বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ও সার্বিক নিরাপত্তার জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে এই নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন ধরে রাখতে তাকে বেশ কিছু জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। সামনে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক চাপ—এই তিন মূল ইস্যু তার জন্য বড় পরীক্ষার কারণ হতে পারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান। তার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে এটিই ছিল প্রথম দুর্গাপূজা। উৎসবটি নির্বিঘ্ন করতে সারা দেশে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এ বছর দেশজুড়ে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপ তৈরি হয়েছিল, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার বেশি। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ছিল ২৫৮টি মণ্ডপ। পূজা উপলক্ষে ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের সরকারি ছুটি এবং এর সঙ্গে ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হয়ে সরকারি চাকরিজীবীরা টানা পাঁচ দিনের ছুটি উপভোগ করেন।
উৎসবের নিরাপত্তা জোরদারে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বমোট ২ লাখ ১২ হাজার ১১৮ জন সদস্য পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ মণ্ডপগুলোতে ছয়জন এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে আটজন করে আনসার সদস্য রাখা হয়। পাশাপাশি যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছিল ১০৪টি স্ট্রাইকিং টিম। এ ছাড়া সীমান্ত এলাকার আট কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত প্রায় ১ হাজার ৮০০টি মণ্ডপের সুরক্ষায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ১৮টি বেইস ক্যাম্প স্থাপন করার পাশাপাশি বিশেষ টহল পরিচালনা করে।
নিরাপত্তা ও উৎসবের আমেজ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। ডেইলি ওয়াদার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিএনপি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় হিন্দু সম্প্রদায় কোনো বড় বাধা ছাড়াই উৎসব উদযাপন করতে পেরেছে বলে অভিমত দিয়েছেন লেখক, অধিকারকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, লেখক ও অধিকারকর্মী সাদিকুর রহমান খান এবং লেখক ফাহাম আবদুস সালাম আয়োজনের প্রশংসা করে বলেন, আগের বছরগুলোর ভয় ও অনিশ্চয়তা কেটে এবার পরিবেশ ছিল ভিন্ন। ইনফ্লুয়েন্সার ড্যানিয়েল আফজালুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, বাংলাদেশে এর আগে এত জাঁকজমকপূর্ণ ও প্রাণবন্ত পূজা উদযাপন তিনি দেখেননি।
কলকাতার সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার ও টেলিভিশন উপস্থাপক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষের একটি বক্তব্যও বেশ নজর কেড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সরব ছিলেন তিনি। তবে এবারের পূজার আয়োজন দেখে ফেসবুকে তিনি লেখেন, বাংলাদেশে দুর্গাপূজা এবার অসাধারণ হয়েছে। চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপের সৌন্দর্যে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি আরও মন্তব্য করেন, কলকাতার বিজয়ী মণ্ডপগুলোকে যারা পুরস্কৃত করে, তাদের উচিত চট্টগ্রামের মণ্ডপগুলোর জন্যও আলাদা ট্রফি কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দেওয়া।
উৎসব ঘিরে প্রশংসার প্লাবন থাকলেও দেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দুশ্চিন্তা পুরোপুরি লোপ পায়নি। উৎসব শুরুর আগেই চলতি অক্টোবর মাসে সারা দেশে পূজামণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা ও সহিংসতার অন্তত ৩৪টি ঘটনা ঘটে বলে তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি। সংগঠন দুটি সারা বছর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং মন্দিরে হামলা রোধে কার্যকর স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে হিন্দু অধিকারকর্মী জয়ন্ত কর্মকার দ্য প্রিন্ট-কে জানান, গ্রামপর্যায়ে একশ্রেণীর ইসলামপন্থী বক্তা ও হুজুরেরা এখনও প্রতিমা পূজার বিরোধিতা করে একে ‘হারাম’ বলছেন এবং মুসলমানদের এই আয়োজনে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, তারেক রহমান সরকার গঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার পরও হিন্দুদের ওপর বিক্ষিপ্ত হামলা বন্ধ হয়নি। কেবল জাঁকজমকপূর্ণ পূজার আয়োজন দিয়ে মাঠপর্যায়ের সংখ্যালঘু পরিস্থিতির মূল বদল ঘটেনি বলে দাবি করে তিনি হিন্দুবিদ্বেষী বক্তব্য প্রচারকারী ধর্মীয় বক্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান।




