পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসী ও শরণার্থীদের অস্বাভাবিক সংখ্যায় আগমনের প্রেক্ষাপটে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের এল হিয়েরো দ্বীপে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দ্রুত সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে। প্রায় ১১ হাজার ৪০০ মানুষের বসবাসের এই ছোট দ্বীপে চলতি নভেম্বর মাসের প্রথম কয়েক দিনেই পৌঁছান ৩ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি অভিবাসী, যার ফলে তীব্র আবাসন ও চিকিৎসাসংকট তৈরি হয়েছে।
দ্বীপটির পরিচালনা পরিষদের প্রধান আলপিদিও আরমাস স্পেনের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, অতি অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর আগমনে স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে। উচ্চপর্যায়ের সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সহায়তার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরির লক্ষ্যেই এই জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, নতুন আসা মানুষদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হলেও দ্বীপটির একমাত্র হাসপাতালের পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেছে। নভেম্বরের শুরু থেকে প্রায় ৩০টি বড় নৌকায় করে এসব মানুষ দ্বীপে এসে উপস্থিত হন।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের আঞ্চলিক সরকারের প্রধান ফার্নান্দো ক্লাভিহো এই সার্বিক অবস্থাকে ‘সম্পূর্ণ অসহনীয়’ বলে বর্ণনা করেছেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে রেকর্ডসংখ্যক অভিবাসী আগমনের যে হার দেখা গিয়েছিল, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে এবং কোনো কোনো দিন আগের সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গণপরিবহনের বাসগুলোকে অভিবাসীদের স্থানান্তরের কাজে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে অন্যান্য দ্বীপ থেকে অতিরিক্ত চিকিৎসাকর্মী এনে এল হিয়েরোতে মোতায়েন করা হচ্ছে।
এদিকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের সামুদ্রিক উদ্ধার পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, কেবল নভেম্বরের প্রথম ছয় দিনেই দ্বীপপুঞ্জের উপকূলীয় জলসীমা থেকে ৩ হাজার ২৬১ জন অভিবাসী ও শরণার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর এই পথটি বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী অভিবাসন রুট হিসেবে পরিচিত। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহেই ক্যানারি অভিমুখে যাত্রা করা একটি নৌকা থেকে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও পাঁচজনের সাগরে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই সামুদ্রিক অঞ্চলে অন্তত ৯ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে।
২০২৪ সালে সমুদ্রপথে রেকর্ড ৪৬ হাজারেরও বেশি অভিবাসী ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর পর সমুদ্রসীমায় নজরদারি ও উৎস দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ টহল বাড়ানোর ফলে আগমনের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কমেছিল। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১৩ হাজার ৩২৭ জন অনিয়মিত অভিবাসী সমুদ্রপথে দেশটিতে পৌঁছান, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম। তবে সেনেগাল, মৌরিতানিয়া ও মরক্কো উপকূলে কঠোর নজরদারির কারণে মানবপাচারকারীরা এখন তাদের পথ বদলে গাম্বিয়া, গিনি-বিসাউ ও গিনি থেকে অতিরিক্ত দূরত্বের বিপজ্জনক রুট ব্যবহার করছে, যা সমুদ্রযাত্রার সময় ও প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে সেনেগাল পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানী ডাকারের উপকূল থেকে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৪২ জন অভিবাসীকে ইউরোপযাত্রার আগেই আটক করা হয়েছে।




