সরকারি কাজের দরপত্রে নতুন উদ্যোক্তা ও ছোট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ সহজ করতে এবং ঠিকাদার নির্বাচনের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে তৈরি করা হয়েছে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বড় বার্ষিক লেনদেন কিংবা পূর্বে বড় কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকলেও যাতে নতুনরা বাদ না পড়েন, সেই বিধান যুক্ত করা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে। খসড়াটি আজ সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উত্থাপিত হতে পারে। ১৩ পৃষ্ঠার এই খসড়ায় মোট ৩৬টি ধারা রয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) গত ২৯ অক্টোবর খসড়াটির ওপর সর্বসাধারণের মতামত আহ্বান করেছিল।
প্রস্তাবিত নতুন আইনে শুধু দীর্ঘ অভিজ্ঞতার অভাবকে অযোগ্যতা হিসেবে গণ্য না করার কথা বলা হলেও কাজের ধরন, ঝুঁকি ও জটিলতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শর্ত আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়, অপ্রয়োজনীয় শর্ত দিয়ে কাউকে প্রতিযোগিতার বাইরে রাখা যাবে না, তবে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ঠিকাদারকে প্রদর্শন করতে হবে। নতুন আইনের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নারী উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ‘সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তি’ নামে একটি বিশেষ শ্রেণিকে সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। আইন কার্যকরের আগের সর্বোচ্চ ২০ বছরের মধ্যে বৈধ লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও প্রতিকূল পরিবেশ বা সুযোগের অভাবে যারা সরকারি ক্রয়ে অংশ নিতে পারেননি, তারা এই সুযোগবঞ্চিত শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হবেন। তবে তাদের উপযুক্ত প্রমাণ ও যাচাইয়ের মানদণ্ড পরবর্তী সময়ে বিধিমালার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
নতুন ও ছোট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এলাকাভিত্তিক তালিকা তৈরির নিয়ম বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। দেশের ভেতরের কেনাকাটায় একটি নির্ধারিত মূল্যসীমার মধ্যে এই তালিকাভুক্ত ঠিকাদার ও সেবাদানকারীদের কাছ থেকে সীমিত দরপত্র আহ্বান করা হবে। এই তালিকায় নতুনদের পাশাপাশি অন্যান্য দরপত্রদাতাও থাকবেন এবং তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ বণ্টন করা হবে। কারিগরি বা বিশেষায়িত কেনাকাটার ক্ষেত্রে কার্যালয়প্রধানের অনুমোদন নিয়ে এই তালিকার বাইরে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা যাবে। এ ছাড়া সীমিত দরপত্রের ক্ষেত্রে জামানত রাখার বিধান যুক্ত করার সুযোগ রাখা হলেও জামানতের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বা শর্ত বিধিতে নির্ধারণের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ঠিকাদার বাছাইয়ের প্রক্রিয়াতেও আনা হয়েছে বড় পরিবর্তন। দেশের ভেতরের নির্মাণকাজ ও ভৌত সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সর্বনিম্নে দরদাতা প্রতিষ্ঠানই কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবে না। প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, কারিগরি সক্ষমতা, কাজের মান ও স্থায়িত্বের জন্য ৮০ শতাংশ এবং প্রস্তাবিত দামের জন্য ২০ শতাংশ নম্বর বরাদ্দ থাকবে। প্রথমে কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন করে উত্তীর্ণদের আর্থিক প্রস্তাব খোলা হবে এবং উভয় অংশের নম্বর যোগ করে শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানকে কাজের জন্য সুপারিশ করা হবে। খসড়ায় উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, মানে ৮০-এর মধ্যে ৭২ ও দামে ২০-এর মধ্যে ১৬ পেয়ে মোট ৮৮ নম্বর পাওয়া প্রতিষ্ঠান কাজ পাবে, এমনকি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান দামে পূর্ণ ২০ পেলেও যদি মানে ৬৪ পায় তবে তার মোট নম্বর ৮৪ হওয়ায় সে পিছিয়ে পড়বে।
দরপত্র বাতিলের ক্ষেত্রে দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের সীমানাও কঠোর করা হচ্ছে। সরকারি দপ্তরের নির্ধারিত ব্যয়ের অনুমানের চেয়ে ১০ শতাংশের বেশি কিংবা ১০ শতাংশের কম দরপত্র দাখিল করা হলে তা সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে। যেমন ১০ কোটি টাকার কোনো কাজে ৯ কোটি টাকার নিচে কিংবা ১১ কোটি টাকার ওপরে দর দিলে সেই দরপত্র মূল্যায়নের বাইরে চলে যাবে। অতীতে এই ১০ শতাংশের সীমা থাকলেও ২০২৫ সালের সংস্কারে তা তুলে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে অস্বাভাবিক কম দর যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছিল। এবার পুনরায় সরাসরি বাতিলের প্রস্তাব রাখা হলো।
আগের নিয়মগুলোর ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বরের অধ্যাদেশের বেশ কিছু বিধান খসড়ায় বহাল রাখা হয়েছে। এর মধ্যে দেশে তৈরি পণ্যকে অগ্রাধিকার প্রদান, নির্দিষ্ট দেশীয় পণ্য কেনা বাধ্যতামূলক করার সরকারি ক্ষমতা এবং বিদেশী প্রতিষ্ঠানের জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ (জেভি) গঠনের শর্ত বহাল রয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতি, আঁতাত, জালিয়াতি বা কাজে ব্যর্থতার জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে অযোগ্য ঘোষণার আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং কাজ বুঝে নেওয়ার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের অবহেলার ক্ষেত্রে জবাবদিহির বিধানও বহাল রাখা হয়েছে। এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ গেজেটে প্রকাশিত হয়েছিল; নতুন খসড়ায় আগের সেই অধ্যাদেশটি রহিত করার প্রস্তাব রয়েছে।
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ক কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, বিদ্যমান কঠিন শর্তের কারণে ঘুরেফিরে পুরোনো ঠিকাদারেরাই কেবল কাজ পাচ্ছিলেন এবং নতুনদের পথ রুদ্ধ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি সব ধরনের ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণের পরিধি বাড়াতে আইন সংশোধনের সুপারিশ করেছে এবং এর ওপর ভিত্তি করে বিধিমালাও সংশোধন করা হবে। অন্য দিকে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ, বর্তমানে বিপিপিএ) সাবেক মহাপরিচালক মো. ফারুক হোসেন মন্তব্য করেছেন, দীর্ঘদিন কাজ না পাওয়াকে শুধু রাজনৈতিক বঞ্চনা না ভেবে দরপত্রের নিয়ম অনুসরণ ও সক্ষমতা প্রমাণের বিষয়টি দেখতে হবে। ই-জিপি ব্যবস্থার কারণে সরাসরি বাধা দেওয়ার সুযোগ কমেছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, নতুনদের সুযোগ দিতে গিয়ে যেন অন্যায্য সুবিধা বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি না হয়; কাজের মান ও সমান সুযোগ—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে বেশি মোট নম্বর পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করবে মূল্যায়ন কমিটি।সহজভাবে বিষয়টি বোঝাতে মোট নম্বর ১০০ ধরা যায়।




