ফরহাদ মজহার

“বাংলা ভাষায় ‘সাহিত্য’ ধারণা যে মূলে ইংরেজি ‘লিটারেচার’-এর অনুবাদ নয়, সেটা বুঝে নেওয়া জরুরী। প্রাথমিক কাজ হচ্ছে বাংলা ভাষায় ‘সাহিত্য’ সংক্রান্ত ধারণা ও অন্যান্য বিবেচনা সম্পর্কে আমাদের বোঝাবুঝি যথাসম্ভব হালনাগাদ করে তোলা। কোনো নতুন সাহিত্যতত্ত্ব বানাবার দায় মাথায় নিয়ে এই পুনর্পাঠ নয়। বরং সাহিত্যের যে তত্ত্ব বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মজুদ রয়েছে তার সঙ্গে পরিচয় নিবিড় করা প্রাথমিক কাজ। তাই ‘সাহিত্য’ ব্যাপারটা আসলে কী এবং সাহিত্য চর্চা করতে চাইলে গোড়ার জিজ্ঞাসাগুলো কেমন ছিল, সেই সব ভুলে না গিয়ে আবার স্মরণে আনা দরকার। এরপরের কাজ হচ্ছে টেকনিক বা টেকনলজির যুগে নতুন ভাবে সাহিত্য ধারণাকে ছেঁচে তোলা। টেকনিক, টেকনলজি বা কৃৎকৌশলের বিচারকে সাহিত্য বিচারের অন্তর্গত করা না গেলে সাহিত্য চর্চার নতুন ক্ষেত্র বা দিগন্ত আরও পরিচ্ছন্নভাবে আমাদের চোখে ধরা পড়বে না। আমরা পুরানা কাসুন্দি ঘাঁটতে থাকব। পাশাপাশি টেকনলজি কিভাবে আমাদের ইন্দ্রিয় অভ্যাস বদলে দেয়, দিয়েছে এবং দিচ্ছে সেই সবের অনিবার্য পরিণতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলে আমরা বুঝব কিভাবে আমরা বদলে গিয়েছি এবং বদলে যাচ্ছি…”

যখন আমরা নতুন করে ‘বড় বাংলার সাহিত্য’ হিশাবে বের করতে শুরু করি তখন একটা প্রশ্ন আমাদের মোকাবিলা করতে হয়। সেটা হলো, ‘বড় বাংলা’ বলার পেছনে আমাদের কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কিনা। সঙ্গত প্রশ্ন। যথা, দুই বাংলা একত্রীকরণ জাতীয় চিন্তা। এর সহজ ও সরল উত্তর, না।

তবে এই প্রকার প্রশ্ন এবং উত্তর দুটোই আসলে অর্থহীন। ‘উদ্দেশ্য’ মানে কোন একটা আগাম তৈরি আইডিয়া বা চিন্তা মাথায় রেখে বাস্তবায়নের মামলা। এরককম কোনো আগাম বানানো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ‘প্রতিপক্ষ’ ওয়েবজিনের নাই। দ্বিতীয়ত, উপমহাদেশের দুই বৃহৎ সম্প্রদায় মুসলমান ও হিন্দুর মধ্যে পরস্পরকে বোঝা ও জানার প্রকট অভাব রয়েছে। চাইলেই হিন্দু-মুসলমানে রাতারাতি ভাব হয়ে যাবে না। তার বিস্তর কারন আছে। কয়েকটি বলছি:

আধুনিক জাতিবাদ, ধর্মকে স্রেফ পরিচয়বাদে পর্যবসিত করেছে। ধর্মীয় পরিচয় ধর্মীয় জাতিবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাকেই প্রশ্রয় দেয়। পরস্পরের মধ্যে বিভেদ জারি থাকার কারণও প্রধানত এই পরিচয়বাদী আধুনিক জাতিবাদে। ফলে ধর্মের পর্যালোচনা বা ধর্মের মধ্য দিয়ে ভাষা, কল্পনা, চিন্তা, ইচ্ছা, বাসনার বিকাশও রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। বড় বাংলার ভক্তি আন্দোলন, সুফি-বয়াতি ধারাসহ অপরাপর লৌকিক চর্চার মধ্যে আমরা টের পাই গুরুতর বহু মানবিক জিজ্ঞাসা বিভিন্ন পুরান, নবী-রসুলদের কেচ্ছা, লৌকিক কাহিনী এমনকি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে তোলা হয়েছে। সাহিত্য, ভাব, দর্শন বা চিন্তার দিক থেকে যাদের মূল্য অপরিসীম। কিন্তু ঔপনিবেশিকতা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে, তেমনি পাশ্চাত্যের আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের অনুকরণ করতে গিয়ে ‘আধুনিকতার’ তোড়ে নিজেদের জিজ্ঞাসা ভুলে গিয়েছি। দূরত্ব আরও বেড়েছে। এরপর রয়েছে অর্থনৈতিক কারন। পুঁজিতান্ত্রিক অসম উন্নয়ন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কারনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এককালের বৃহৎ বাংলার মধ্যে বিস্তর অদল বদল ঘটিয়েছে। ফলে দুই বাংলার একত্রীকরণ এখন অবাস্তব ধারণা, বড় জোর রোমান্টিক অভিক্ষেপ মাত্র। তবে পশ্চিম বাংলায় আমরা সম্প্রতি একদিকে ‘জয় শ্রীরাম’ আর তার বিপরীতে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান শুনছি। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে আমাদের পুলকিত হবার কিছু নাই। প্রথমত এই শ্লোগান স্থানীয় ভোটের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিম বাংলার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির দিকে তাকালে বোঝা যায় উচ্চ বর্ণের হাতে তৈরি ‘বাঙালি’ ধারণার বিশেষ হেরফের হয় নি। এই ধারণার মধ্যে ঔপনিবেশিক আমলের মতো মুসলমান বাঙালি অনুপস্থিত। হিন্দু-মুসলমানসহ সবাইকে নিয়ে ‘বড় বাংলা’র কল্পনা অনেক দূরের ব্যাপার। অন্যদিকে ভারত হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং বাংলাদেশের প্রতি দিল্লীর নীতির কারণে বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা প্রবল হয়েছে। ফলে দুইবাংলা একত্রীকরণ জাতীয় কোন রোমান্টিক উৎকল্পনার জায়গা নাই বললেই চলে।

আমাদের ইতিহাস বোধের বড়ই অভাব। তদুপরি, বাঙালি বড়ই রোমান্টিক প্রাণী! তাই আমামদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্নে আমরা বেশ আমোদ বোধ করেছি ! প্রশ্নের তোড় দেখে বুঝে যাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী – দুনিয়ার যেখানেই থাকুক – এখনও বাস্তবতা এবং রোমান্টিকতার ভেদ বুঝতে অক্ষম। রোমান্টিকতা খারাপ কিছু না। কিন্তু রোমান্টিকেরও মাটিতে ও ইতিহাসে পা রেখে বাস্তবিক হতে হয়।

কিন্তু নিজেদের বাসনা সম্পর্কে এই উত্তর শেষাবধি অর্থহীন। কোন কাজই রাজনীতি বা রাজনৈতিকতার বাইরে নয়। আরও নয় যদি সেই কাজ বা চর্চার বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমাদের কল্পনা, স্মৃতি, চেতনা ও চিন্তাকে রূপ দেবার সামর্থ রাখে, আমাদের ইচ্ছা ও সংকল্পে রূপান্তর আনে। রূপান্তরের ফল রাজনীতিতে পড়ে। সেই দিক থেকে সাহিত্য চর্চা রাজনীতি বা রাজনৈতিকতারই চর্চা। সাহিত্য ক্ষমতার বিন্যাস কিংবা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে। কখনও পরোক্ষ ভাবে, কখনও প্রত্যক্ষ ভাবে। সাহিত্য চর্চা বিপজ্জনক কাজ। বিদ্যমান, অনুমান, কল্পনা, চিন্তাচেতনা ও ক্ষমতার ভারসাম্য ছারখার করে দেবার ক্ষমতা সাহিত্যের আছে। একদিকে সাহিত্য চর্চা ক্ষমতা চর্চা কিংবা রাজনীতি থেকে আলাদা। কিন্তু অপরদিকে তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন কোন পরিসর নয়। আদতে যাহা বাহান্ন তাহাই তেপ্পান্ন।

সাহিত্য রাজনীতির বাইরের কিছু না। কিন্তু আমাদের কাছে ‘বড় বাংলা’ একান্তই সাহিত্যোচিত ধারণা। এই অর্থে যে সাহিত্য চর্চাই আমাদের উদ্দেশ্য। এটা কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প না। অর্থাৎ বিশেষ কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমরা ‘বড় বাংলা’ কথাটা প্রচার করছি না। বরং নিজেদের নিয়ে সংকীর্ণ বৃত্তের মধ্যে ভাববার অভ্যাস থেকে আমরা মুক্ত হতে চাইছি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চাকে তাদের ভৌগলিক ও রাজনৈতিক সীমা বা বৃত্ত থেকে আমরা মুক্ত রাখতে চাই। আমরা এতোটুকুই দাবি করি যে ‘বাংলাভাষী’ হিশাবে আমাদের কিছু সাধারণ স্বার্থ আছে, বাংলা সাহিত্যের বিকাশ সেই সাধারণ লক্ষ্যের অন্তর্গত। তাই ভূগোল ও রাজনৈতিক বৃত্তে বন্দী না থেকে আমরা নিজেদের আরও বড় পরিসরে ভাবতে চাই। আরও বড় পরিসরে অন্য আরও অনেকের সঙ্গে যুক্ত থাকা বা যুক্ত হওয়াই আমাদের বাসনা। সাহিত্য ব্যাপারটাই তাই। অপরের ‘সহিত’ যুক্ত হওয়া এবং বিরাজ করবার বাসনা। সাহিত্য সেই বিরাজমানতার শর্ত তৈরি করে।

কথাটা আমরা বলছি বটে, কিন্তু সেটা ব্যাখ্যার দাবি করে। স্বীকার করি ‘সাহিত্য’ কথাটা আমাদের আবার নতুন ভাবে বোঝা এবং অন্যদের বোঝাবার একটা দায় তৈরি হয়েছে। সেটা শুরুতে কিভাবে করা যায়, তা নিয়ে আমরা ভেবেছি। এই নিবন্ধটি সেই ভাবনারই ফল। ‘প্রতিপক্ষ’ সাহিত্য’ বলতে কী বোঝে, এখানে তা নিয়ে কথা বলব।

আমাদের মনে হয়েছে ‘সাহিত্য’ নিয়ে আলোচনা আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাংলা জাতীয় সাহিত্য’ রচনাটি আরেকবার পড়ার মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করতে পারি। শুরুতে এখানে প্রবন্ধটি নতুন করেপড়ার কাজটাই আমরা করব। লেখাটির সঙ্গে প্রাথমিক পরিচিতিমূলক কাজটা হয়ে গেলে তথাকথিত ‘মিডিয়া’ বা মাধ্যমের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক বিচারে আমরা মনোযোগী হব। যেমন, ছাপাখানা। এরপর, ফটোগ্রাফি, সিনেমা, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, ইত্যাদি।

ছাপাখানা, বাজার ব্যবস্থা , প্রমিত ভাষা ইত্যাদি মিলে যে সমপ্রকৃতি ও সমরূপের ‘বাঙালি’ নামক কল্পনা ঔপনিবেশিকতার ঔরসে বর্ণ হিন্দু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, সেই নির্মাণে মুসলমান বাঙালি অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এবং তার অনিবার্য রাজনৈতিক পরিণতির আলোকে বিচার করা জরুরী। শুধু নিজেদের ঐতিহাসিক ভাবে বোঝার জন্য নয়, সাহিত্যের শক্তি সম্বন্ধে আমাদের আত্মবিশ্বাস আবার দৃঢ় করবার জন্য। সংকীর্ণ ও সাম্প্রদায়িক হলেও যদি বাংলা সাহিত্য আমাদের ‘বাঙালি’ হিশাবে ভাবতে শিখিয়েছে, তাহলে সাহিত্য নিজগুণে সেই সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি চাইবে, এটা আশা করা যায়। তাই আমরা মনে করি বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক ত্রুটি সাহিত্য নিজেই আবার মীমাংসা করবার পথ ও প্রকরণ প্রদর্শন করতে সক্ষম। সাহিত্য আমামদের ‘বড়’ বা ‘বৃহৎ’ করবে। হয়তো দীনেশ্চন্দ্র সেন এই বাসনা মনে রেখেই ‘বৃহৎ বাংলা’ রচনা করেছিলেন। বড় বাংলা কথাটা নিজেদের বড় ভাববার বাসনার সঙ্গেও যুক্ত বলা যায়।

পূর্ব বাংলার জমিদারি এবং বাজার ব্যবস্থার ওপর গড়ে ওঠা কলকাতা শহরে আধুনিক বাংলা সাহিত্য গড়ে ওঠে। ‘সাহিত্য’ ধারণার উদ্ভবও একই শতকে, বিশেষ ভাবে উনিশ শতকে। অন্যদিকে খ্রিস্টান পাদ্রিদের ধর্মান্তঃকরণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য খ্রিস্টিয় সুসমাচার জাতীয় সাহিত্য স্থানীয় ভাষায় প্রচারের তাগিদে ছাপাখানার আমদানি এবং বইয়ের বাজার গড়ে ওঠে। সবই একই সূত্রে ‘সাহিত্য’ নামক ধারণার অন্তর্গত। একই ইতিহাস ‘বাঙালি’ নামক ধারণাটিরও ঐতিহাসিক উদয় ঘটাবার বাস্তব শর্ত। এটাও মনে রাখা দরকার, আগেই উল্লেখ করেছি, ‘বাঙালি’ ধারণার মধ্যে বাংলাভাষী ‘মুসলমান’ বিস্ময়কর ভাবে শুরু থেকেই অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতির সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিণতি আছে। তাহলে বুঝতে হবে ‘সাহিত্য’ মানে স্রেফ লেখালিখি না।

এই দিকটা গোড়াতেই সাফ করা দরকার। জাতি হিশাবে ‘বাঙালি’ নামক কল্পনা তৈরির বাস্তব ভিত্তি আধুনিক বাংলা সাহিত্য। ‘বাঙালি’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। এই গ্রন্থির জট ছাড়ালে আমরা দেখব আমরা ইতিহাসের তৈরি পদার্থ, তথাকথিত ‘আবহমান’ কিম্বা চিরায়ত কোনো সত্তা না। আমরা অতীতে যা হয়েছি, বর্তমানে সেটা আর নই। আগামিতেও একই প্রকার থাকব না। বাংলাভাষী এখন নিজেদের খণ্ড খণ্ড কল্পনা করতে ও ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আগামিতে তার বিকাশ নাকি বিলয় ঘটবে তাও এখন আমরা হলফ করে বলতে পারি না। বাংলা সাহিত্য এবং তার চর্চা এই বিখণ্ডীভবন ও বিলয় প্রবণতা এড়িয়ে আরও বড় বা বৃহৎ পরিসরে বাংলা ভাষীদের কল্পনা করবার শক্তি জোগাতে পারে কিনা সেটা একালে বৃহৎ একটা চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে আমরা মনে করি। ‘প্রতিপক্ষ’ এই চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে সাহিত্য চর্চায় এসেছে। তাই সাহিত্য বলতে আমরা নিজেরা কি বুঝেছি, সেটা পেশ করে রাখা দরকার।

 

ফরহাদ মজহার

“বাংলা ভাষায় ‘সাহিত্য’ ধারণা যে মূলে ইংরেজি ‘লিটারেচার’-এর অনুবাদ নয়, সেটা বুঝে নেওয়া জরুরী। প্রাথমিক কাজ হচ্ছে বাংলা ভাষায় ‘সাহিত্য’ সংক্রান্ত ধারণা ও অন্যান্য বিবেচনা সম্পর্কে আমাদের বোঝাবুঝি যথাসম্ভব হালনাগাদ করে তোলা। কোনো নতুন সাহিত্যতত্ত্ব বানাবার দায় মাথায় নিয়ে এই পুনর্পাঠ নয়। বরং সাহিত্যের যে তত্ত্ব বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মজুদ রয়েছে তার সঙ্গে পরিচয় নিবিড় করা প্রাথমিক কাজ। তাই ‘সাহিত্য’ ব্যাপারটা আসলে কী এবং সাহিত্য চর্চা করতে চাইলে গোড়ার জিজ্ঞাসাগুলো কেমন ছিল, সেই সব ভুলে না গিয়ে আবার স্মরণে আনা দরকার। এরপরের কাজ হচ্ছে টেকনিক বা টেকনলজির যুগে নতুন ভাবে সাহিত্য ধারণাকে ছেঁচে তোলা। টেকনিক, টেকনলজি বা কৃৎকৌশলের বিচারকে সাহিত্য বিচারের অন্তর্গত করা না গেলে সাহিত্য চর্চার নতুন ক্ষেত্র বা দিগন্ত আরও পরিচ্ছন্নভাবে আমাদের চোখে ধরা পড়বে না। আমরা পুরানা কাসুন্দি ঘাঁটতে থাকব। পাশাপাশি টেকনলজি কিভাবে আমাদের ইন্দ্রিয় অভ্যাস বদলে দেয়, দিয়েছে এবং দিচ্ছে সেই সবের অনিবার্য পরিণতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলে আমরা বুঝব কিভাবে আমরা বদলে গিয়েছি এবং বদলে যাচ্ছি…”

যখন আমরা নতুন করে ‘বড় বাংলার সাহিত্য’ হিশাবে বের করতে শুরু করি তখন একটা প্রশ্ন আমাদের মোকাবিলা করতে হয়। সেটা হলো, ‘বড় বাংলা’ বলার পেছনে আমাদের কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কিনা। সঙ্গত প্রশ্ন। যথা, দুই বাংলা একত্রীকরণ জাতীয় চিন্তা। এর সহজ ও সরল উত্তর, না।

তবে এই প্রকার প্রশ্ন এবং উত্তর দুটোই আসলে অর্থহীন। ‘উদ্দেশ্য’ মানে কোন একটা আগাম তৈরি আইডিয়া বা চিন্তা মাথায় রেখে বাস্তবায়নের মামলা। এরককম কোনো আগাম বানানো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ‘প্রতিপক্ষ’ ওয়েবজিনের নাই। দ্বিতীয়ত, উপমহাদেশের দুই বৃহৎ সম্প্রদায় মুসলমান ও হিন্দুর মধ্যে পরস্পরকে বোঝা ও জানার প্রকট অভাব রয়েছে। চাইলেই হিন্দু-মুসলমানে রাতারাতি ভাব হয়ে যাবে না। তার বিস্তর কারন আছে। কয়েকটি বলছি:

আধুনিক জাতিবাদ, ধর্মকে স্রেফ পরিচয়বাদে পর্যবসিত করেছে। ধর্মীয় পরিচয় ধর্মীয় জাতিবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাকেই প্রশ্রয় দেয়। পরস্পরের মধ্যে বিভেদ জারি থাকার কারণও প্রধানত এই পরিচয়বাদী আধুনিক জাতিবাদে। ফলে ধর্মের পর্যালোচনা বা ধর্মের মধ্য দিয়ে ভাষা, কল্পনা, চিন্তা, ইচ্ছা, বাসনার বিকাশও রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। বড় বাংলার ভক্তি আন্দোলন, সুফি-বয়াতি ধারাসহ অপরাপর লৌকিক চর্চার মধ্যে আমরা টের পাই গুরুতর বহু মানবিক জিজ্ঞাসা বিভিন্ন পুরান, নবী-রসুলদের কেচ্ছা, লৌকিক কাহিনী এমনকি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে তোলা হয়েছে। সাহিত্য, ভাব, দর্শন বা চিন্তার দিক থেকে যাদের মূল্য অপরিসীম। কিন্তু ঔপনিবেশিকতা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে, তেমনি পাশ্চাত্যের আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের অনুকরণ করতে গিয়ে ‘আধুনিকতার’ তোড়ে নিজেদের জিজ্ঞাসা ভুলে গিয়েছি। দূরত্ব আরও বেড়েছে। এরপর রয়েছে অর্থনৈতিক কারন। পুঁজিতান্ত্রিক অসম উন্নয়ন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কারনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এককালের বৃহৎ বাংলার মধ্যে বিস্তর অদল বদল ঘটিয়েছে। ফলে দুই বাংলার একত্রীকরণ এখন অবাস্তব ধারণা, বড় জোর রোমান্টিক অভিক্ষেপ মাত্র। তবে পশ্চিম বাংলায় আমরা সম্প্রতি একদিকে ‘জয় শ্রীরাম’ আর তার বিপরীতে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান শুনছি। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে আমাদের পুলকিত হবার কিছু নাই। প্রথমত এই শ্লোগান স্থানীয় ভোটের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিম বাংলার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির দিকে তাকালে বোঝা যায় উচ্চ বর্ণের হাতে তৈরি ‘বাঙালি’ ধারণার বিশেষ হেরফের হয় নি। এই ধারণার মধ্যে ঔপনিবেশিক আমলের মতো মুসলমান বাঙালি অনুপস্থিত। হিন্দু-মুসলমানসহ সবাইকে নিয়ে ‘বড় বাংলা’র কল্পনা অনেক দূরের ব্যাপার। অন্যদিকে ভারত হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং বাংলাদেশের প্রতি দিল্লীর নীতির কারণে বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা প্রবল হয়েছে। ফলে দুইবাংলা একত্রীকরণ জাতীয় কোন রোমান্টিক উৎকল্পনার জায়গা নাই বললেই চলে।

আমাদের ইতিহাস বোধের বড়ই অভাব। তদুপরি, বাঙালি বড়ই রোমান্টিক প্রাণী! তাই আমামদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্নে আমরা বেশ আমোদ বোধ করেছি ! প্রশ্নের তোড় দেখে বুঝে যাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী – দুনিয়ার যেখানেই থাকুক – এখনও বাস্তবতা এবং রোমান্টিকতার ভেদ বুঝতে অক্ষম। রোমান্টিকতা খারাপ কিছু না। কিন্তু রোমান্টিকেরও মাটিতে ও ইতিহাসে পা রেখে বাস্তবিক হতে হয়।

কিন্তু নিজেদের বাসনা সম্পর্কে এই উত্তর শেষাবধি অর্থহীন। কোন কাজই রাজনীতি বা রাজনৈতিকতার বাইরে নয়। আরও নয় যদি সেই কাজ বা চর্চার বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমাদের কল্পনা, স্মৃতি, চেতনা ও চিন্তাকে রূপ দেবার সামর্থ রাখে, আমাদের ইচ্ছা ও সংকল্পে রূপান্তর আনে। রূপান্তরের ফল রাজনীতিতে পড়ে। সেই দিক থেকে সাহিত্য চর্চা রাজনীতি বা রাজনৈতিকতারই চর্চা। সাহিত্য ক্ষমতার বিন্যাস কিংবা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে। কখনও পরোক্ষ ভাবে, কখনও প্রত্যক্ষ ভাবে। সাহিত্য চর্চা বিপজ্জনক কাজ। বিদ্যমান, অনুমান, কল্পনা, চিন্তাচেতনা ও ক্ষমতার ভারসাম্য ছারখার করে দেবার ক্ষমতা সাহিত্যের আছে। একদিকে সাহিত্য চর্চা ক্ষমতা চর্চা কিংবা রাজনীতি থেকে আলাদা। কিন্তু অপরদিকে তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন কোন পরিসর নয়। আদতে যাহা বাহান্ন তাহাই তেপ্পান্ন।

সাহিত্য রাজনীতির বাইরের কিছু না। কিন্তু আমাদের কাছে ‘বড় বাংলা’ একান্তই সাহিত্যোচিত ধারণা। এই অর্থে যে সাহিত্য চর্চাই আমাদের উদ্দেশ্য। এটা কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প না। অর্থাৎ বিশেষ কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমরা ‘বড় বাংলা’ কথাটা প্রচার করছি না। বরং নিজেদের নিয়ে সংকীর্ণ বৃত্তের মধ্যে ভাববার অভ্যাস থেকে আমরা মুক্ত হতে চাইছি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চাকে তাদের ভৌগলিক ও রাজনৈতিক সীমা বা বৃত্ত থেকে আমরা মুক্ত রাখতে চাই। আমরা এতোটুকুই দাবি করি যে ‘বাংলাভাষী’ হিশাবে আমাদের কিছু সাধারণ স্বার্থ আছে, বাংলা সাহিত্যের বিকাশ সেই সাধারণ লক্ষ্যের অন্তর্গত। তাই ভূগোল ও রাজনৈতিক বৃত্তে বন্দী না থেকে আমরা নিজেদের আরও বড় পরিসরে ভাবতে চাই। আরও বড় পরিসরে অন্য আরও অনেকের সঙ্গে যুক্ত থাকা বা যুক্ত হওয়াই আমাদের বাসনা। সাহিত্য ব্যাপারটাই তাই। অপরের ‘সহিত’ যুক্ত হওয়া এবং বিরাজ করবার বাসনা। সাহিত্য সেই বিরাজমানতার শর্ত তৈরি করে।

কথাটা আমরা বলছি বটে, কিন্তু সেটা ব্যাখ্যার দাবি করে। স্বীকার করি ‘সাহিত্য’ কথাটা আমাদের আবার নতুন ভাবে বোঝা এবং অন্যদের বোঝাবার একটা দায় তৈরি হয়েছে। সেটা শুরুতে কিভাবে করা যায়, তা নিয়ে আমরা ভেবেছি। এই নিবন্ধটি সেই ভাবনারই ফল। ‘প্রতিপক্ষ’ সাহিত্য’ বলতে কী বোঝে, এখানে তা নিয়ে কথা বলব।

আমাদের মনে হয়েছে ‘সাহিত্য’ নিয়ে আলোচনা আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাংলা জাতীয় সাহিত্য’ রচনাটি আরেকবার পড়ার মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করতে পারি। শুরুতে এখানে প্রবন্ধটি নতুন করেপড়ার কাজটাই আমরা করব। লেখাটির সঙ্গে প্রাথমিক পরিচিতিমূলক কাজটা হয়ে গেলে তথাকথিত ‘মিডিয়া’ বা মাধ্যমের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক বিচারে আমরা মনোযোগী হব। যেমন, ছাপাখানা। এরপর, ফটোগ্রাফি, সিনেমা, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, ইত্যাদি।

ছাপাখানা, বাজার ব্যবস্থা , প্রমিত ভাষা ইত্যাদি মিলে যে সমপ্রকৃতি ও সমরূপের ‘বাঙালি’ নামক কল্পনা ঔপনিবেশিকতার ঔরসে বর্ণ হিন্দু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, সেই নির্মাণে মুসলমান বাঙালি অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এবং তার অনিবার্য রাজনৈতিক পরিণতির আলোকে বিচার করা জরুরী। শুধু নিজেদের ঐতিহাসিক ভাবে বোঝার জন্য নয়, সাহিত্যের শক্তি সম্বন্ধে আমাদের আত্মবিশ্বাস আবার দৃঢ় করবার জন্য। সংকীর্ণ ও সাম্প্রদায়িক হলেও যদি বাংলা সাহিত্য আমাদের ‘বাঙালি’ হিশাবে ভাবতে শিখিয়েছে, তাহলে সাহিত্য নিজগুণে সেই সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি চাইবে, এটা আশা করা যায়। তাই আমরা মনে করি বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক ত্রুটি সাহিত্য নিজেই আবার মীমাংসা করবার পথ ও প্রকরণ প্রদর্শন করতে সক্ষম। সাহিত্য আমামদের ‘বড়’ বা ‘বৃহৎ’ করবে। হয়তো দীনেশ্চন্দ্র সেন এই বাসনা মনে রেখেই ‘বৃহৎ বাংলা’ রচনা করেছিলেন। বড় বাংলা কথাটা নিজেদের বড় ভাববার বাসনার সঙ্গেও যুক্ত বলা যায়।

পূর্ব বাংলার জমিদারি এবং বাজার ব্যবস্থার ওপর গড়ে ওঠা কলকাতা শহরে আধুনিক বাংলা সাহিত্য গড়ে ওঠে। ‘সাহিত্য’ ধারণার উদ্ভবও একই শতকে, বিশেষ ভাবে উনিশ শতকে। অন্যদিকে খ্রিস্টান পাদ্রিদের ধর্মান্তঃকরণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য খ্রিস্টিয় সুসমাচার জাতীয় সাহিত্য স্থানীয় ভাষায় প্রচারের তাগিদে ছাপাখানার আমদানি এবং বইয়ের বাজার গড়ে ওঠে। সবই একই সূত্রে ‘সাহিত্য’ নামক ধারণার অন্তর্গত। একই ইতিহাস ‘বাঙালি’ নামক ধারণাটিরও ঐতিহাসিক উদয় ঘটাবার বাস্তব শর্ত। এটাও মনে রাখা দরকার, আগেই উল্লেখ করেছি, ‘বাঙালি’ ধারণার মধ্যে বাংলাভাষী ‘মুসলমান’ বিস্ময়কর ভাবে শুরু থেকেই অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতির সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিণতি আছে। তাহলে বুঝতে হবে ‘সাহিত্য’ মানে স্রেফ লেখালিখি না।

এই দিকটা গোড়াতেই সাফ করা দরকার। জাতি হিশাবে ‘বাঙালি’ নামক কল্পনা তৈরির বাস্তব ভিত্তি আধুনিক বাংলা সাহিত্য। ‘বাঙালি’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। এই গ্রন্থির জট ছাড়ালে আমরা দেখব আমরা ইতিহাসের তৈরি পদার্থ, তথাকথিত ‘আবহমান’ কিম্বা চিরায়ত কোনো সত্তা না। আমরা অতীতে যা হয়েছি, বর্তমানে সেটা আর নই। আগামিতেও একই প্রকার থাকব না। বাংলাভাষী এখন নিজেদের খণ্ড খণ্ড কল্পনা করতে ও ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আগামিতে তার বিকাশ নাকি বিলয় ঘটবে তাও এখন আমরা হলফ করে বলতে পারি না। বাংলা সাহিত্য এবং তার চর্চা এই বিখণ্ডীভবন ও বিলয় প্রবণতা এড়িয়ে আরও বড় বা বৃহৎ পরিসরে বাংলা ভাষীদের কল্পনা করবার শক্তি জোগাতে পারে কিনা সেটা একালে বৃহৎ একটা চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে আমরা মনে করি। ‘প্রতিপক্ষ’ এই চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে সাহিত্য চর্চায় এসেছে। তাই সাহিত্য বলতে আমরা নিজেরা কি বুঝেছি, সেটা পেশ করে রাখা দরকার।