টানা পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা-বিআইডব্লিউটিসি। গত রোববার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকেই সংস্থাটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর ফলে তাদের সরকারি ঋণের দায় পরিশোধের সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে একটি সরকারি ও ৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৬০৮টি নৌযানের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল এই সংস্থা। তাদের মূল দায়িত্ব ছিল নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলে নৌযান পরিচালনা এবং দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থাকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ রুটে ফেরি সার্ভিস পরিচালনা করা। এছাড়া তাদের জাহাজ মেরামত বা শিপ রিপেয়ার সার্ভিস ইউনিটও রয়েছে।
একসময় লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই সংস্থাটি ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ২১ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। তবে এরপর থেকে আর লাভের মুখ দেখেনি তারা। বিশেষ করে ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংস্থাটির আয়ের অন্যতম বড় একটি উৎস বন্ধ হয়ে যায়। এর বাইরেও আরও কিছু ফেরি সার্ভিসে আয় কমেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটির আয় ছিল ৪৩৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং ব্যয় ৪৪০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, যার ফলে লোকসান হয় ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। পরের অর্থবছর ২০২২-২৩-এ আয় কমে ৩৬০ কোটি টাকায় নেমে আসে এবং ব্যয় ছিল ৪০০ কোটি ১০ লাখ টাকা, ফলে লোকসান হয় ৩৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় আরও কমে দাঁড়ায় ৩২৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকায় এবং ব্যয় হয় ৩৬৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, এতে লোকসান হয় ৪২ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ৩১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ব্যয় ৩৪৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যেখানে লোকসান হয় ২৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত অনিরীক্ষিত হিসাবে আয় হয়েছে ৩২৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ব্যয় ৩৫২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, এতে লোকসান হয়েছে ২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে সংস্থাটির মোট লোকসানের পরিমাণ ১৩৭ কোটি টাকার বেশি।
বর্তমানে সরকারের কাছে বিআইডব্লিউটিসির ৭১৭ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে এবং এই ঋণের বিপরীতে প্রতিবছর ১৫ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের দায় (ডিএসএল) হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। সংস্থাটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন ফেরি রুটে ১ কোটি ১৬ লাখের বেশি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এর মধ্যে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুট থেকে আয় হয়েছে ৮৮১ কোটি ১৩ লাখ টাকা, আরিচা-কাজিরহাট রুট থেকে ১৪৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, চাঁদপুর-শরীয়তপুর রুট থেকে ১৫৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা, ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুট থেকে ১০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং লাহারহাট-ভেদুরিয়া রুট থেকে ১২৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা আয় হয়েছে।
লোকসান কমাতে সংস্থাটি নতুন রুট চালুর পাশাপাশি ১৫টি প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর অংশ হিসেবে গত ৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে ভোলার ইলিশা পর্যন্ত ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এছাড়া সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী নৌযান এমভি বাঙালি, এমভি রূপসা, এমভি মধুমতি ও এমভি সুগন্ধাকে ভাসমান হাসপাতালে রূপান্তরের এবং এমভি সোনারগাঁওকে ভাসমান রেস্তোরাঁ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চারটি ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমারের মধ্যে বর্তমানে একটি সচল রয়েছে।
সংসদীয় কমিটির সদস্যদের মতে, পদ্মা সেতু চালুর ফলে আয় কমলেও লোকসানের পেছনে কেবল এটিই একমাত্র কারণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংসদীয় কমিটির সভাপতি জয়নুল আবদিন ফারুক জানিয়েছেন, বিআইডব্লিউটিসি ও অন্যান্য লোকসানি সংস্থার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিমকে আহ্বায়ক করে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে, যা দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। এছাড়া বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান সলিম উল্লাহসহ ৪ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাগুলোর ১৮০ দিনের কার্যক্রম এবং বিআইডব্লিটিসিসহ যেসব সংস্থা লোকসানে আছে, কেন সেগুলোর লোকসান হচ্ছে, এ বিষয়ে করণীয় কী, এসব দেখতে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে।




