বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণের বোঝা ক্রমাগত ভারী হচ্ছে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই বিশ্বজুড়ে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা মাথাপিছু হিসাবে প্রায় ৪৪ হাজার ডলার।
ঋণ নেয়ার তালিকায় সবার শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের সরকারি ঋণ ২২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। এছাড়া জাপানের ঋণ ৮.৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১৯৯ শতাংশ। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানির মতো বড় অর্থনীতিগুলোও বিশাল ঋণের চাপে রয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকারের ঋণ ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১০২ শতাংশ। এরপর রয়েছে ফ্রান্স, যার ঋণের পরিমাণ ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১১৮.৫ শতাংশ। এছাড়া ইতালির সরকারি ঋণ ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে জার্মানির সরকারি ঋণ ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও তা জিডিপির মাত্র ৬৫ শতাংশ। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪.৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১০ সালে ছিল ৪০.৯ বিলিয়ন ডলার। তবে অর্থনীতির আকার বিবেচনায় বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৪০ শতাংশ, যা অনেক উন্নত দেশের তুলনায় কম।
ঋণের এই পাহাড় শুধু বড় অংকের সংখ্যা নয়, বরং সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপ তৈরি করছে। গত এক বছরে উন্নত দেশগুলোকে সরকারি বন্ডের সুদ বাবদ ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। এই ব্যয় বিশ্বের সামরিক খাতের ৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয়ের চেয়েও বেশি।
ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বাজেট সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ফ্রান্সে ঋণ নেয়ার ব্যয় ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ইউরোজোনের ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য দেশটি প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে, কোনো বিনিয়োগকারী ১০০ ইউরো দিয়ে ১০ বছর মেয়াদি একটি সরকারি বন্ড কিনলে এবং সুদের হার ৫ শতাংশ হলে, তিনি মেয়াদ শেষে মূল ১০০ ইউরোসহ মোট ৫০ ইউরো সুদ পাবেন। জার্মানির ক্ষেত্রে এই সুদের হার ৩.৪১ শতাংশ। ঋণের এই ক্রমবর্ধমান চাপ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট ও মজুরি বৈষম্য নিয়ে জনরোষ তৈরি করছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে এসব ইস্যুতে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
সরকারগুলো সাধারণত বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে, যেখানে মেয়াদ শেষে মূলধনের পাশাপাশি নির্ধারিত হারে সুদ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি থাকে। কিন্তু ঋণের পরিমাণ ও সুদের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা সরকারি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ঋণ গ্রহণ কেবল অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম নয়, বরং তা পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখাও অর্থনীতির জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।




