ভ্যলেন্টইনা ত্রপুরা: পার্বত্য জেলাগুলোতে আদিবাসী হিসেবে ১২টি ভাষাভাষী ১৩টি পাহাড়ি আদিবাসী জুম্ম জাতির জনগোষ্ঠীদের ইসলামী জিহাদী মৌলবাদী ধর্ম তথা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণ থেকেই কোন দেশটি বাঁচাবে বা রক্ষা করবে, আমেরিকার, ইসরায়েল নাকি ভারত? বিনামূল্যে শিক্ষা নিতে গিয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণের শিকার হচ্ছে বান্দরবানের আদিবাসী ম্রো এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিশু-কিশোররা। অভিভাবকদের অজ্ঞাতে বদলে ফেলা হচ্ছে শিশুদের নামও।
এই অভিযোগটি স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা ও সহায়তার সুযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন সম্পর্কিত নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। কিছু অভিভাবক মনে করেন, তাদের অজান্তে শিশুদের পরিচয়ে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যা তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের একটি অংশ নিয়ে পূর্ব তিমুরের মতো খ্রিষ্টান দেশ বানানোর চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২৩মে প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবন গণভবনে ১৪ দলীয় জোটের এক বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার যুদ্ধ ঘরে-বাইরে সব জায়গায়। চক্রান্ত এখনও আছে। পূর্ব তিমুরের (ইন্দোনেশিয়া ভেঙে গড়ে ওঠা) মত বাংলাদেশের একটি অংশ নিয়ে… তারপরে চট্টগ্রাম, মিয়ানমার এখানে একটা খ্রিষ্টান দেশ বানাবে।’
এই বক্তব্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক উদ্বেগকে নির্দেশ করে। এখানে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও উঠে আসে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য সাধারণত সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং কৌশলগত আশঙ্কার ভিত্তিতে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের রাখাইন নিয়ে একটি খ্রিষ্টান রাষ্ট্র করার চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ করেছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশিন চ্যানেলের টকশো অনুষ্ঠানে এমন অভিযোগ করেন তিনি। এই ধরনের বক্তব্য জনমনে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কেউ এটিকে রাজনৈতিক সতর্কতা হিসেবে দেখেন, আবার কেউ এটিকে অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি সংবেদনশীল ও বহুমাত্রিক অঞ্চল, যেখানে শত শত বছর ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠী—চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খেয়াং, ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, রাখাইন প্রভৃতি—নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে বসবাস করে আসছে। তাদের অনেকে বৌদ্ধ, অনেকে সনাতন ধর্মাবলম্বী, কেউ কেউ খ্রিস্টান এবং কেউ কেউ নিজস্ব আদি ধর্ম—যেমন ম্রোদের ‘ক্রামা’ ধর্মে বিশ্বাসী। এই বৈচিত্র্যই পার্বত্য চট্টগ্রামের আত্মপরিচয় এবং অস্তিত্বের মূল ভিত্তি।
এই বৈচিত্র্য অঞ্চলটির সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে এই সহাবস্থানে নানা ধরণের ষড়যন্ত্র এবং ধর্মীয় আগ্রাসনের আলামত পরিলক্ষিত হচ্ছে। গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক এক উস্কানিমূলক বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামকে খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র চলছে বলে তকমা দিয়েছেন।
অথচ প্রকৃত তথ্য বলছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে মসজিদের সংখ্যা বর্তমানে ৩,৭৬৩টি, যার মধ্যে বান্দরবানে ২,০৭০টি, রাঙামাটিতে ১,০৫৯টি এবং খাগড়াছড়িতে ৬৩৪টি। বিপরীতে গীর্জার সংখ্যা মাত্র ৩০৪টি—খাগড়াছড়িতে ২৬৬টি, রাঙামাটিতে ১৬টি এবং বান্দরবানে ২২টি (সূত্র: সরকারি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রকাশিত পরিসংখ্যান, ২০২৪)। এই পরিসংখ্যান অঞ্চলটির ধর্মীয় অবকাঠামোর বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তবে শুধুমাত্র সংখ্যা দিয়ে সামাজিক বাস্তবতা সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না, কারণ সামাজিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব আরও গভীর ও জটিল।
এই সংখ্যাগত পার্থক্য থেকেই স্পষ্ট যে পার্বত্য চট্টগ্রামে মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই অনেক বেশি এবং শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাহলে কোন যুক্তিতে এই অঞ্চলকে ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ বানানোর ষড়যন্ত্র বলা হচ্ছে? এটি আসলে একধরনের প্রোপাগান্ডা, যার উদ্দেশ্য পাহাড়িদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো, ধর্মীয় বিদ্বেষ উসকে দেওয়া এবং মূলত মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরের এক পরোক্ষ প্রচার চালানো। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষণা (যেমন, আইএনজি ও এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের রিপোর্ট) দেখিয়েছে, বিগত এক দশকে পার্বত্য এলাকায় পরিকল্পিতভাবে পাহাড়িদের জমি অধিগ্রহণ, সেনা ক্যাম্প স্থাপন, সেটলারদের পুনর্বাসন ও ধর্মান্তর কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। অনেক স্থানে মাদ্রাসা স্থাপন, জোর করে ধর্মান্তর, শিক্ষা ও খাদ্য সহায়তার মাধ্যমে ধর্ম বদলের কৌশল চালানো হয়েছে। বিশেষ করে অনগ্রসর ও দরিদ্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাঝে আর্থিক অনুদান, চাকরির প্রলোভন, এমনকি ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্মান্তরের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
এই অংশে স্থানীয় সমাজের পরিবর্তন, উন্নয়ন প্রকল্প এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ একে উন্নয়ন হিসেবে দেখেন, আবার কেউ সাংস্কৃতিক চাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এই প্রক্রিয়াটি শুধু ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত। পাহাড়কে এক সময় বলা হতো জাতিগত সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু আজ সেই পাহাড়েই আদিবাসীদের অস্তিত্ব, ধর্ম, সংস্কৃতি সবকিছু হুমকির মুখে। এমনকি কেউ কেউ মনে করেন, ধর্মান্তরের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় রূপান্তর করার বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ তকমা প্রয়োগ করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে ধর্মীয় পরিচয়ের অজুহাতে জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ বৈধভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়।
এই ধারণা বিভিন্ন মহলে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং এটি নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যা বিদ্যমান। সুতরাং পাহাড়কে খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে—এই কথাটি শুধু মিথ্যা নয়, বরং এর মাধ্যমে প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়াল করে পাহাড়িদের মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কৌশলকেই ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। এটি শুধু পাহাড়ের জন্য নয়, সমগ্র বাংলাদেশের বহুত্ববাদী চেতনার জন্য এক গভীর হুমকি। এই প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এখন সময়ের দাবি। কারণ পাহাড়ের বৈচিত্র্য মানেই বাংলাদেশের বৈচিত্র্য, এবং সেটিকে ধ্বংস করে নয়, রক্ষা করেই জাতি হিসেবে আমাদের এগোতে হবে। এই অংশে মূলত একটি মতামত প্রকাশ করা হয়েছে, যা জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে।
সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও স্থানীয় সূত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের লামা ও আলীকদম উপজেলার দুর্গম এলাকায় বসবাসরত ম্রো ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে কিছু অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে বলা হচ্ছে, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রমের নামে আর্থিকভাবে দুর্বল আদিবাসী পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করা হচ্ছে। স্থানীয় অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধিদের দাবি অনুযায়ী, এসব কার্যক্রমে শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় রূপান্তরের বিষয় জড়িত থাকতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
কিছু অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের মাদ্রাসা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার পর তাদের পোশাক ও নাম পরিবর্তনের মতো বিষয়েও প্রভাবিত করা হতে পারে। তবে এসব দাবি এখনো বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিতর্কিত এবং স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
স্থানীয় আদিবাসী প্রতিনিধিরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, যদি এ ধরনের কার্যক্রম সত্যি হয়ে থাকে এবং তা নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ না করা হয়, তাহলে পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সামাজিক অস্তিত্বের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে তারা বিষয়টির স্বচ্ছ তদন্ত ও সামাজিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে বাস্তব পরিস্থিতি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় এবং সব পক্ষের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
লেখিকাঃ ভ্যলেন্টইনা ত্রপুরা,আদিবাসী তরুণ কলাম লেখক
Post Views: 59




