দেশের শিল্প খাত ধীরে ধীরে সবুজ শক্তির দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের লক্ষ্যে রপ্তানিমুখী বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একই সঙ্গে শহরের ভবনের ছাদগুলো নবায়নযোগ্য শক্তির এক নতুন সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে উঠে আসছে। সঠিক নীতিমালা ও উপযুক্ত প্রণোদনা মিললে ছাদভিত্তিক এই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা জাতীয় গ্রিডের অন্যতম বড় উৎস হতে পারে। বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য শক্তির চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে বাংলাদেশেও এর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য শক্তি সংস্থার (আইআরইএনএ) তথ্য অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিক থেকে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান এখন পঞ্চম।
দেশের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে সরাসরি সৌরবিদ্যুৎ বিক্রির লক্ষ্যে প্রস্তাবিত কেন্দ্রগুলো থেকে বিএডিসি কোল্ড স্টোরেজ, কাজী কোল্ড স্টোরেজ, লাবিব গ্রুপ ও এশিয়াটিক গ্রুপের বিভিন্ন কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের বড় গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের প্রচুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে সহজ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি, স্বল্প সুদে অর্থায়ন এবং প্রয়োজনীয় কর ও শুল্ক ছাড়ের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। কানাডার উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে জানানো হয় যে, সরকার বিনিয়োগকারীদের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী শেখ আল আমিনের দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ৫০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ বিশ্বে সর্ববৃহৎ 'সোলার হোম সিস্টেম' কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে, যার মাধ্যমে গ্রামের ছয় মিলিয়নেরও বেশি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বসেরা সৌর প্যানেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান 'লংগি' বাংলাদেশে কার্যালয় স্থাপন ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানের আমন্ত্রণে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং দেশটির শীর্ষস্থানীয় সৌর প্যানেল নির্মাতারা বাংলাদেশ সফর করে বিনিয়োগ সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেন।
কৃষি খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। দেশে বোরো মৌসুমে প্রায় ২০ লাখ একর চাষযোগ্য জমিতে ১৬ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১৬ লাখ ৫০ হাজার সেচ পাম্প ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ১০ লাখ ৮০ হাজার থেকে ১১ লাখ সেচ পাম্প বিদ্যুৎচালিত এবং প্রায় ১১ লাখ ৫৮ হাজার ডিজেলচালিত। সারা দেশের এই সেচপাম্পগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনতে পারলে বছরে ৭৬০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এবং ৮০ থেকে ১০০ কোটি লিটার ডিজেল সাশ্রয় হবে। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের বার্ষিক ৮৫৩ থেকে ১,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি বাঁচবে। টানা ৩ থেকে ৪ বছর এই ভর্তুকির অর্থ সৌরবিদ্যুৎ খাতে ব্যয় করলে পরবর্তী ২০ থেকে ২৫ বছরের জন্য সরকারকে আর বড় অংকের ভর্তুকি দিতে হবে না। বাঁচানো এই অর্থ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে পুনর্নিয়োগ করা সম্ভব। রাজশাহীর কৃষি সমবায়ভিত্তিক সোলার সেচ প্রকল্প ইতোমধ্যেই কৃষকদের সেচ খরচ ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কমিয়ে এনে লাভজনক মডেল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানো সম্ভব। বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্নেল মোহাম্মদ আলীর গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে কমপক্ষে ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে ভবন মালিকেরা প্রতি মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারেন, যা আগে বিদ্যুৎ বিল হিসেবে পরিশোধ করতে হতো। ঢাকা শহরের প্রায় ৪ লাখ বাড়ির মধ্যে ২ থেকে আড়াই লাখ ভবন সৌর প্যানেল স্থাপনের উপযোগী, যেখান থেকে মোট ১,৪৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সিস্টেমেটিক লস বাদ দেওয়ার পরও ৭০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট মেলা সম্ভব। এছাড়া বিলবোর্ডগুলোতে সৌর প্যানেল বাধ্যতামূলক করা এবং আলোর ব্যবহারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত।
বর্তমানে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের কারণে জাতীয় গ্রিডে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যমতে, প্রতিদিন অন্তত ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জে ব্যয় হয়, যা মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি অটোরিকশা রয়েছে, যার মধ্যে কেবল ঢাকাতেই চলছে ২০ লাখ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। ভারতে সোলার চালিত তিন চাকার যান পরিচালনা ও চার্জিং স্টেশন চালুর ফলে খরচ অর্ধেকের বেশি কমে এসেছে। বাংলাদেশেও অটোরিকশাগুলোতে সোলার সিস্টেম বাধ্যতামূলক করলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি চালকদের পরিচালন ব্যয়ও অনেক কমবে।
উদ্যোক্তাদের হিসেব অনুযায়ী, গ্রামীণ পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হচ্ছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় প্যানেল আমদানিতে, ২৫ শতাংশ ব্যাটারিতে এবং ১৫ শতাংশ খুচরা যন্ত্রাংশে। ব্যাটারি ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ দেশে তৈরি হলেও প্যানেল উৎপাদনও এখন দেশে শুরু হচ্ছে, যা পুরোপুরি দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর হলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। সৌরবিদ্যুৎ খাতকে গতিশীল করতে চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সোলার প্যানেল বৃত্তি প্রদান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর, বাজার, খামার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সোলার নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি পৃথক সৌরবিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ৩৪০ দিন পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকে, যা বছরের দীর্ঘ সময় টেকসই পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহের দারুণ এক সুবর্ণ সুযোগ।
এস এম মুকুল : কৃষি-অর্থনীতি বিশ্লেষক ও কলাম লেখক, ফোনালাপ : ০১৫৫২৩৫৩৮৯২, ০১৭১২৩৪২৮৯৪




