*বিতর্কিত ইমারত পরিদর্শকদের রক্ষায় মরিয়া
নিজস্ব প্রতিবেদক: চউকে’র চাকরি প্রবিধানমালা ও নিয়োগ বিধি অনুযায়ী ইমারত পরিদর্শক পদে নিয়োগ দেওয়ার যোগ্যতা কমপক্ষে এইচএসসি পাস ও সার্ভে ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বাধ্যবাদকতা রয়েছে। কিন্তু অন্তবর্তী সরকারের আমলে চউকে’র কতিপয় অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজসে এসএসসি পাস সনদদারী প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তৎকালীন সময়ে এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে তাদের নিয়োগ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ডসভায় কিন্তু রহস্যজনক কারণে তারা এখনো বহাল রয়েছে।
সূত্র জানা গেছে, সিডিএ’র নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যদার জনৈক কর্মকর্তার অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ইমারত পরিদর্শকদের রক্ষা করতে ব্যাপক তদবীরে নেমেছে পলিটিকেল রং বদলানো অসৎ সিন্ডিকেটটি। বোর্ডসভায় নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত হলেও রহস্যজনক কারণে তা তারা লাল ফিতায় আটকে দিয়েছে। এসংক্রান্ত একটি নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে তাদের রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সিন্ডিকেটটি।
নিয়োগ বিধি ও সিডিএ’র প্রবিধানমালা পরিবর্তন করা হলেও এদের চাকুরী বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এ চক্রটি। আর এই কাজের জন্য মোটা অংকের তদবীরের মাধ্যমে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জামাতপন্থি সচিব নজরুল ইসলামকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছেন।
জানা যায়, ইন্টেরিম সরকারের আমলে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন তৎকালীন সচিব রবীন্দ্র চাকমা। এ বিজ্ঞপ্তির ১৭ নং কলামে ১৮ জন ’ইমারত পরিদর্শক’ নিয়োগের কথা বলা হয়। যেখানে প্রার্থীর যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং স্বীকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে সার্ভে ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞতা থাকলে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। প্রার্থীর বয়স হতে হবে সর্বোচ্চ ৩২ বছর। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এবারই প্রথম এই নিয়ম ভেঙে মাধ্যমিকে (এসএসসি) উত্তীর্ণ সার্ভেয়ারদের এই পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যে টিকে মারাত্মক দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবিষয়ে তৎ সময়ে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে নড়েচড়ে বসে সিডিএ প্রশাসন। চলতি বছরের ২ এপ্রিল এই বিতর্কিত নিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয় বোর্ডসভায়। সেখানে অনেকেরই চাহিতমতে শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ফলে এসএসসি পাস করে যোগদান করা ইমারত পরিদর্শকদের অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ডসভায়। কিন্তু এরপরই এই বিষয়ে সুরাহা করতে মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠায় সিডিএ। এই চিঠির সূত্র ধরে চলে তদবীর। এই নিয়োগকে বৈধতা দিতে ওই সিন্ডিকেটটি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, এমনকি প্রয়োজনে বিধি পরিবর্তন করার জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে বর্তমান সচিবকে। তবে নিয়োগ বিধি পরিবর্তন করলেও আগের নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা বৈধতা পাবেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল।
সিডিএ জাতীয়তাবাদী দল সিবিএ’র সভাপতি ফয়েজ আহম্মদ বলেন, ইমারত পরিদর্শক নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এটা সত্য। সিডিএ’র ইতিহাসে এর আগে এসএসসি পাসে কখনো ইমারত পরিদর্শক নিয়োগ হয়নি। শুধু তাই নয়, এদের নিয়োগ দিয়ে এমন কিছু কাজ করেছে যাতে তাদের আর বাতিল করতে না পারে। চাকরি স্থায়ী হওয়ার আগেই ট্রেনিং করিয়ে সনদ দেওয়া হয়েছে। যা আইনসম্মত নয়।
এবিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অর্থ ও প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা সদস্য (অতিরিক্ত সচিব) নুরুল্লা নুরী বলেন, আইনগত কোন ঘাটতি আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এর আগে তিনি বলেছিলেন, কোন প্রার্থীর চাহিত যোগ্যতা না থাকলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণেরই সুযোগ নেই। বাছাইয়ে বাদ পড়ার কথা, তারপরও যদি এমন কম যোগ্যতাসম্পন্ন কারো নিয়োগ হয়ে থাকে তবে বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখব। যাচাই বাছাই করে প্রয়োজনে তাদের নিয়োগ বাতিল করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বোর্ডসভায় নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তের পরও তিনিই(অতিরিক্ত সচিব নুরুল্লা নুরী) তাদের রক্ষা করতে চাইছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রটি জানিয়েছে।
সূত্রটি আরো জানায়, তিনি এখন সিডিএ’র সবচেয়ে সিনিয়ির ব্যক্তি। যেখানে চেয়ারম্যান যুগ্ন সচিব পদমর্যাদার সেখানে এই মেম্বার অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার। তাকে কোন বিধিবলে সিডিএতে পদায়ন কিভাবে হয়েছে তা রহস্যজনক। কারণ এত উচ্চ পদ-পদবী সিডিএ’র প্রবিধানমালাতে নেই। তাহলে কেন তিনি এ পদ আঁকড়ে রয়েছে?
সিডিএ’র ইমারত পরিদর্শক নিয়োগে অনিয়মের বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিলেন অনেক পরীক্ষার্থী। ফলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গত ২৫ জানুয়ারী সিডিএ চেয়ারম্যান ও সচিবকে লিখিতভাবে অবহিত করেছিলেন একসাথে ১৪ পরীক্ষার্থী। লিখিত আবেদনে বলা হয়েছিল, ২১/১০/২০২৫ তারিখে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ১৭ নং ক্রমিকে উল্লেখিত ‘ইমারত পরিদর্শক’ পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘উচ্চ মাধ্যমিক বা সমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং স্বীকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে সার্ভে ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ চাওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্বস্ত সূত্রে এবং চউক এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা মতে দেখা যায় বিজ্ঞপ্তিতে চাহিত যোগ্যতা ব্যতিরেকে, (৬মাস/১বছর) মেয়াদী ট্রেড কোর্সধারী এবং অন্যান্য টেকনোলজীতে ডিপ্লোমাধারী অনেক প্রার্থী আবেদন করেছেন এবং তাদের নামে প্রবেশপত্র ইস্যু করা হয়েছে এবং লিখিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে তাদের উপস্থিত ছিল দৃশ্যমান।
ইতোমধ্যে উক্ত বিজ্ঞপ্তির শিক্ষাগত যোগ্যতাবর্হিভূত প্রার্থীদেরকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দেখিয়ে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য চউক এর ওয়েবসাইটে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। যা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত শিক্ষাগত যোগ্যতার সাথে সাংঘর্ষিক ও বিধি বহির্ভূত। পরীক্ষার্থীদের এই আবেদন আমলে না নিয়ে অনিয়মের কর্মধারা চালিয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
এবিষয়ে জানতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ও সচিব মো. মাহবুব উল করিমের মোবাইলে একাধিকবার কল ও বার্তা দিয়েও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।




