই অর্থ সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতে খরচ না করে ব্যবসায়ীদের ফেরত দিতে গভর্নরের কাছে দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লারস অ্যাসোসিয়েশন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে দেয়া চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন ব্যাংক গত মে ও জুন মাসে কম দামে ডলার কিনে আমদানিকারকদের কাছে অনৈতিকভাবে বেশি দামে বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা করেছে। দেশে লোহার চাহিদা পূরণে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিকারকদের কাছ থেকে ডলারের অতিরিক্ত মূল্য হিসেবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ব্যাংকগুলো। তাই ব্যাংকগুলোর ডলার কেনাবেচায় অর্জিত অতিরিক্ত মুনাফার অর্থের মালিক দেশের আমদানিকারক। আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা ও আমদানি মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে মধ্যবর্তী সময়ে ডলারের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতির স্বার্থে আমদানি বাণিজ্যে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ীদের আর্থিকভাবে সুরক্ষা দেয়া জরুরি। এমন যুক্তিতে ডলার কেনাবেচায় অতিরিক্ত মুনাফার ৫০ শতাংশ সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতে খরচ না করে ব্যবসায়ীদের ফেরত দেয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সেপ্টেম্বরে আমদানি ব্যয় কিছুটা কমার কারণে ডলারের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৯৬ টাকা রেটে ডলার বিক্রি করছে। তবে গত বুধবার ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে ১০০ টাকা ৯৩ পয়সা থেকে ১০৭ টাকা ৪০ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করছে। এদিকে মানি এক্সচেঞ্জগুলোতে ১১৪ থেকে ১১৫ টাকায় ডলার বিক্রি হচ্ছে।

ভ্রমণ কোটা বাইরে রেখে ডলার সাশ্রয়ের পদক্ষেপ: দেশে সাত মাসের বেশি সময় ধরে ডলারের সংকট চলছে। পরিস্থিতি সামলাতে ইতোমধ্যে অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে ঋণের জোগান, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে কড়াকড়ি আরোপ এবং ব্যাংকের গাড়ি কেনা বন্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকের ডলার ধারণের সীমা (এনওপি) হ্রাস, রপ্তানিকারকের প্রত্যাবাসন কোটায় (ইআরকিউ) ধারণকৃত ডলারের ৫০ শতাংশ নগদায়ন, ইআরকিউ হিসাবে জমা রাখার সীমা কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে ভ্রমণ কোটা এসব পদক্ষেপের বাইরে রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই বলছেন- ডলার খরচের সীমা না কমানোয় অনেকেই প্রয়োজন ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন। এতে ডলার অপচয় হচ্ছে। এখন ভিসা আবেদনের সংখ্যা যে কোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ বলে জানা গেছে। সম্প্রতি বিশ্বের বৃহত্তম ভিসা আউটসোর্সিং ও বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক মিশনের জন্য প্রযুক্তি পরিষেবা বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান ভিএসএফ এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, গত বছরের ৯ মাসের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ভিসা আবেদনের হার ১৬০ শতাংশ বেড়েছে। এই হার মহামারীর আগের সময়ের সমান। এর কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে। পাশাপাশি দুবাই এক্সপো-২০২০ ও ফিফা বিশ্বকাপ-২০২২ এর মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলো পুনরায় চালু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও চালু হয়েছে।